সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ ঘুরে এলাম। দেখে এলাম সেখানকার ভোটের রাজনীতির নতুন কিন্তু অস্বাভাবিক মেরুকরণ। যেটি আসাম ও ত্রিপুরায় ইতিপূর্বে ঘটেছে। ওই একই ঘটনা ঘটল পশ্চিম বাংলাতেও। সাতচল্লিশের মধ্য আগস্টের পরও পশ্চিমবঙ্গ এ ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। কিন্তু এবার দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছে। সারা ভারতে পশ্চিমবঙ্গের অসাম্প্রদায়িকতার যে গর্ব-অহংকারের ঐতিহ্য ছিল, সেটি ধসে পড়েছে। ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার বিপরীত মেরুতে পশ্চিমবঙ্গ অসাম্প্রদায়িক গণ-চেতনা এখন ভূলুণ্ঠিত। হিন্দুত্ববাদী বিজেপির প্রতি পশ্চিমবঙ্গ মানুষের ঝুঁকে পড়ার পেছনে প্রধানত রাজ্যের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তৃণমূল কংগ্রেসের ভুল বা অপরাজনীতিকে দায়ী করা যায়।
পশ্চিমবঙ্গ এই রাজনৈতিক মেরুকরণের মূলে যে কারণটি প্রধান হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে, সেটি রাজ্য ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চরম ফ্যাসিবাদী ভূমিকা। চৌত্রিশ বছরের বামফ্রন্টের পরাজয়ের পর তৃণমূল এ যাবৎ বামফ্রন্টের নেতা, কর্মী, সমর্থকদের ওপর ক্রমাগত নির্যাতন, নিপীড়নসহ তাদের গৃহছাড়া করে ছেড়েছে। একইসঙ্গে প্রবল চাপের মুখে বামফ্রন্টের প্রচুর সুযোগসন্ধানীরা দলে দলে তৃণমূলে যোগ দিয়ে তাদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলে তৎপর হয়েছে। পাশাপাশি বামফ্রন্টের কর্মী, সমর্থকদের একটি অংশ আত্মরক্ষায় বিজেপির পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছে। নিজেদের জীবন রক্ষায় তারা বিজেপির পক্ষ নিয়েছে। তৃণমূলের নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অপকীর্তিতে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ প্রসার ও বিস্তারের সুযোগের মোক্ষম মওকাটি হাতিয়ে নিয়েছে। তৃণমূলের ফ্যাসিবাদী ভূমিকাকে ঠেকাতে মানুষ বিকল্প হিসেবে কংগ্রেস, বামফ্রন্টকে নয় বিজেপিকেই বেছে নিয়েছে, ধর্মীয় আবেগে এবং ধর্মান্ধতায়।
কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বলয়ে যাতে তৃণমূলের লাগাম নিয়ন্ত্রণ করা যায় এই অভিপ্রায়ে তৃণমূল বিরোধীরা হিন্দুত্ববাদী প্রতিক্রিয়াশীল বিজেপির পেছনে শামিল হয়েছে। সারা রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী জোয়ার বইছে এবং সেটি অতীতের সমস্ত ইতিহাস-ঐতিহ্যকে মøান করে। এবারের লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপিকে রুখতে সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতার ব্রিগেড মাঠে সর্বদলীয় সমাবেশ করে সে বার্তাও দিয়েছিলেন। কিন্তু ‘বিচার মানি তবে তালগাছটি আমার’ এই মনোভাবের কারণেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিবিরোধী জোট গঠিত হয়নি। পাশাপাশি বামপন্থিরাও জোট গড়তে পারেনি। তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন বলে ক্রমেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অপর দিকে কংগ্রেস দলও ভারতব্যাপী বিজেপিবিরোধী জোট গঠনের কথা বললেও চূড়ান্তে অতি-আত্মবিশ্বাসে জোট গঠন করেনি, কোনো জোটভুক্তও হয়নি। এতে বিজেপিবিরোধী ভোট বিভক্তির সুযোগে বিজেপির পাল্লাই ভারী হয়েছে। সর্বভারতীয় নির্বাচনী প্রভাবের বাইরে থাকা পশ্চিমবঙ্গ এবার মোদির বিজেপির চমকপ্রদ উত্থান যে ঘটবে সে আলামতই প্রত্যক্ষ করেছিলাম কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গে।
তৃণমূল আওয়াজ তুলেছে ‘চৌদ্দ শ’ ছাব্বিশ তৃণমূলের বিয়াল্লিশ’। অর্থাৎ ১৪২৬ বঙ্গাব্দে পশ্চিমবঙ্গ ৪২টি সংসদীয় আসন তৃণমূলেরই। অন্য কোনো দলের নয়।
রাজ্যের বিরোধীদের তৃণমূল দমন-পীড়নে সফল হলেও বর্তমানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে আমলে নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তৃণমূল তাই বলে বামফ্রন্টের ওপর ক্রমাগত খড়গহস্ত চালিয়ে যেতে কসুর করছে না। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ক্রমাগত নির্যাতন-নিপীড়ন জারি রাখার কারণেই তৃণমূল-বিরোধী শূন্যতার ফাঁক গলে অনায়াসে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং অতি দ্রুততায় তা বিকশিত হতে পেরেছে।
ধর্মনিরপেক্ষ বামফ্রন্ট সরকারকে ঠেকাতে বা উচ্ছেদে হিন্দুত্ববাদী প্রতিক্রিয়াশীল আরএসএস ও সংঘ পরিবারকে পশ্চিমবঙ্গে ঘর-গোছানোর সুযোগ করে দিয়েছিলেন এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। আজ সেটা বুমেরাং হয়ে মমতার অস্তিত্বকেই টেনে ধরেছে। ধর্ম নিয়ে বিজেপি যেমন রাজনীতির খেলা খেলছে, তেমনি তৃণমূলও। তৃণমূল বিহারের হিন্দুদের ভোট পেতে অখ্যাত ছাট-পূজায় রাজ্যে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে হিন্দু বিহারিদের সহানুভূতি আদায়ে অর্থাৎ ভোটপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে চেয়েছিল।
বিজেপির মতোই ধর্ম নিয়ে রাজনীতির একই পথে হাঁটছে
তৃণমূলও। মুসলিমদের ভোট পেতে ইমাম ভাতা, মুয়াজ্জিনদের ভাতা চালু করেছে। মুয়াজ্জিনদের এক হাজার এবং ইমামদের আড়াই হাজার টাকা প্রদান করছেন বটে তবে সে টাকা রাজ্য সরকারের তহবিল থেকে নয়। মুসলিমদের ওয়াক্ফ ট্রাস্ট থেকে। হাজি মুহম্মদ মহসীনসহ বিভিন্ন মুসলিম বিত্তবানদের দানের ওই অর্থ মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার কথা অথচ সে-অর্থ দেওয়া হচ্ছে ইমাম, মুয়াজ্জিনদের, ভোটের আশায়। পাশাপাশি দুর্গা পূজার প্রতিটি উদ্যোক্তাদের দশ হাজার টাকার অনুদান দেওয়া হচ্ছে, হিন্দু ভোটের আশায়। ধর্মকে ব্যবহারের এসকল শঠতার কৌশলে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের চেয়ে অধিক ফায়দা হয়েছে আরএসএস ও বিজেপির। ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে আরএসএস-এর শাখা। ২০১১ সালে আরএসএস-এর ৩৫০টি শাখা ছিল পশ্চিমবঙ্গে। বর্তমানে ১৪০০টি। একই সঙ্গে বাড়ছে হিন্দু পরিষদ ইউনিট। জেলা, ব্লক, অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ১৫০০টি। অসাম্প্রদায়িক রাজ্যটি সাম্প্রদায়িকতার চারণক্ষেত্রে পরিণত হলেও আর বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।
এদিকে, নাগরিক নিবন্ধন তালিকা বা ‘নাগরিক পঞ্জি’ (এনআরসি বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস) নিয়ে হুঙ্কার দিচ্ছেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। তারা পশ্চিমবঙ্গে নাগরিক পঞ্জির বাস্তবায়ন করবে, যে কোনো মূল্যে। অমিত শাহ অধিক দৃঢ়তায় বলে চলেছেন পুনরায় ক্ষমতায় এলে তারা অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে খুঁজে বের করে বিতাড়িত করবেন। তার বক্তব্যে অনুপ্রবেশকারী মাত্রই মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নয়। হিন্দু সমর্থন ও ভোটের নিশ্চয়তায় তার এই সকল সাম্প্রদায়িক বক্তব্য বিফল হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা ক্রমাগত বিজেপি’র হাতকে শক্তিশালী করে চলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গেছে। বিজেপিবিরোধী জোট তৃণমূলের অনিচ্ছার কারণেই হয়নি। এক্ষেত্রে বিজেপি’র সঙ্গে তৃণমূলের গোপন আসন-রফার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বিজেপি-তৃণমূলের আসন-রফার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ পেয়েছে। ধারণা করা যায় পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসন তৃণমূল ও বিজেপি’র মধ্যেই মূলত ভাগাভাগি হচ্ছে। অবশিষ্ট নগণ্য ক’টি কংগ্রেস, বামফ্রন্ট পেলেও পেতে পারে। বাস্তবে যদিও দুইদলই একে অপরের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশে বিষোদগার প্রয়োগ করতে ছাড়ছে না। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এরূপ ব্যক্তিগত বিদ্বেষ-হুঙ্কার অতীতে দেখা যায়নি। কিন্তু এবার অত্যন্ত স্থূলভাবে একে-অপরের বিরুদ্ধে ক্রমাগত রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে বিজেপি ও তৃণমূল, সর্বভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেস এবং বিজেপি।
পশ্চিমবঙ্গের এই হীন রাজনৈতিক মেরুকরণ আমাদের মৌলবাদীদের চাঙ্গা হওয়ার পথ সুগম করে দেবে। সেটা আমাদের জন্য নিশ্চয় শুভফল বয়ে আনবে না। যেমনটি আনবে না পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্যও। এই মেরুকরণের বিষ পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
