বিপুল ঘনবসতির মেগাসিটি ঢাকা থেকে ঈদযাত্রা যেন বিরাট চ্যালেঞ্জ। নানা প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও প্রতিবছর ‘আনন্দের ঈদযাত্রা’ হয়ে দাঁড়ায় ভোগান্তির কারণ। এবারও ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে মহাসড়কের অবস্থা, গাড়ির ফিটনেস, ঢাকা থেকে বের হতে মোড়ের যানজট, টোলপ্লাজার জটসহ নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হকের মতে, প্রধানত তিনটি কারণে ঈদযাত্রা দুর্বিষহ অভিজ্ঞতায় পরিণত হচ্ছে। এগুলো হলোÑ ঈদের আগে বেপরোয়া ফিটনেসবিহীন গাড়ির উপস্থিতি, রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী ৬টি মহাসড়কের বিভিন্ন মোড়ের যানজট এবং পুরনো পদ্ধতির টোল সংগ্রহ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সমাধান বাদ দিয়ে বিশাল কর্মী বাহিনী নামালেও ঈদযাত্রা নিরাপদ ও শৃঙ্খলায় আনা সম্ভব নয়।’
গতকাল মঙ্গলবার গাবতলী বেড়িবাঁধ, সিএমবি, মাজাররোড, সাভারের আমিনবাজার ও হেমায়েতপুরের ওয়ার্কশপগুলোতে গিয়ে দেখা যায় ঈদ সামনে রেখে লক্কড়ঝক্কড় বাস মেরামতের কাজ চলছে। দেশের শীর্ষ সারির কয়েকটি পরিবহনসহ শ্যামলী, ঈগল, সৌদিয়া, সেন্টমার্টিন, রোজিনা, ডিপজল পরিবহনের বাসে ওয়েল্ডিং, ঝালাই ও রঙের কাজ করতে দেখা গেছে। গাবতলী বেড়িবাঁধ এলাকার জুলহাস ওয়ার্কশপের ড্রিলিং মিস্ত্রি শফিকুল ইসলাম জানান, ‘ঈদ এলে দিনরাত গাড়ি মেরামতের কাজ করতে হয়। পরিস্থিতি এমন হয় যে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৩ ঘণ্টার বেশি ঘুমানোর সুযোগ থাকে না।’ তিনি বলেন, ‘গাড়ির ফিটনেস বলতে আপনারা যেটা বলেন সেটা এখানে হয় না। আমাদের ওপর চাপ থাকে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করার। ফুটাফাটা বন্ধ আর রংচং করেই শেষ।’
ফিটনেসহীন বাসের সংখ্যা জানতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে যোগাযোগ করলেও সঠিক পরিসংখ্যান মেলেনি। বিআরটিএর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে তাদের নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা ৩৯ লাখ ৭৩ হাজার ২২৭টি। এ সংখ্যা প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। আর রাজধানী ঢাকায় নিবন্ধিত পরিবহনের সংখ্যা ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৪৬২টি। গাবতলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মোহাম্মদ সালাউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে জানান, দেশের বৃহত্তম এ বাস টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ গাড়ি ছেড়ে যায়। তবে ঈদের তিন দিন আগ থেকে এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় দুই হাজারে। এ হিসেবে শুধু গাবতলী টার্মিনালেই যুক্ত হবে পাঁচ শতাধিক ফিটনেসবিহীন বা রংচং করা গাড়ি। এর পাশপাশি সায়েদাবাদ ও মহাখালী টার্মিনালেও আট শতাধিক ফিটনেসবিহীন গাড়ি নামতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বলছে, ঢাকা শহরে পাঁচ হাজারের বেশি বাস চলাচল করছে। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচল করা এসব বাসের সিংহভাগই লক্কড়ঝক্কড়। এসব বাসের বড় একটা অংশ প্রতি ঈদেই উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। ফলে সবমিলিয়ে এ বছর মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন বাসের সংখ্যা দাঁড়াবে তিন হাজারের ওপর।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও যাত্রী কল্যাণ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদযাত্রায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন প্রধানত দুভাবে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমটি হলো, ব্যস্ত সড়কে বিকল
হয়ে পড়া। দ্বিতীয়টি হলো, দুর্ঘটনা। ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। ব্রেক, চাকা, স্টিয়ারিং, গিয়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দুর্বল থাকায় চালক অনেক সময়েই এসব গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। ফলে ঘটে দুর্ঘটনা। ড. শামসুল হক বলেন, ‘গাড়ির ফিটনেসের জন্য ৬৫ ধরনের পরীক্ষা করতে হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিআরটিএ গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষাকে তামাশার পর্যায়ে নিয়ে গেছে।’
পাশাপাশি ঈদযাত্রায় ভোগান্তির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায় ভাঙাচোরা সড়ক, মোড়, গতিরোধক, টোলপ্লাজা ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ‘ঢাকা থেকে বের হতে নবীনগর, কাঁচপুর, বাইপাইল, চন্দ্রা, সোনারগাঁও, গাজীপুর চৌরাস্তার যানজট ভোগান্তির বড় কারণ। এসব মোড়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমাধান না খুঁজে গায়ের জোর দিয়ে যানজট সারানোর চেষ্টা চলে। মহাসড়কের প্রধান শর্ত গাড়ি মোড়ে এলেও থামবে না। হয় আন্ডারপাস না হয় বহুমুখী ওভারপাস দিয়ে যে যার মতো চলে যাবে।’
বড় সেতুগুলোর টোল সংগ্রহ পুরনো পদ্ধতিতে হওয়ায় ভোগান্তি আরও বাড়ছে বলে মত দেন শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে গাড়ির নাম্বার প্লেট ডিজিটাল ও আরএফআইডি (রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডি) পদ্ধতি করা হয়েছে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে টোল সংগ্রহ এবং রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি শনাক্তকরণের জন্য। ডিজিটাল নাম্বার প্লেটের মাধ্যমে গাড়ি সড়কে ওঠার সময় টোল সংগ্রহ করা যায়। তাতে টোল প্লাজায় দাঁড়ানোর দরকার নেই। এভাবে জ্যাম এড়ানো সম্ভব।’
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক হিসাব বলছে, প্রতিবছর ঈদযাত্রায় প্রায় আড়াইশ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণহানির সংখ্যা তিন শতাধিক। ঈদের আগে বাড়িতে যাওয়ার সময় সড়কে যে মনিটরিং থাকে ঈদের পরে একই রকম না থাকায় দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করেন সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। এ বছর ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে গতকাল ২০ দফা দাবি দিয়েছে সংগঠনটি। এসবের মধ্যে আছে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, মোটরসাইকেলে ঈদযাত্রা নিষিদ্ধ করা, গার্মেন্ট ও অন্যান্য শিল্প কলকারখানা রেশনিং পদ্ধতিতে ছুটির ব্যবস্থা করা, টোল প্লাজার সবকটি বুথ চালু করা ও দ্রুত গাড়ি পাসিংয়ের ব্যবস্থা করা।
