আমলাতন্ত্র ও গণতন্ত্র

আপডেট : ২২ মে ২০১৯, ১০:৪৫ পিএম

আমলাতন্ত্রের এটাই স্বভাব কাউকে রাখে মাথায়, কাউকে ফেলে পায়ে। গণতন্ত্রের স্বভাব যদি সে প্রকৃতই গণতান্ত্রিক হয় হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন, সে রাখতে চায় বুকের কাছে; ছুরি মারবে বলে নয়, হাতিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা থেকেও নয়, মৈত্রী গড়বে বলে। না, গণতন্ত্র অতিরিক্ত মাখামাখি পছন্দ করে না, মোটেই নয়; ব্যক্তিকে সে ব্যক্তি হিসেবেই দেখতে চায়, স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাস করে; অরণ্যে নয়, তার আস্থা বৃক্ষে; কিন্তু তবু মৈত্রী ভিন্ন গণতন্ত্র নেই, পারস্পরিক সহনশীলতা যে-মৈত্রীর পূর্বশর্ত। আমলাতন্ত্র কীভাবে দেখে মানুষকে? দেখে বস্তু হিসেবে; গণতন্ত্র দেখে সেই মানুষকেই স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট হিসেবে। আমলাতন্ত্র বৈষম্যের সন্তান ও প্রতিপালক, গণতন্ত্র সাম্যের প্রচারক। আমলাতন্ত্র ও গণতন্ত্র তাই এক সঙ্গে যাবে না কখনো, একটির উপস্থিতি অন্যটিকে শাসন করবে, বিড়াল যেমন শাসন করে ইঁদুরকে।

প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমলাতন্ত্র গণতন্ত্রের চেয়ে পুরনো। স্বভাবতই। কেননা বৈষম্যেই স্বাভাবিক, সাম্য নয়, এবং আমলাতন্ত্র বৈষম্য থেকেই বেরিয়ে আসে, বেরিয়ে এসে তাকে পুষ্ট করে। আমরা মিসর, রোম, চীন, ভারতবর্ষ এসব প্রাচীন স্থানে আমলাতন্ত্রের খবর পাই, কিন্তু প্রাচীন এথেন্সে পাই না; কেননা, এথেন্সে এক ধরনের গণতন্ত্র ছিল, অন্যত্র যা ছিল না। তবে এটা ঠিক যে, আমলাতন্ত্র আধুনিককালেই প্রবল ও বিস্তৃত হয়েছে। সংজ্ঞা দিতে গেলে বলা যাবে এ হচ্ছে সেই ব্যবস্থা যেখানে বড় আয়তনের প্রশাসনিক কাজ চলে, এবং ওই বড় কাজের জন্য বহু ব্যক্তির কাজকে একত্র করতে হয়। যেন একটি বৃহৎ যন্ত্র। এই যন্ত্র চলার জন্য যে মসৃণতা আবশ্যক তার তৈল উৎপাদিত হয় দু’টি উপাদানে, একটি হচ্ছে অতিকথন বা আদর্শবাদ; অন্যটি হচ্ছে কর্মীদের প্রায় ধার্মিক আত্মসন্তোষ যাতে মিশে থাকে ওই আদর্শের প্রতি অনুরাগ ও ব্যক্তিগত (অর্থাৎ বৈষয়িক) স্বার্থসিদ্ধি।

আমরা সাম্যের কথা বললাম, কিন্তু এমনকি সমাজতান্ত্রিক দেশেও আমলাতন্ত্র থাকে, যাতে বোঝা যায় কত স্বাভাবিক এই কৃত্রিম ব্যবস্থাটি। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে অধুনা যে গোলযোগ চলছে তার প্রধান কারণ আমলাতন্ত্র। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু আমলাতন্ত্র যায়নি, পুরাতন আমলাতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা রয়ে গেছে, আরও যা বড় তা হলো পার্টির আমলাতন্ত্র দেখা দিয়েছে, এবং তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে জনগণকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে, ফলে মানুষের মনে সেই বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে, যে বিক্ষোভ শ্রেণি-বিভক্ত সমাজের একটি চারিত্রিক লক্ষণ। শ্রেণির জায়গায় আমলাতন্ত্র দেখা দিয়েছে, এবং আমলাতন্ত্র শ্রেণি সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে। এ বড় কঠিন ইঁদুর।

আমলা থাকলেই যে আমলাতন্ত্র থাকবে এমন কোনো কথা নেই, যেমন জনগণ আছে বলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে গণতন্ত্র রয়েছে। কিন্তু সব তুলনার মতো এ তুলনাও অযথার্থ বটে। কেননা আমলাদের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে আমলাতন্ত্রমুখী, জনগণের স্বাভাবিক গতি গণতন্ত্রের দিকে নয়।

কাকে আমরা আমলা বলছি তাও দেখা দরকার। আমলা হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি একটি ওপর থেকে নিচে নামা কাঠামোর মধ্যে, নির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও নীতির অধীনে নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন। তিনি একেবারে ওপরেরও নন, নিচেরও নন, মোটামুটি মধ্যবর্তী। কর্তা নন, কিন্তু কর্তৃত্ব রাখেন। বিশেষজ্ঞ নন, তবে সব বিষয়েই জানেন, অন্তত জানেন বলে বিশ্বাস করেন। আমলাতন্ত্র সম্পর্কে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য লেখক ম্যাক্স ওয়েবার এভাবেই দেখেছেন তাকে। আমলাতন্ত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারে, থাকতে পারে ব্যবসায়িক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও; কিন্তু সরকারি আমলাতন্ত্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কেননা তার সঙ্গে রাষ্ট্র জড়িত, এবং আধুনিককালে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে প্রবেশ করে না, এবং করতে চায় না। ওই যে আমরা সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করলাম সে তালিকায় আমলাতন্ত্রের গুণগুলোর কথা রয়েছে। বড় গুণ হলো নিরপেক্ষতা। আরও একটি গুণ রয়ে গেছে প্রচ্ছন্ন, সে হচ্ছে দক্ষতা; আমলাতন্ত্র দক্ষতায় বিশ্বাস করে, এবং নিজেকে দক্ষ বলে মনে করে।

কিন্তু গুণ আবার দোষ হয়ে দেখা দিতে পারে। এবং দেয়ও। যেমন, দক্ষতা। হ্যাঁ, আমলারা দক্ষ। তারা দক্ষ হতে চান। প্রায় ধর্মীয় নিষ্ঠাতেই দক্ষতার আরাধনা করেন। ওই পথে উচ্চতর পদলাভ করা যায়, বার্ষিক রিপোর্ট ভালো হয়, ভালো জায়গায় বদলি হওয়া সম্ভব হয়। ইউরোপে যখন পুঁজিবাদের পত্তন হয়, দক্ষতা তখন পুঁজি সৃষ্টির সহায়ক হয়েছিল। এই দক্ষতা এক ধরনের সন্ন্যাসীÑ মানসিকতার সৃষ্টি করেছে। পুঁজির আদি সংগ্রাহকরা সঞ্চয়ী ছিলেন, যেমন ছিলেন মুনাফালোভী। অধার্মিক লক্ষ্যে (বৈষয়িক অর্থে) এই ব্যক্তিগত ধর্মাচার ব্যক্তির জন্য ভালো, পুঁজির জন্যও ভালো, কিন্তু পুঁজির হাতে যারা নির্যাতিত হয় তাদের জন্য ভালো নয়। আমলাদের সম্পর্কে বলা যায় যে, তারা যত বেশি দক্ষ হন, তত বেশি আমলাতন্ত্রী হন, অর্থাৎ একদিকে আত্মসন্তুষ্ট ও অহঙ্কারী হয়ে ওঠেন এবং অন্যদিকে এমন একটি অমানবিক ব্যবস্থাকে পরিপুষ্ট করে তোলেন যা রাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করে সমাজ থেকে এবং সমাজে বৈষম্যকে বাড়িয়ে তুলতে থাকে।

আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র, কিন্তু তা বড় রাষ্ট্রের সেবক। রাষ্ট্র যত বৈষম্যমূলক হচ্ছে বুঝতে হবে আমলাতন্ত্র তত দক্ষ হচ্ছে। ঠিক যেমন আমলাতন্ত্র যত দক্ষ হবে দেখা যাবে রাষ্ট্র তত শক্তিশালী হচ্ছে। আমলাতন্ত্রের দক্ষতা তাই সমাজের জন্য ক্ষতিকর। ক্ষমতা মানুষকে নষ্ট করে, বল্গাহীন ক্ষমতা বল্গাহীনরূপে নষ্ট করেÑ এই নিয়ম যে আমলাদের ক্ষেত্রে সত্য হবে না তা তো হতে পারে না। জনগণকে তাই আমলা ও আমলাতন্ত্র উভয়ের অত্যাচারই সহ্য করতে হয়, উপায়হীনভাবে।

খুব সহজভাবেই জিজ্ঞেস করা তাই সংগত যে, ওই যে প্রসিদ্ধ ও আরাধিত দক্ষতা এবং অহরহ ব্যস্ততা তা কীসের জন্য? আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য? কিন্তু আইন যদি অন্যায় হয় তাহলে? বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অধিকাংশ আইনই অন্যায়, কেননা তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে বৈষম্যকে পাহারা দেওয়া। তেমন ব্যবস্থায় আমলাতান্ত্রিক দক্ষতা বৃদ্ধির অর্থ একটিইÑ ব্যাপক জনগণের দুর্গতি বৃদ্ধি।

মার্কস আমলাতন্ত্র সম্পর্কে তত লেখেননি, যত লিখেছেন শ্রেণি-বিভাজন সম্পর্কে। কিন্তু তারও স্পষ্ট ধারণা ছিল যে আমলাতন্ত্রের ক্ষমতার যেখানে শেষ মানুষের জীবনের সেখানে শুরু। জীবন বলতে এ ক্ষেত্রে তিনি বুঝেছেন প্রাথমিক জীবনকে, অর্থাৎ উৎপাদন ও ভোগকে। পুঁজিবাদ ও আমলাতন্ত্র উভয়েই বৈষম্য সৃষ্টিতে দক্ষ, কিন্তু পুঁজিবাদ উৎপাদন করে, বিতরণও করে, তার নিজস্ব পদ্ধতিতে, অর্থাৎ বাজারের মধ্য দিয়ে; কিন্তু আমলাতন্ত্র একেবারেই অনুর্বর, উৎপাদনের সঙ্গে সে সম্পর্কহীন, তার কাজ তথাকথিত আইন ও শৃঙ্খলার মধ্যে প্রকৃত উৎপাদককেÑ অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণিকেÑ আবদ্ধ করে রাখা। ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার দিলেও দিতে পারে, কিন্তু বিপ্লবের কুত্রাপি নয়। তার কাজ পুঁজির স্বার্থে বিপ্লবকে প্রতিহত করা। জনগণের পক্ষে তাই আমলাতন্ত্রের দক্ষতা ততটাই ক্ষতিকর, রাষ্ট্রের পক্ষে তা যতটা মঙ্গলজনক। রাষ্ট্র কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয়, রাষ্ট্র শাসকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি বৃহৎ যন্ত্র।

আমলাতন্ত্র মনে করে যে নিরপেক্ষ। কেবল মনে করে না, নিরপেক্ষতাকে আদর্শায়িতও করে। কোন অর্থে নিরপেক্ষ? নিরপেক্ষ এই অর্থে যে, সে নৈর্ব্যক্তিক, ব্যক্তিগত আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় না, তার পছন্দ-অপছন্দ নেই, সে চলে নিয়মমাফিক। কিন্তু আমরা তো জানি যে ওই নিয়মগুলো মোটেই মানবিক নয়, নিরপেক্ষ তো নয়ই। আইনকানুন নিয়মনীতি সব কিছুরই উদ্দেশ্য অভিন্ন; যন্ত্র যত ভিন্নই হোক, এবং যার হাতেই থাকুক, গান একটাই, সেটি বৈষম্যমূলক (অর্থাৎ পুঁজিবাদী) রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি করা। এখানে নিরপেক্ষতা কোথায়? না, আমলাতন্ত্র মোটেই নিরপেক্ষ নয়, সে সম্পূর্ণরূপে পক্ষপাতদুষ্ট। সে রাষ্ট্রের স্বার্থ দেখে, শাসিতের স্বার্থের বিপরীতে। ভাবে সেবা করছে; হ্যাঁ, তা করছে বটে। কিন্তু কার? না, জনগণের নয়। সেবা করে শাসকের। জনগণের সেবক (পাবলিক সারভেন্ট) বলে যে দাবি করে সেটা ভান, জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য আলখেল্লা, ওই আলখেল্লা কেবল ধোঁকাই দেয় না, বর্ম হিসেবেও কাজ করে। আপনি তাকে স্পর্শ করতে পারবেন না, কেননা সে ব্যক্তি নয়, সে একটি ব্যবস্থা; আপনি তাকে বিচ্যুত কিংবা পরাভূত করতে পারবেন না, কেননা সে মনে করে সে একটি অত্যন্ত পবিত্র কর্তব্য আদর্শনিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছে, যার দরুন ধার্মিকের আত্মসন্তুষ্টি তাকে সর্বদা ঘিরে রাখে। কোন ধার্মিক কবে ভয় করেছে পাপীর ভ্রকুটিকে?

কিন্তু এই ধার্মিক অত্যন্ত অধার্মিক বটে। কেননা সে যে কেবল প্রভুর মঙ্গল দেখে তা নয়, নিজের মঙ্গলও দেখে। কোনো আমলাই আসলে নৈর্ব্যক্তিক নন। তার সন্তোষ ব্যক্তিগত সন্তোষ। আর সেই সন্তোষ যে কেবল রাষ্ট্রের সেবা থেকে আসে তা নয়, আসে ব্যক্তিগত সুবিধা, লাভ থেকেও। পদকে যে তিনি বড়ই ভালোবাসেন, এর প্রধান কারণ এই নয় যে, পদ তাকে সেবা করবার সুযোগ দেয়, প্রধান কারণ এই যে, পদ তাকে বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা এনে দেয়। যত বড় পদ তত বেশি সুযোগ ও সুবিধা।

আমলারা সংযমের প্রশংসা করেন। তারা খুবই সংযত, জনগণের ক্ষেত্রে। প্রাপ্যের এক চুল বেশি কেউ পাবে তা হবে না। কিন্তু সব আমলাই অত্যন্ত অসংযমী আত্মস্বার্থসিদ্ধিতে এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সিদ্ধ করে নিজেরটা গুছিয়ে নিতে। স্বার্থবুদ্ধি বিপজ্জনক, সেই বুদ্ধি যখন আদর্শবাদে পরিণত হয়, তখন সে কেবল ইঁদুর নয়, দৈত্যও বটে, ইঁদুরের মতো কাটে, দৈত্যের মতো ভাঙে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত