সিনেমা হল নিয়ে উদ্বিগ্ন ইনারিতু

আপডেট : ২২ মে ২০১৯, ১১:১৭ পিএম

এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরিদের প্রধান হিসেবে আছেন নামি পরিচালক আলেহান্দ্রো গনজালেস ইনারিতু। উৎসবের দ্বিতীয় দিনে নিজের হোটেল বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে।

সামনে নীলরঙা আকাশ আর সাগর মিতালি পেতেছিল। তার দিকে তাকিয়েই সিনেমা জগতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথার ঝাঁপি খুলে দেন। অবশ্য তার বেশির ভাগই ছিল আজকের দিনের স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নিয়ে। তবে ইনারিতু নিশ্চিত, সিনেমা যে রূপে হোক সব সময় থাকবে।

তার উদ্বেগ সিনেমা হল নিয়ে। সিনেমা হল তার কাছে মাতৃজঠরের মতো। আজ তিনি যা এর কারণেই। সিনেমা হলকে মেরে ফেললে তিনিও মারা যাবেন।

‘বার্ডম্যান’ ও ‘দ্য রেভেন্যান্ট’-এর মতো সিনেমার জন্য সেরা পরিচালকের অস্কার জিতলে এ মুহূর্তে তেমন কিছু নির্মাণের সঙ্গে নেই ইনারিতু। কারণ তিনি সেইসব পরিচালকদের একজন যারা বড় স্টুডিও’তে টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির তোয়াক্কা করেন না। তাই কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। অথচ একই স্টুডিওগুলো টাকা ঢালছে সুপারহিরো ফ্র্যাঞ্চাইজিতে। অঁতর নির্মাতারা ঝুঁকছেন নেটফ্লিক্সের মতো স্ট্রিমিং সার্ভিসের দিকে। ফলে প্রেক্ষাগৃহে সিনেমার দেখার অভিজ্ঞতা বদলে যাচ্ছে। যাকে অধঃপতন হিসেবেই দেখেন ইনারিতু।

তবে নিজের সমসাময়িকদের থেকে আলাদা মত পোষণ করেন এই নির্মাতা। সিনেমা হলের অধঃপতন ঘটছে বটে, কিন্তু নেটফ্লিক্সের কারণে আর্ট ফিল্মগুলো বিশ্বব্যাপী দর্শক পাচ্ছে। এই সার্ভিসে পরিবেশন করেছেন সর্বশেষ অস্কারে আলোড়ন তোলা ‘রোমা’। এই ছবির পরিচালক ইনারিতুর বন্ধু আলফানসো কুয়ারন।

এখন সিনেমা হলে যাওয়ার চেয়ে দর্শক অনেক দ্রুতই স্ট্রিমিং সার্ভিসে অনেক ছবি দেখে ফেলছে। এ প্রসঙ্গে ইনারিতুর মত হলো, কিছু সিনেমা শুধু স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলোতে দেখা যায়। তবে মূলধারায় সমস্যা হলো প্রযোজনা, পরিবেশনা ও প্রদর্শনের। কারণ প্রেক্ষাগৃহগুলো মূলত সমগোত্রীয় ছবিগুলো দেখায়। যেখানে অন্য ধরনের ছবির জন্য কোনো স্থানই থাকে না। এর জন্য নেটফ্লিক্সকে বলির পাঁঠা করে দোষ দেওয়া হয়। কিন্তু তার মতে নেটফ্লিক্সের ভুল নেই এখানে। কারণ প্রেক্ষাগৃহের বৈচিত্র্যহীনতাকে পুঁজি করে এগিয়ে যাচ্ছে মাধ্যমটি, ওই সব ছবিকে টিভিতে স্থান করে দিচ্ছে।

তাহলে কি দোষ স্টুডিওগুলোর? ইনারিতুর মতে, এটাই হলো মূল বিষয়। অল্প কিছু স্টুডিও মাঝারি বাজেটে দারুণ, মাল্টিকালচারাল ছবি বানিয়ে থাকে। কিন্তু এই সব ছবির পরিবেশক পাওয়া যায় না। কারণ বড় বাজেট ও ফ্র্যাঞ্চাইজি সিনেমাগুলো এর চেয়ে বেশি টাকা আনতে পারে।

আরও জানান, ২০ বছর আগে যখন ‘আমোরেস পেরোস’ নির্মাণ করেন তখন মাঝারি বাজেটের সিনেমার জন্য ভালো বাজার ছিল। ছবিগুলো বিভিন্ন অঞ্চল ভেদে বিক্রি হতো। এই সব ছবি প্রোমোট করার জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানও ছিল। যেমনÑ প্যারামাউন্ট ভিনটেজ। সেটা এখন আর নেই। এখন ইন্ডাস্ট্রির সবার একই জিজ্ঞাসা, একটি ছবি কত টাকা তুলে আনতে পারবে।

থিয়েটারগুলো এখনো ইনারিতুর তারকাবহুল ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ প্রদর্শনে আগ্রহী।

কিন্তু যদি কোনো তরুণ নির্মাতা ‘২১ গ্রামস’-এর মতো সিনেমা বানায়- কী হবে? ২০০৩ সালের নিজের ছবিটির কথা স্মরণ করে  জানান, একই ঘটনা যদি ২০ বছর পরের হয়, তবে তিনি কোনো ২১ গ্রামস, বাবেল বা বিটফুলের মতো ছবি বানাবেন না। কারণ তার বেড়ে ওঠার সময় প্রযোজনা সংস্থা, স্টুডিও বা প্রদর্শকদের সাহায্য পেয়েছেন। তিনি ভাগ্যবান যে ‘দ্য রেভেন্যান্ট’-এর মতো ছবি বানাতে পেরেছেন। কিন্তু কতজন নবীন নির্মাতা এই সুযোগ পাবে। তাই তারা টিভিকে নিজেদের পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করছে।

তাহলে প্রচলিত পথে তরুণ নির্মাতা কী করবে? ইনারিতুর মতে, শিল্পের ক্ষেত্রে বাস্তব দুনিয়ার মতো ধাঁধাই কাজ করে। নিরানব্বই ভাগ মানুষই অর্থনৈতিকভাবে খারাপ অবস্থা থাকে, আর সবচেয়ে ভালো থাকে একভাগ। সিনেমার ব্যাপারটাও তেমন। মাত্র একভাগই মেগা বিলিয়ন বাজেটের সিনেমার জগতে যুক্ত হতে পারে। আর ৯৯ ভাগই যাবে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে। এটা কোনো স্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি নয়। তাই তিনি খুবই উদ্বিগ্ন।

কিন্তু জুরিদের সংবাদ সম্মেলনে আপনি নেটফ্লিক্স সম্পর্কে ইতিবাচক ছিলেন। ইনারিতুর ভাষ্য, যখন টিভিতে একটি সিনেমা দেখায়, সারা বিশ্বের মানুষ দেখতে পারে। এই ক্ষেত্রে তিনি নেটফ্লিক্সকে শতভাগ সমর্থন করলেও একই সঙ্গে পরিবেশক ও প্রদর্শকদের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দিতে চান। যদি সিনেমা হলগুলো ফ্রাঞ্চাইজি-এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক হয়ে ওঠে, সামনে স্টুডিও, পরিবেশক বা প্রদর্শকদের যাওয়ার কোনো পথ থাকবে না। নেটফ্লিক্স তাদের জ্যান্ত খেয়ে ফেলবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত