বৈধভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহী করতে আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ভর্তুকি দেবে সরকার। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শতকরা ২ টাকা হারে ভর্তুকি পাবেন প্রবাসীরা। অর্থাৎ কোনো প্রবাসী তার পরিবারের কাছে ব্যাংকিং চ্যানেলে ১০০ টাকা পাঠালে ব্যাংক তাকে ১০২ টাকা দেবে। ওই ২ টাকা ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করবে সরকার।
কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের ৮০ লাখ কর্মী প্রবাসে থাকলেও রেমিট্যান্স কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়ছে না। বাড়তি লাভের আশায় হুন্ডিসহ অবৈধ নানা পন্থায় দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। তাদের ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহী করতে প্রণোদনার প্রস্তাব ছিল প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। সে অনুযায়ী রেমিট্যান্সে দেশে প্রথমবারের মতো ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বছরে কমবেশি ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা। সেখানে ২ শতাংশ হারে ভর্তুকি দিতে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা দরকার। আগামী বাজেটে এ খাতে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
এদিকে নয় বছর পর নতুন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছে অর্থ মন্ত্রণালয়। নতুন অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে এ অর্থ ব্যয় করবে সরকার। আগামী বাজেটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে ২ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত নয় বছর ধরে নতুন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেনি সরকার। শতভাগ এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বেতন যেহেতু সরকার দেয়, তাই ওইসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা করার উপায় খোঁজার নির্দেশ দিয়েছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তারপর থেকেই নতুন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি বন্ধ ছিল। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে সরকার নতুন করে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত নেয়। সে প্রেক্ষাপটে আগামী বাজেটে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সারা দেশ থেকে ৬ হাজার ১৪১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আবেদন করে। এর মধ্যে শর্ত পূরণ করেছে ১ হাজার ৬৪৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; যার দুই-তৃতীয়াংশ স্কুল-কলেজ, বাকিগুলো কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান নতুন করে এমপিওভুক্তির জন্য আগামী বাজেটে ২ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদকালে দেশ-বিদেশে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা থাকছে আসছে বাজেটে। এর মধ্যে প্রথম অর্থবছরে দেশ-বিদেশে ১৫ লাখ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য স্থির করা হচ্ছে। এই ১৫ লাখের মধ্যে দেশের ভেতরে ১০ লাখ ও বিদেশে ৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
তারা জানান, আসছে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্ক ও বিধবা, প্রতিবন্ধী, মাতৃত্বকালীনসহ বিভিন্ন ভাতার উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ বাড়ানো হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভাতার পরিমাণ অপরিবর্তিত রেখে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় প্রায় ৭৩ লাখ ৫০ হাজার উপকারভোগী রয়েছেন। এ খাতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ৬৪ হাজার কোটি টাকা; যা বাজেটের ১৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আগামী বাজেটে উপকারভোগীর সংখ্যা কমবেশি ৮৫ লাখে উন্নীত করা হবে। এর মধ্যে গত অর্থবছরে মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা ২ হাজার টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। আগামী বাজেটে তাদের জন্য হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে স্বল্পসুদে গৃহনির্মাণ ঋণ দেওয়ার ঘোষণা থাকবে।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, অধিকারভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য শক্তিশালী আইনি কাঠামোর ঘোষণা থাকতে পারে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে। দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে সামাজিক নিরাপত্তার সাংবিধানিক নীতি বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে হিজড়াদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনে ১১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও তার বড় অংশই খরচ হয়নি। হিজড়াদের অনাগ্রহের কারণে তাদের পুনর্বাসন করতে পারছে না সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এছাড়া পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণের পরও হিজড়ারা আগের মতোই রাস্তায় নেমে চাঁদাবাজি করছে। এ কারণে আসছে বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ কমিয়ে সাড়ে ৫ কোটিতে নামানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আগামী বাজেটে হাওর অঞ্চলে শস্যবীমা চালুর জন্য প্রিমিয়ামে ভর্তুকি বাবদ কিছু অর্থ বরাদ্দ রাখা হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ বিষয়ে সাধারণ বীমা করপোরেশনের কাছ থেকে ধারণাপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।
