তারুণ্যের শক্তি সামনে এগিয়ে যেতে চায়। এই এগিয়ে চলার পথ নির্মাণে পাথেয় হিসেবে ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজে নিতে হয়। বর্তমানকে জেনে বুঝে খুঁজে নিতে হয় ভবিষ্যতের দিশা। এভাবেই ইতিহাস আর ভবিষ্যতের সেতুবন্ধ রচনা করে সৃজনশীলতা আর মননশীলতার বিকাশে সমসময় আর সমাজকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজ করে তারুণ্য।
এই সময়ের তরুণদের ইতিহাসের সংগ্রামী অনুপ্রেরণায় উদ্দীপ্ত করতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণপুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামী জীবনকে উপজীব্য করে আঁকা চিত্রকর্ম নিয়ে ‘আছো সত্তায় আছো চেতনায়’ শিরোনামে চিত্র প্রদর্শনী এমনই একটি উদ্যোগ।
দেশের বরেণ্য ও খ্যাতনামা চিত্রশিল্পীদের পাশাপাশি তরুণ চিত্রশিল্পী ও চিত্রকলার নবীন শিক্ষার্থীদের আঁকা ১০০টি চিত্রকর্ম নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে চলছে এই প্রদর্শনী। বহু বর্ণিল এইসব চিত্রকর্মে বঙ্গবন্ধুর জীবনের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে সঙ্গে উঠে এসেছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে পাকিস্তানি উপনিবেশের নিগড় ভেঙে ভাষা আন্দোলন-স্বাধিকার আন্দোলন হয়ে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা অধ্যায়ের সংগ্রামী আলেখ্য।
প্রবীণ-তরুণ-নবীন তিন প্রজন্মের শিল্পীদের আঁকা শত চিত্রপটে মূর্ত হয়ে উঠেছে বঙ্গবন্ধুকে নানাভাবে দেখার, নানাভাবে আবিষ্কার করার প্রয়াস। প্রবীণ শিল্পীদের অনেকেই বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের উজ্জ্বল দিনগুলো দেখেছেন, সেই সময়ের সাক্ষী হয়ে আছেন; তারা একভাবে চিত্রপটে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তরুণ ও নবীন শিল্পীদের প্রায় সবারই জন্ম হয়েছে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর; ফলে তাদের দেখায় ও আঁকায় ইতিহাসের আখ্যান উঠে এসেছে নবরূপের উপস্থাপনায়।

‘তারুণ্য কথা’র এই আয়োজনে শত চিত্রকর্মের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য স্থান জুড়ে রয়েছে অসাধারণ নৈপুণ্যে আঁকা বঙ্গবন্ধুর অনেকগুলো প্রতিকৃতি। তবে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে তরুণ ও নবীন শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্মগুলোতে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিজীবনের নানা মুহূর্তকে রূপায়ণের প্রচেষ্টা। কেউ কেউ চিত্রপটেই কোলাজের মতো করে ছবির মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন বঙ্গবন্ধুর বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে উচ্চারিত কথামালা, যা সাহসী স্লোগান হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে। কেউ আবার কবিতা-গানের বাণী যুক্ত করে ছবিতে এক মায়াবী ও ব্যথাতুর আবহ ফুটিয়ে তুলেছেন বঙ্গবন্ধুর ট্র্যাজিক মৃত্যু এবং তার শূন্যতার চিত্রায়ণে।
বঙ্গবন্ধুকে বুকে টেনে নিয়ে চুমু খেয়ে বঙ্গবন্ধুর মায়ের আশীর্বাদ করার দৃশ্য, কিংবা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের পাশে শিশু রাসেলকে বঙ্গবন্ধুর আদর করার দৃশ্য দর্শককে যেমন চিরায়ত সন্তান বাৎসল্যে আপ্লুত করবে; তেমনি দীর্ঘদিন কারাগারে কারাগারে বন্দিজীবন কাটানো বঙ্গবন্ধুর জীবনের পারিবারিক সময়ের শূন্যতার ভাবনায় অশ্রুসিক্তও করবে। ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে রূপায়ণের চেষ্টায় অভূতপূর্ব মনে হয়েছে, নির্জন সমুদ্রসৈকতে চিন্তামগ্ন হয়ে সুদূর পানে তাকিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর চিত্রকর্মটি। সাইড টেবিলের ওপর চশমা, পাইপ আর ডায়েরি রেখে বঙ্গবন্ধু ধ্যানমগ্ন হয়ে আছেন, বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ছে ঢেউ, একঝাঁক শঙ্খচিল উড়ছে। অঙ্কনশৈলিতে মুনশিয়ানা না থাকলেও শিল্পী তানবীর সারওয়ার রানার এই ছবির সর্বগ্রাসী শূন্যতা দর্শককে ভাবাবে। এই রকম আরও নানা ভাবনায় বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন নবীন শিল্পীরা।
অন্যদিকে, প্রথিতযশা শিল্পী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক শেখ আফজালের আঁকা বঙ্গবন্ধু অমোচনীয়ভাবে মিশে আছেন বাংলার সাধারণ মানুষের সঙ্গে। শিশুকে কোলে নিয়ে মা আর মুগ্ধদৃষ্টি নিয়ে সামনে পা বাড়ানো এক শিশুর প্রতিকৃতির নেপথ্যে গভীর ভাবনায় মগ্ন থাকা বঙ্গবন্ধুর মুখচ্ছবি চিরায়ত বাংলার কথাই মনে করিয়ে দেয়। আরেকটি চিত্রকর্মে দেখা যাবে একের পর এক তালপাতার পুঁথিতে লেখা আছে ইতিহাস, তারই মাঝে উদ্ভাসিত বঙ্গবন্ধুর মুখচ্ছবি। চারুকলা অনুষদের শিক্ষক, শিল্পী অমিত নন্দীর আঁকা এই ছবি যেন বাংলার ইতিহাসের ধারাবাহিকতার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মহানায়কোচিত উত্থানের ভাষ্য নির্মাণ করেছে চিত্রপটে। খ্যাতনামা আরও অনেক শিল্পীই এমন নানা আঙ্গিকে এঁকেছেন বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি আলেখ্য।
গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় জাদুঘরের গ্যালারিতে ‘আছো সত্তায় আছো চেতনায়’ শিরোনামে ‘তারুণ্য কথা’র এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেছেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী ও শিল্পী জামাল আহমেদ। প্রদর্শনীটি আগামী ২৯ মে ২০১৯ পর্যন্ত চলবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভসহ এস.এম. সুলতান বেঙ্গল চারুকলা মহাবিদ্যালয় ও নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের ১০০ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী-শিল্পী এই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন।
প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন সমরজিৎ রায় চৌধুরী, শেখ আফজাল, মামুন কায়সার, মোহাম্মদ নজীব, রবিউল ইসলাম, কিরীটি রঞ্জন বিশ্বাস, নাজিব তারেক, গুপু ত্রিবেদী, নাজির খান খোকন, আবদুস সাত্তার তৌফিক, সুমন ওয়াহিদ, মুক্তি ভৌমিক, চিন্ময়ী শিকদার, আসমিতা আলম শাম্মী, ছোটন চন্দ্র রায়, তমা সাহা, আফি আজাদ বান্টি, জাহাঙ্গীর হোসেইন, আজমল হোসেন, কঙ্কা জামিল, রনি মণ্ডল, বিপ্রজিৎ রায় প্রমুখ।

‘তারুণ্য কথা’ সংগঠনটির আহ্বায়ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থী ও শিল্পী মো. আতিকুর রহমান দীপু এই প্রদর্শনী সম্পর্কে বলেন, ‘আগামী ১৭ মার্চ ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকীকে ঘিরে শুরু হচ্ছে ২০২০-২১ সালকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে উদযাপন। ‘মুজিব বর্ষ’ উদ্যাপনে তরুণদের অনুপ্রাণিত করতেই তিন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে এই আয়োজন করেছি আমরা।’
তিনি আরও জানান, শিল্প-সমালোচকদের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এখানকার সেরা চিত্রকর্মটি বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দেওয়া হবে এবং জাদুঘরে এই কেন্দ্রীয় প্রদর্শনীর পর ধারাবাহিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে এই প্রদর্শনী করা হবে। এ ছাড়া ‘মুজিব বর্ষ’ উপলক্ষে বাছাইকৃত চিত্রকর্মগুলো ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ভারতসহ দশটি দেশে প্রদর্শনেরও পরিকল্পনা রয়েছে তারুণ্য কথা’র।
