মোদির শাসনে ভারত কোন পথে হাঁটবে

আপডেট : ২৪ মে ২০১৯, ১০:০৫ পিএম

এবারের ভারতের নির্বাচন অনেক দিক দিয়েই যে গুরুত্বপূর্ণ তা আগেও বলেছি। এখন আর নতুন করে তা মনে করিয়ে দেওয়ার মানে হয় না। সারা পৃথিবীর লোক জেনে গেছে আমার দেশের নির্বাচনের ফলাফল কী হয়েছে। চুলচেরা বিশ্লেষণ তখনই সম্ভব, যখন প্রত্যেক লোকসভা আসনের কেন্দ্রওয়ারি ফল আসবে। কিন্তু এবার যাবতীয় সমীক্ষাকেও অনেক পেছনে ফেলে মোদি সুনামি যেভাবে আছড়ে পড়েছে তা নিয়ে কিছু কথা বলতেই হয়। গতকাল একজনকে হাল্কা ঠাট্টা করে বলছিলাম যে, এবারের মোদি তুফান বিজেপির পক্ষে যত উল্লাসের, তার চেয়ে বেশি আনন্দের শেয়ারবাজারের। সেনসেক্স লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। মোদি অমিত শাহের ওপর যারা বাজি ধরেছিলেন তারা ইতোমধ্যেই লাভের টাকা ঘরে এনেছেন। আর সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র, গবেষকদের তো এই নির্বাচন, গণতন্ত্রের কাঠামো, দেশ আগামী দিনে কোন পথে হাঁটতে চলেছেÑ তা নিয়ে তত্ত্বতালাশের জন্য এ এক সোনার সুযোগ। কোনো সন্দেহ নেই যে, এবারের ভারতীয় লোকসভা নির্বাচন নিয়ে বিস্তর গবেষণা হবে। বইপত্তর বের হবে। অনেক তরুণ এই বিষয়ের ওপর কাজ করে থিসিস জমা দিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি পাবে। কিন্তু এসব তো মধ্যবিত্তীয় অ্যাকাডেমিক ভাবনাচিন্তা। কিন্তু দেশের সার্বিক পরিসরে এবারের ভোট কতটা প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যতই দিন যাবে ততই নানা রকমের পর্যালোচনা চলতেই থাকবে।

 

তবে তার আগে আসবেÑ কী করে এ রকম মোদি ম্যাজিক ভারতের মতো এক বিশাল দেশে ঘটতে পারল! যে দেশের জনসংখ্যা ১৩০ কোটির বেশি। যে দেশে প্রতি পাঁচ কিলোমিটার অন্তর মানুষের জীবনযাপন, ভাষা, খাওয়ার অভ্যাস পাল্টে যায়, সেখানে একজনের অঙ্গুলি হেলনে আসমুদ্র হিমালয় এক সূত্রে বাধা পড়ল তা নিয়ে আবেগের পাশাপাশি যুক্তি দিয়েও বিশ্লেষণ করা দরকার। মুশকিল হচ্ছে এই যুক্তিভিত্তিক বিষয়টারই বড় অভাব আমাদের এই উপমহাদেশে। আর ভারতে তো সনাতন কোনো ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই খুন অবধি হতে হয়েছে গৌরি লঙ্কেশ, কালবর্গী, গোবিন্দ পানেসরের মতো যুক্তিবাদী ও সাহসী সাংবাদিকদের।

 

যুক্তি যত পিছু হটেছে ততই জায়গা নিয়েছে ভাবাবেগ। এই যুক্তিহীন আনুগত্য প্রতিষ্ঠানকে কখনো চ্যালেঞ্জ জানাতে সাহস করে না। অন্ধ আনুগত্যের পথ ধরেই বিকশিত হয় ধর্মান্ধতা ও প্রশ্নাতীত অন্ধ বিশ্বাস। যে অন্ধত্বকে কয়েক বছর ধরে আমার দেশ শুধু নির্মাণ করেনি, বহু যতেœ লালনও করেছে। বিষয়টি স্পষ্ট বুঝতে পারবেন নতুন করে যদি আর একবার ইবসেনের ‘এনিমি অব দ্য পিপল’ বা গণশত্রু পড়ে নেন। সত্যজিত রায়ের সিনেমা গণশত্রুটাও আর একবার দেখে নিতে পারেন। সিনেমাটা দেখলে আজকের ভারতে যে নরেন্দ্র মোদির জয়জয়কার তার পটভূমি বুঝতে সুবিধা হবে।

 

স্বাধীনতার পরে এই প্রথম নির্বাচনে আমরা এক নতুন পথে হাঁটতে চলেছি। নেহরু জামানার অর্থনীতি আগেই বাতিল হয়ে গেছে, ১৯৯১ সালে বিশ্বায়নের হাত ধরে মুক্ত অর্থনীতির দৌলতে। এবার সম্ভবত নেহরু যুগের অন্তত ঘোষিত রাজনীতিরও অবসান ঘটল নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে।

 

আগের ভারত মনে হয় আর আমরা ফিরে পাব না। খেয়াল করে দেখুন যে, এবারের নির্বাচনে ইচ্ছে হোক বা অনিচ্ছাকৃত কারণে পদ্ধতি বদলে গেছে। আমেরিকার মতো এবার আমাদের দেশেও প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্মে নির্বাচন হয়েছে। নিশ্চয়ই এখানে গণতন্ত্রের আবরণ একটা ছিল। কিন্তু ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলেই আমাদের সাবেক ভোট পদ্ধতির এই বদলটা বুঝতে পারবেন। করপোরেট পুঁজির যাবতীয় লগ্নি বিজেপি পার্টি নয়, বিনিয়োগ হয়েছে নরেন্দ্র মোদি ব্র্যান্ডের ওপর। ভারতের বিখ্যাত বিজ্ঞাপন মস্তিষ্ক প্রসুন যোশী, পিয়ুস পান্ডে উদয়াস্ত ভেবেছেন কীভাবে মোদির ইমেজ নির্মাণ করা যায়।

 

সবমিলিয়ে ছবিটা একদম গতবারের যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো। তাই লড়াইটা শেষমেশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল মোদি বনাম ধারেভারে দুর্বল বিরোধী শক্তির। ট্রাম্পের সঙ্গে মোদির অন্য এক বিষয়েও মিল আছে। দুজনেরই রাজনৈতিক প্রচারের বিরাট জায়গা জুড়ে ছিল অনুপ্রবেশ ইস্যু। শেষ দিকে প্রচারের অন্যান্য বিষয়Ñ অর্থনীতি, কৃষক সমস্যা, বেকারত্ব সব পেছনে চলে গিয়ে সামনে এসেছিল অনুপ্রবেশ ও ধর্মীয় মেরুকরণ।

 

উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন এবার প্রভাব ফেলেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমনে। মিলিট্যান্ট হিন্দুত্ব গো বলয়ের চিরকালীন জাতপাতের অঙ্ক পেছনে সরিয়ে এক ছাতার তলায় যাবতীয় হিন্দু ভোট সংহত করেছে বলেই বিহারে তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাময় নেতা জে এন ইউএর কানাইয়াকুমার মোদি ঝড়ে স্রেফ শুকনো পাতার মতো উড়ে গেছেন। নরেন্দ্র মোদির আসল মস্তিষ্ক আর এস এস কে যারা জানেন তারা মানবেন যে, সন্তর্পণে ধীরে ধীরে সংগঠন বিস্তারে তাদের দক্ষতা অনস্বীকার্য। স্বাধীনতার আগে থেকেই, বলা যায় ১৯২৫-এ আর এস এসের জন্ম সময় থেকে যে কল্পনার হিন্দুরাষ্ট্র তা এত বছর বাদে বাস্তব চেহারা নিতে চলেছে। আপাতত এই পরিবর্তন নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইভিএম দুর্নীতি টুর্নীতি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। হিন্দি ভাষায় একটা কথা আছেÑ যো জিতা ওহি সিকান্দার। জনমত মোদির পক্ষে রায় দিয়েছে। যতই জনমত নির্মাণ নিয়ে আপনি ঝুড়ি ঝুড়ি প্রমাণ দিন না কেন! জয়ীদের কথাই লোকে শোনে। পরাজিতদের কোথাও কোনো জায়গা নেই। ইতিহাসের সর্বকালে সব যুদ্ধেই এ রকমই হয়ে চলেছে।

 

এখনো তাই ভিন্নমত বা অন্য যুক্তির জায়গা নেই। আগামী দিনের ভারত আগেও বলেছি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আনুষ্ঠানিক না হলেও এই ভারত অনেক বেশি ব্যক্তি নির্ভর। এর একটা সুবিধা আছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে আমলাতান্ত্রিকতা কমবে। যেকোনো কঠিন বিষয়, তা সে অস্ত্র চুক্তি, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বা অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা দমন যা-ই হোক, অর্ডিন্যান্স জারি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন মোদিজি। মিলিটারি খাতে ব্যয় বরাদ্দ মনে হয় বাড়বে। সামাজিক সুরক্ষার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে জাতীয়তাবাদী রণহুংকার। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রভূত সংস্কারের পথে হাঁটবে নতুন সরকার। আমদানিনির্ভর রপ্তানিমুখী নীতির গুরুত্ব বাড়বে। করপোরেট পুঁজির বিকাশ দ্রুত হবে। সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়তে পারে। সরকারি শিল্পের গুরুত্ব কমবে। প্রাইভেটাইজেশন অগ্রাধিকার পাবে।

 

এসব আগাম অনুমান। বিজেপির মতাদর্শ বা কাজের ধরন ধারণা অনুযায়ী ভবিষ্যদ্বাণী। একটা বিষয় উদ্বেগের। এবার ভোটের ফল মোটের ওপর দেশকে বিরোধী শূন্য করে দিয়েছে। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক। এই এককেন্দ্রিক ঝোঁক যেকোনো শাসককেই আত্মম্ভরি স্বৈরতান্ত্রিক পথে নিয়ে যেতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত