সারা দেশের শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিন বিনামূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেওয়া সরকারের অন্যতম অর্জন। নতুন বইয়ের গন্ধে খুশিতে মেতে ওঠে শিক্ষার্থীরাও। বইগুলো বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পরই হতাশায় ভেঙে পড়ে অনেক শিশু। কারণ, বইগুলো ছাপা হয় নিম্নমানের কাগজে। হাতের ঘষায় উঠে যায় ছাপানো কালি, ছবিও বোঝা যায় না। বছর পেরোনোর আগেই ছিঁড়ে নষ্ট হয়ে যায় বইগুলো।
২০২০ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল ও ভোকেশনাল স্তরের জন্য ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ ৯৫ হাজার ৭৭২টি বই ছাপছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এসব বই আগামী বছরের প্রথম দিন ৪ কোটি ৩৭ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হবে। নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সনদযুক্ত কাগজ দিয়ে বই ছাপানোর কথা থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। মানহীন কাগজে বই ছাপানোর কারণে কোমলমতি শিশুদের মন খারাপ করে দেওয়ার সঙ্গে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্বও হারাচ্ছে সরকার।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বরাবরই নিম্নমানের কাগজে মুদ্রণ করা হচ্ছে বেশিরভাগ পাঠ্যবই। কাগজের জিএসএম, ব্রাস্টিং ফ্যাক্টর, ব্রাইটনেস অনেক কিছুই ঠিক থাকছে না। পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের জন্য এনসিটিবি দরপত্রের মাধ্যমে কাগজ কিনে তা মুদ্রণকারীদের সরবরাহ করে থাকে। আবার কাগজসহ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের জন্য মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কাছেও দরপত্র আহ্বান করা হয়। বাস্তবে দেখা যায়, দুটি ক্ষেত্রেই দরপত্রে মানসম্মত কাগজের যে স্পেসিফিকেশন দেওয়া থাকে, সে অনুযায়ী কাগজ না নিয়ে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানো হয়।
সূত্র জানায়, প্রতি বছরই এনসিটিবির দরপত্রের বিপরীতে কতিপয় অসাধু প্রতিষ্ঠান ও বিএসটিআই মানসনদবিহীন নিম্নমানের মিল কাগজ সরবরাহ করছে। বিদ্যমান বাজারদর এবং এনসিটিবির প্রাক্কলিত দরের তুলনায় অনেক কম দর দিয়ে মানহীন পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করে চলছে কিছু প্রতিষ্ঠান। ভালো মানের উৎপাদনকারীরা বাজারদর অনুযায়ী দরপত্র জমা দিয়েও কাজ পায় না। অথচ বিএসটিআই আইন-২০১৮ অনুসারে লেখা ও ছাপার কাগজ পণ্য-সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মান (বিডিএস ৪০৫ : ২০১২) অনুযায়ী ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মানসনদ নেওয়ার পর বিক্রয়, বিতরণ ও বাজারজাত করা বাধ্যতামূলক। বিএসটিআইয়ের আইন সবার জন্য মানা বাধ্যতামূলক হলেও নিম্নমানের কাগজ উৎপাদনকারী মিলগুলো ওই আইন না মেনেই ব্যবসা করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে বারবার বিএসটিআই থেকে এনসিটিবিকে সরকারি আইন মেনে চলার তাগিদ দেওয়া হলেও তারা মানছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাঠ্যপুস্তকে মানহীন কাগজ ব্যবহার না করতে সর্বশেষ গত ২ এপ্রিল বিএসটিআই থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পত্র দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে ১০৬টি কাগজের মিল থাকলেও মাত্র ১৯টি মিল বিএসটিআইয়ের মানসনদ গ্রহণ করেছে। এই ১৯টি মিল নিয়মিত সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছে এবং মানসম্মত কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য উৎপাদন করছে। প্রতি বছর এনসিটিবির ৩৫ কোটিরও বেশি বই মুদ্রণের জন্য প্রায় ৮০ হাজার টন কাগজ প্রয়োজন হয়। টনপ্রতি ৮৪ হাজার টাকা প্রাক্কলিত দরে ৮০ হাজার টন কাগজের মূল্য দাঁড়ায় ৬৭২ কোটি টাকা। এই কাগজ থেকে বিএসটিআইয়ের মার্কিং ফি পাওয়ার কথা থাকলেও মানহীন কাগজ ব্যবহার হওয়ায় তা পাওয়া যাচ্ছে না। বিক্রয়মূল্যের ওপর বিএসটিআইয়ের দশমিক ১ শতাংশ হারে মার্কিং ফি পাওয়ার কথা, যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৭ লাখ টাকারও বেশি। এভাবেই নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই ছাপানোয় প্রতি বছর সরকার প্রায় কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
এসব ব্যাপারে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, কাগজের মান দেখার জন্য আমরা ইন্সপেকশন এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছি। আমাদের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মান পরীক্ষা করে কাগজ ছাড় করে ইন্সপেকশন এজেন্ট। ফলে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার কোনো সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সিন্ডিকেট করেই এনসিটিবির বইয়ের কাজ পায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান। তারা বিএসটিআইয়ের মানসনদ ছাড়া কাগজের মিলে উৎপাদিত নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে। সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়া এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তা সবকিছু জেনেশুনেও না জানার ভান করেন। এতে সরবরাহকারী ও মুদ্রাকররা নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করেও পার পেয়ে যান। কিন্তু নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানো হলে ছাপার মান খারাপ হয় এবং বই টেকসই হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বইয়ে ছাপানো ছবি থেকে কালি উঠে যায়, ছবি বোঝা যায় না। এ ছাড়া নিম্নমানের কাগজে নানা ধরনের রোগজীবাণু থাকে, যা শিশুস্বাস্থ্য ও চোখের জন্য ক্ষতিকর।
এনসিটিবিতে মুদ্রণ কাজের তদারককারী প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেখানে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের একটি অংশের সহায়তায় মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে রি-সাইকেলড বা পুরনো কাগজ ব্যবহার করে উৎপাদিত কাগজ কিনে নিম্নমানের বই ছাপাচ্ছে।
২০১৯ শিক্ষাবর্ষের জন্য এনসিটিবির মুদ্রিত বইয়ের কাগজের গুণগত মান বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়। এনসিটিবির দরপত্রে টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনে জিএসএম ৬০ ও ব্রাইটনেস ৮৫ শতাংশের কথা উল্লেখ থাকলেও পরীক্ষায় জিএসএম ৪৬.৫৬ ও ব্রাইটনেস ৬৬.৪৪ শতাংশ পাওয়া যায়। এতে বছরের অর্ধেক সময় পার না হতেই ছিঁড়ে যাচ্ছে পাঠ্যবই।
এর আগে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতি এনসিটিবিতে সরবরাহ করা কাগজ বিসিএসআইআর গবেষণায় পরীক্ষার জন্য পাঠায়। তাতে দেখা যায়, এনসিটিবি তার দরপত্রে যে টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন উল্লেখ করেছিল, সরবরাহ করা কাগজের মান তারচেয়ে নিম্নমানের। কাগজের ‘ব্রাস্টিং ফ্যাক্টর’ কমপক্ষে ১২ থাকার কথা থাকলেও পরীক্ষায় পাওয়া গেছে মাত্র ৮.৫৮, ‘ব্রাইটনেস’ কমপক্ষে ৮০ থাকার কথা অথচ আছে ৬৭.৭৮ এবং ‘জিএসএম’ ৬০-এর বেশি থাকার কথা থাকলেও আছে ৫৮.৮৯। আর কাগজ কতটা মজবুত, কতদিন টিকতে পারে সেজন্য কাগজের ‘ফেয়ার ফ্যাক্টর’ কত তা জানা জরুরি। অথচ স্পেসিফিকেশনে এ ধরনের কোনো চাহিদাই নেই।
বিএসটিআইয়ের সিএম সনদহীন কারখানার কাছ থেকে নিম্নমানের কাগজ না কিনে শুধুমাত্র বিএসটিআই মানসনদপ্রাপ্ত কারখানা থেকে কাগজ সংগ্রহ করার জন্য বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) পক্ষ থেকেও বারবার শিল্পমন্ত্রীসহ অর্থমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, এনসিটিবি চেয়ারম্যান ও বিএসটিআই মহাপরিচালক বরাবর আবেদন জানানো হয়। আবেদনে বলা হয়, এনসিটিবি আইনের তোয়াক্কা না করে বিএসটিআই মান ছাড়াই কাগজ ক্রয় ও বই মুদ্রণ করে চলছে। এতে একদিকে আইন অমান্য করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মুদ্রিত বইয়ের গুণগত মান বজায় থাকছে না। শিক্ষার্থীরা মানসম্মত বই না পাওয়ায় বই উৎসবের মতো সফল অর্জন সঠিকভাবে মূল্যায়ন হচ্ছে না। একই সঙ্গে ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে সরকারের এবং সিএম লাইসেন্স ফি বাবদ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে বিএসটিআই সনদ বাধ্যতামূলক করতে বিপিএমএ একাধিকবার এনসিটিবির কাছে আবেদন জানালেও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
