সিরাজগঞ্জের ইউএনওকে ধান কিনতে বাধা দেওয়া মামলায় গ্রেপ্তার নেই

হামলাবাজ যুবলীগ নেতা রেজা

আপডেট : ২৭ মে ২০১৯, ০২:১০ এএম

সিরাজগঞ্জে ইউএনওকে ধান কিনতে বাধা দিয়ে আলোচনায় আসা যুবলীগ নেতা সাজ্জাদুল হক রেজার বিরুদ্ধে একের পর এক হামলা চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। বলা হচ্ছে, তার হামলা থেকে আওয়ামী লীগ ও সমমনা সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরাও রেহাই পায়নি। সর্বশেষ কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনাকে কেন্দ্র করে তিনি বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুর রহমানের ওপর হামলা চালিয়েছেন। এ ঘটনায় ইউএনও বাদী হয়ে মামলাও করেছেন। এর পর থেকে     

পলাতক রেজা। যুবলীগ নেতার এসব কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার সংগঠন ও সমমনা কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সংগঠনগুলোর কয়েকটির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরের কাছে এ ক্ষোভের কথা জানান। কিন্তু রেজার ভয়ে অনেকেই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান লাজুক বিশ্বাস ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন জানান, নিজের সুবিধার জন্য সবকিছু করতে পারেন রেজা। তার হামলা থেকে রেহাই পাননি সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী এবং সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুল লতিফ বিশ্বাস, সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মজিদ ম-ল, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বেলকুচি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ আলী আকন্দ, সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও বেলকুচি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হামিদ আকন্দ, বেলকুচি পৌর মেয়র বেগম আশানুর বিশ্বাস, বেলকুচি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক সরকার, বেলকুচি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি গোপাল চন্দ্র, সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন, ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল ও রাশেদ। এ ছাড়া ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও দলীয় নেতাকর্মীরাও তার হামলা ও মারপিট থেকে বাদ পড়েনি। সর্বশেষ রেজার হামলার শিকার হয়েছেন বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুর রহমান।

ইউএনও জানান, কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান না কিনে পছন্দের তালিকা অনুযায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে ধান কিনতে বলেন রেজা। কিন্তু তিনি তাতে রাজি না হওয়ায় তার ওপর এ হামলা চালানো হয়। তাকে প্রাণনাশেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, গত বুধবার দুপুরের এ ঘটনায় তিনি ওই রাতে নিজেই বাদী হয়ে বেলকুচি থানায় মামলা করেন।

এ মামলায় উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক সাজ্জাদুল হক রেজা ছাড়াও বেলকুচি পৌর শ্রমিক লীগের সভাপতি আরমান, ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতা রিয়াদ হোসেন, যুবলীগ নেতা রিপন, সাইফুল, জহুরুল এবং সোহাগের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলা হওয়ার পর র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও পুলিশ দফায় দফায় অভিযান চালালেও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকেই গত ৩ দিনে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

রেজার উত্থান যেভাবে : বেলকুচি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন জানান, রেজার সহোদর, সাবেক ছাত্রদল নেতা ও বেলকুচি উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম সাজেদুল আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল লতিফ বিশ্বাসের বড় মেয়ে সোমা বিশ্বাসকে বিয়ে করেন। এর পর থেকেই বিশ্বাস পরিবারের সঙ্গে রেজার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে তার তালই ও মাউইয়ের আশীর্বাদে দলে পদ-পদবি পেতে থাকেন রেজা। দীর্ঘদিন একসঙ্গে উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও যুবলীগের আহ্বায়কের পদ নিজের দখলে রাখেন তিনি। এ ছাড়া বেলকুচি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে চাকরি করলেও কোনো দিন অফিস না করেই নিয়মিতভাবে বেতন উত্তোলন করেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও আওয়ামী লীগ নেতা জানান, মাঝখানে ছাত্রলীগের পদ ছাড়লেও রেজা রয়েছেন যুবলীগে। আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয়বার সরকার গঠনের প্রথমবার আব্দুল লতিফ বিশ্বাস মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছিলেন। মন্ত্রীপতœী আশানুর বিশ্বাস প্রথমে ছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান। বর্তমানে তিনি পৌর মেয়র। আত্মীয় রেজা ছিলেন তাদের বড় অস্ত্র। সে সময় দলের মাঠপর্যায়ের অনেক কিছু রেজাই নিয়ন্ত্রণ করতেন। বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে বেলকুচি-চৌহালী আসনে মনোনয়ন পান শিল্পপতি আবদুল মজিদ ম-ল। মনোনয়ন থেকে বাদ পড়েন আব্দুল লতিফ বিশ্বাস। এ অবস্থায়ও প্রায় আড়াই বছর রেজা তার তালই আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের সঙ্গেই ছিলেন। সে সময়ের এমপি আবদুল মজিদ ম-লের গাড়িতে একাধিকবার হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও দলের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন রেজা। একপর্যায়ে এমপি আবদুল মজিদ ম-লের সঙ্গে রেজার সখ্য গড়ে উঠলে তালই ও মাউইয়ের ভালোবাসা ভুলে গিয়ে রেজা তাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়াতে থাকেন।

স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, রেজার নেতৃত্বেই পৌর মেয়র আশানুর বিশ্বাসের ওপর হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় রেজাকে হাজতও খাটতে হয়। জামিনে মুক্ত হয়ে এসে রেজা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তার তালই সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে বেলকুচি উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে যেতে বাধা দেন তিনি। কোনো স্থানে লতিফ বিশ্বাস মিটিং ডাকলে রেজা তার সমর্থকদের দিয়ে ওই স্থানে পাল্টা মিটিং ডেকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতেন। এ অবস্থায় সরকারের বর্তমান মেয়াদে সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ বিশ্বাস আবারও সংসদ সদস্য পদে মনোনয়নবঞ্চিত হন। আর দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন আব্দুল মজিদ ম-লের ছেলে আব্দুল মোমিন ম-ল। ফলে যুবলীগ নেতা রেজা হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য।

প্রথম দফা উপজেলা নির্বাচনে রেজা বেলকুচি উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে তৃণমূলের ভোটে জয়ীও হন। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটি মোহাম্মদ আলী আকন্দকে পুনরায় মনোনয়ন দেন। এরপর রেজা তার বড় ভাই ছাত্রদলের সাবেক ভিপি নুরুল ইসলাম সাজেদুলকে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দেন। এতে বনানী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেনের ছোট ভাই সিরাজুল ইসলামও নির্বাচনে অংশ নেন। ভোটের মাঠে ভাইকে জেতাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান রেজা। ভোটগ্রহণ শেষে গণনা চলার সময়ও প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। গভীর রাত পর্যন্ত ভোট গণনায় সরকারি স্কোর বোর্ডে ঘোষিত তথ্য অনুযায়ী সিরাজুল ইসলাম এগিয়ে ছিলেন।

স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষ্য, ভোটের দিন গভীর রাতে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রেজার ভাই নুরুল ইসলাম সাজেদুলকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তখন প্রশাসনের তরফে দাবি করা হয় কম্পিউটারে ভুল টাইপ হওয়ার কারণে সিরাজুল ইসলাম ভুলক্রমে এগিয়ে ছিলেন। এ নির্বাচনে বিদ্রোহীদের কারণে ধরাশয়ী হন নৌকার প্রার্থী। ফলাফল বর্জন করে সিরাজুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে পুনরায় ভোটগ্রহণের দাবি জানালেও তাতে কোনো সুফল পাননি তিনি। এ অবস্থায় বর্তমান এমপি মোমিন ম-ল ও নিজ ভাইয়ের ক্ষমতার পাশাপাশি নিজের আধিপত্য কাজে লাগিয়ে বেলকুচি উপজেলার রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন রেজা। নিজের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ধান ক্রয়ে রাজি না হওয়ায় বেলকুচির ইউএনওকে হুমকি দেন তিনি। কিন্তু ইউএনও এ ঘটনায় মামলা করায় দলবল নিয়ে রেজা এখন পালিয়ে আত্মগোপনে। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত