আওয়ামী লীগ সরকার গত সাড়ে দশ বছরে কিছু জিনিস মানুষের মাথায় গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে অব্যাহতভাবে। তার মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু আসলেই কি বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ?
খাদ্য তালিকাটা একটু মনে করুন। তালিকাটা অনেক লম্বা নিঃসন্দেহে। যার মধ্যে অনেকগুলো আমাদের দেশে উৎপন্নই হয় না। আচ্ছা বাদ দিন অত বড় লম্বা তালিকা। শুধু দুটো প্রধান খাদ্যশস্য চাল ও গমের কথাই ধরুন। আমরা কি এ দুটিতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ? আরও ছোট করে শুধু চালের কথাই না হয় ধরুন। আমরা কি চালেও স্বয়ংসম্পূর্ণ?
এই তো সপ্তাহ দুই আগেই দৈনিক যুগান্তর লিখল, ভরা মৌসুমেও টনে টনে ভারতীয় চাল আমদানি। দেশের অন্যতম বৃহৎ দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে গত দেড় মাসে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন চাল। গত এপ্রিল মাসে ভারত থেকে চাল এসেছে ৯ হাজার ১৭৮ মেট্রিক টন। গত ১৫ মে পর্যন্ত এই বন্দর দিয়ে চাল এসেছে ৫ হাজার ২শ’ মেট্রিক টন। দিনে গড়ে ৩শ’ মেট্রিক টন চাল ঢুকছে হিলি বন্দর দিয়ে।
দৈনিক প্রথম আলো জানিয়েছে, সরকারি হিসাবে গত বছরের বন্যায় বড়জোর ১০ লাখ টন চালের উৎপাদন কম হয়েছিল। কিন্তু গত এক বছরে সব মিলিয়ে ৩৭ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। আমদানির প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরও ৪৫ লাখ টন। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সরকারি-বেসরকারিভাবে গত ১০ মাসে ২ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। আমদানির অপেক্ষায় রয়েছে আরও ৩ লাখ ৮০ হাজার টন চাল।
এবার একটু সরকারি হিসাবটা খতিয়ে দেখা যাক। বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে (https://mofood.gov.bd) গিয়ে যে কেউ দেখতে পারেন এ হিসাব। মন্ত্রণালয় বলছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের ১০ বছরে চাল আমদানি করা হয়েছে ৯৪ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন। আর এ সময়ে গম আমদানি করা হয়েছে ৩ কোটি ৫০ লাখ ৭৯ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন চাল ও ২৩ লাখ ৫৬ হাজার ২০০ মেট্রিক টন গম আমদানি করা হয়েছে। সাড়ে দশ বছরে মোট চাল আমদানি ৯৭ লাখ ৩৮ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। গম আমদানি হয়েছে ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন।
খাদ্য তালিকার অন্য সব আইটেম বাদ রেখে শুধু চাল-গম ধরলেও সাড়ে দশ বছরে এ প্রধান খাদ্যশস্যের আমদানির পরিমাণ ৪ কোটি ৭১ লাখ ৭৪ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন! আর এ সময়ে কিছু সুগন্ধি চাল ও কেবল একবার শ্রীলঙ্কায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন চাল ছাড়া আর কোনো রপ্তানির নজির নেই।
খাদ্য মন্ত্রণালয় মজুদ পরিস্থিতি নিয়ে তাদের ওয়েব সাইটে জানিয়েছে (২৮ মে ২০১৯), ‘২৪-২৬/০৫/২০১৯ খ্রি. তারিখে খাদ্যশস্যের সরকারি গুদামজাতকৃত মোট মজুদ ১৩ দশমিক ৭৪ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ১১ দশমিক ৭৪ লাখ মেট্রিক টন এবং গম ২ লাখ মেট্রিক টন। খাদ্যশস্যের মজুদ সন্তোষজনক, মাসিক চাহিদা ও বিতরণ পরিকল্পনার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এ মুহূর্তে খাদ্যশস্যের কোনো ঘাটতি নেই বা ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই।’
এবার হিসাবটা মিলিয়ে দেখা যাক। সাড়ে দশ বছরে ৯৭ লাখ ৩৮ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন চাল ও ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন গম আমদানি করা হলেও মজুদ কেন ১১ দশমিক ৭৪ লাখ মেট্রিক টন চাল ও ২ লাখ মেট্রিক টন গম? আমরা যদি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই হয়েই থাকি তাহলে আমদানি থেকে মজুদ বাদ দিয়ে বাকি এই প্রায় সাড়ে ৮৫ লাখ মেট্রিক টন চাল ও প্রায় পৌনে ৪ কোটি মেট্রিক টন গম দিয়ে কী করেছি? কোথায় গেল সেই চাল-গম?
পরিসংখ্যান বলছে দেশ মোটেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। অন্যদিকে সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের চাল আমদানির সুযোগ দিয়ে দেশ থেকে টাকা পাচারের সুযোগ করে দিচ্ছে কি না সে প্রশ্নও উঠেছে। ২০১৬ সালে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ অর্থ পাচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩-১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে যত চাল বিদেশ থেকে আনা হয়েছে, তার আমদানি মূল্য ছিল টনপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার ডলার। অথচ এ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের গড় মূল্য ছিল টনপ্রতি প্রায় ৫০০ ডলার।’ ওই বাড়তি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে সিপিডির প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয়।
একদিকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দাবি করে আত্মপ্রসাদে ব্যস্ত সরকার, অন্যদিকে কৃষকের মাথায় হাত। তাদের ধান উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচের তুলনায় বিক্রির দর অনেক কম। বাজারে বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৫০০-৫৫০ টাকায়। এই দামে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও উঠছে না কৃষকের। প্রতি বিঘায় ধান চাষের আয় ব্যয় শেষে কৃষককে লোকসান গুনতে হয় দুই-তিন হাজার টাকা।
এই লোকসানের মুখে ত্যক্তবিরক্ত কৃষক রাগে-দুঃখে পাকা ধান ক্ষেতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিতেও পিছপা হননি। একজন কৃষকের কাছে তার ক্ষেতের ফসল সন্তানের মতো। কত কষ্টে রোদে-বৃষ্টিতে লালন করেন তার ফসল। সেই ফসল যখন ঘরে তোলার কথা তখন নিজ হাতে তা পুড়িয়ে ছাই করে দেন মাঠেই! অভাবের তাড়নায় নিজ সন্তানকে হত্যার মতোই এই অসহায় কৃষকরা আগুন ধরিয়ে দেন নিজের পাকা ধান ক্ষেতে!
একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেশি অন্যদিকে বিক্রির দর কম। সেই প্রেক্ষাপটে যখন কৃষক রাগে-দুঃখে ধান ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দেন তখন সরকার তা নিরসনে চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করে বেছে নেয় নাটুকে পথ। দলের নির্দেশে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা ডিজাইন করা নতুন লুঙ্গি, গামছা, গেঞ্জি, জুতা-স্যান্ডেল পরে নেমে যান ধান ক্ষেতে, শুরু করেন ধানকাটা-সেলফি। একই পথ ধরেন কিছু পুলিশ সদস্যও।
ধানের ন্যায্যমূল্যপ্রাপ্তির দাবিটাকে আওয়ামী লীগ ও তাদের অনুগত মিডিয়া ইতিমধ্যে শহুরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধান কাটার সংকট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। ধান কাটা নিয়ে রীতিমতো সেলফি উৎসব চলছে। এতে কৃষকের যে কোনো লাভ হয়নি সেটা বোঝার জন্য গবেষক হওয়ার দরকার নেই।
আওয়ামী লীগ এমন একটি সংঘবদ্ধ দল যে, তারা কোনো একটা বিষয়ে তাদের টার্গেট নির্ধারণ করে। তারপর শীর্ষ পর্যায় থেকে একটা সুর ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই সুর সমস্বরে চলতে থাকে সর্ব নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত। এভাবে তারা তাদের বক্তব্য সবার মাথায় গেঁথে দিতে যা করণীয় তার সবই করে। এতে অন্তত তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের মাথায় সেই বক্তব্য সত্যের আদলে গেঁথে যায় শক্তপোক্ত ভাবেই। সাধারণ নির্দলীয় মানুষও বিভ্রান্ত হন কখনো কখনো। এক সময় তাদের কেউ কেউও মনে করতে থাকেন, ব্যাপারটা হয়তো আসলেই তাই। এই ক্ষেত্রে মিডিয়ার একটা বড় অংশ হয় তাদের সহায়ক। ফলে তারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে কমই।
