সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (১৮) হত্যা মামলায় ১৬ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গতকাল বুধবার দুপুরে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদারককারী পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবাল ও তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম। ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের সুপারিশ করা হয়েছে। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আজ বৃহস্পতিবার শুনানির দিন ধার্য করেন। এদিকে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্রে সোনাগাজীর বিতর্কিত সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে অন্তর্ভুক্ত না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাদীপক্ষ। হত্যা মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নুসরাত হত্যা মামলার এজাহারকারী মাহমুদুল হাসান নোমান তার দায়েরকৃত এজাহারে ৮ জনের নাম দিয়েছেন। এ মামলায় ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৬ জনকে রেখে ৫ জনকে বাদ দিয়ে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। বাদ দেওয়া ৫ জন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আছেন কি না বা বাদীর তাদের ব্যাপারে কোনো আপত্তি আছে কি না, তা এজাহারকারীর সঙ্গে আলাপ করে আদালতে নারাজি দেওয়া হবে।’ পিবিআইয়ের দেওয়া অভিযোগপত্রে ওসি মোয়াজ্জেমের নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘নুসরাত হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিতভাবে আত্মহত্যা বলে প্রচারণা চালান তিনি। কিন্ত তাকে আসামি করা হয়নি।’
মামলার বাদী ও নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেম নুসরাত হত্যাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করেন। কিন্তু তাকে চার্জশিটে রাখা হয়নি। এ ঘটনায় আমি ও আমার পরিবার হতবাক হয়েছি।’ পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে না-রাজি দেবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগামীকাল চার্জশিট দেখে ও আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
এর আগে বেলা পৌনে তিনটার দিকে অভিযোগপত্রের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবাল। এ সময় তিনি বলেন, ‘নুসরাত হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করে আজ (গতকাল) আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ জনের নামে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে মামলার এজহারনামীয় ৮ জন ও এজহার বহির্ভূত তদন্তে প্রাপ্ত ৮ জন। আমরা সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়ে সুপারিশ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত ১০ এপ্রিল থেকে মোট ৫০ দিনে ৩৩ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল করেছি। এ মামলায় সর্বমোট ৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। অপর সাক্ষীরা হলেন বিশেষজ্ঞ, বাদী, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিজার লিস্টের সাক্ষী। এ মামলায় ৭ জন সাক্ষী ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ও ১২ আসামি নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।’
ওসি মেয়াজ্জেমকে এ মামলার অভিযোগপত্রে কেন আনা হয়নি জানতে চাইলে ইকবাল বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তার সংশ্লিষ্ট বা কর্মে কী অবহেলা, পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত কমিটি সে রিপোর্ট দিয়েছে ও সেই রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানির অভিযোগে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজকে আটক করে পুলিশ। পরে ৬ এপ্রিল ওই মাদ্রাসাকেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। টানা ৫ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যায় নুসরাত। এ ঘটনায় তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে সিরাজসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন।
অভিযোগপত্রে কারা : অভিযোগপত্রভুক্তরা হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে চম্পা/শম্পা (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)। নুসরাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন ও শাহিদুল ইসলামকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এ মামলায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ, নুর উদ্দিন, শামীম, পপি, মনি, জাবেদ, শরীফ, হাফেজ কাদের, জোবায়ের, মামুন, রানা ও শাকিল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
