১৯৮৩ সাল থেকে বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই ছিল জিম্বাবুয়ের অংশগ্রহণ। টানা নয়টি আসর খেলা দেশটি এই প্রথম নেই ক্রিকেটের মহাযজ্ঞে। আফ্রিকার দেশটিকে ছাড়া একটু হলেও কি রং হারাল বিশ্বকাপ ক্রিকেট?
জিম্বাবুয়ে যেন ফুটবলের ইতালি-নেদারল্যান্ডস!
ধুর! এটা কোনো তুলনা হলো নাকি। ফুটবলে ইতালি কিংবা নেদারল্যান্ডসের যে ঐতিহ্য, তার সঙ্গে ক্রিকেটে জিম্বাবুয়ের ঐতিহ্যের মিল খোঁজাই তো বোকামি। তারপরও ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগে জিম্বাবুয়ে ফুটবলের ইতালি-নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে একটি জায়গায়। রাশিয়া বিশ^কাপের বাছাই পর্ব পেরোতে না পারায় চূড়ান্ত পর্বে খেলতে পারেনি ফুটবলের বড় দুই পরাশক্তি। ঠিক তেমনই ক্রিকেট বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের চৌকাঠে আটকে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের টিকিট মেলেনি টানা নয়টি বিশ্বকাপ খেলা জিম্বাবুয়ের।
জিম্বাবুয়ের সঙ্গে আয়ারল্যান্ড নামটা জুড়ে দিলে অবশ্য এখানে সংখ্যার বৈষম্যটা দূর হয়। টেস্ট খেলুড়ে দল হয়েও বিশ্বকাপ খেলতে না পরার হাহাকারে জিম্বাবুয়ের সমান ভাগীদার আইরিশরাও। জিম্বাবুয়ে ও আয়ারল্যান্ডের কোনো একটিকে তাই ইতালি, অন্যটিকে নেদারল্যান্ডস আখ্যা দেওয়াই যায়।
জিম্বাবুয়ের চেয়ে আয়ারল্যান্ডের বেদনা এখানে একটু বেশিই হওয়ার কথা? আয়ারল্যান্ড থেকে ইংল্যান্ড তো খুব দূরের পথ নয়। পাশের বাড়ির উৎসবে শামিল হতে না পারার বেদনাটা কোথায় লুকায় তারা। তার ওপর ২০০৭ সাল থেকে টানা তিনটি বিশ্বকাপ খেলার পর ২০১৭ সালে আফগানিস্তানের সঙ্গে টেস্ট মর্যাদা পায় দলটি। কিন্তু টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির পর প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপেই নেই আয়ারল্যান্ড।
জিম্বাবুয়ে-আয়ারল্যান্ডের এই না থাকাটার মূলে বিশ্বকাপ ১০ দলে নেমে আসা। আটটি দল নির্দিষ্ট সময়ে র্যাংকিংয়ের সমীকরণ মিলিয়ে সরাসরি জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপে। বাকি দুটি দল এসেছে ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়েতে অনুষ্ঠিত বাছাই পর্বের পরীক্ষা উতরে। কিন্তু ঘরের মাঠে হওয়া বাছাই পর্বে নিদারুণ স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়েছে ব্রেন্ডন টেলর, হ্যামিল্টন মাসাকাদজারা। বৃষ্টিস্নাত একটা দিন তাদের নিয়ে করেছে উপহাস।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ম্যাচটা জিতলেই সেদিনই ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হয়ে যায় জিম্বাবুয়ের। আয়ারল্যান্ড আর আফগানিস্তান যে বাদ পড়ে যাচ্ছে তখন সেটি ছিল স্বচ্ছ জলের মতো পরিষ্কার। কিন্তু নাটকীয়ভাবে সেদিন বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায় জিম্বাবুয়ে। টেস্ট আঙ্গিনায় নবীন আফগানিস্তান অর্জন করে নেয় বিশ্বকাপের ছাড়পত্র।
ইতালি কিংবা নেদারল্যান্ডস ছিল না বলে রাশিয়া বিশ^কাপের আমুদে ভাটা পড়েছিল কি? ৩২ দলের মহাযজ্ঞে প্রতিদিন কতসব চোখধাঁধানো স্মৃতি উপহার দিয়ে গেছে বিশ্বকাপ। তবে সেসবের মাঝেও ভক্তদের মনে দুই পরাশক্তির জন্য চিনচিনে ব্যথা ঠিকই অনুভব হয়েছে। ক্রিকেটে জিম্বাবুয়ের হয়তো বিশ্বজোড়া ভক্তকুলও নেই। কিন্তু বিশ্বকাপের রেকর্ড বই আক্ষেপের পাতাই মেলে ধরছে।
বিশ্বকাপে কি দুর্দান্ত শুরুটাই না ছিল জিম্ববুয়ের। ১৯৮০ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরের বছরই আইসিসির সহযোগী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয় দেশটি। জায়গা করে নেয় ১৯৮৩ বিশ্বকাপে। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আসরেই নিজেদের ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা তাদের। সেই ম্যাচেই কি না দলটা হারিয়ে দিল অস্ট্রেলিয়াকে। তখন ওয়ানডে ক্রিকেটটা ৬০ ওভারের। ডানকান ফ্লেচারের ব্যাট ভর করে ৬ উইকেটে ২৩৯ রান করেছিল জিম্ববুয়ে। যা তাড়া করতে গিয়ে ৭ উইকেটে ২২৬ রানে থেমেছিল অস্ট্রেলিয়া। সে বিশ্বকাপে ওই একটিতেই জয় জিম্বাবুয়ের। তাই গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়া। তবে ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা ১০ অঘটনের মধ্যে এখনো সেই ম্যাচ সবার ওপরে।
বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের এভাবে চমকে দেওয়ার ঘটনা আছে আরও। ১৯৯২ বিশ্বকাপে জিম্বাবুইয়ানদের শিকার যেমন ইংল্যান্ড। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে প্রথমবার দ্বিতীয় পর্বে খেলে দেশটি। সেটিও গ্রুপ পর্ব থেকে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ডের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে। এই দুই দলকে অবশ্য হারাতে পারেনি জিম্বাবুয়ে। কেনিয়ার সঙ্গে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে দেয় তারা।
২০০৩ বিশ্বকাপেও সুপার সিক্সে খেলেছে জিম্বাবুয়ে। অথচ তাদের গ্রুপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে ইংল্যান্ড-পাকিস্তানকে। আফ্রিকায় আয়োজিত সেই আসরে গ্রুপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়াক-ওভার পায় জিম্বাবুয়ে। সেবার দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে সহআয়োজক ছিল জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়া। জিম্বাবুয়ে সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ থাকায় কারণে জিম্বাবুয়ের মাটিতে ম্যাচটি খেলতে যায়নি ইংল্যান্ড। নিউজিল্যান্ডও যায়নি কেনিয়ায় খেলতে।
এই রাজনৈতিক অস্থিরতাই আসলে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটকে কুরে কুরে খেয়েছে। ২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেওয়া যায়, বিনাশের পথে নিয়ে গেছে। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্র্যান্ড ফ্লাওয়ার, হিথ স্ট্রিক, হেনরি ওলোঙ্গাদের হাত ধরে জিম্বাবুয়ে বিশ্ব ক্রিকেট সমীহ জাগানিয়া এক দলে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সাদা-কালো ভেদাভেদ দেশটির ক্রিকেটকে ডুবিয়ে দিয়ে যায় অন্ধকারে। ২০০৩ বিশ্বকাপেই যেমন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, হেনরি ওলোঙ্গা দেশে গণতন্ত্র হননের প্রতিবাদ হিসেবে কালো ব্যাজ পরে মাঠে নেমেছিলেন।
কিন্তু গণতন্ত্র হননের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটটাও শেষের দিকে এগোতে থাকে জিম্বাবুয়ের। সাদা-কালো বৈষম্যে জিম্বাবুয়ে ছেড়েছিলেন হিথ স্ট্রিক, ফ্লাওয়ার ভাইরাসহ দেশটির অনেক বড় ক্রিকেটার। পরবর্তী সময়ে তাতেন্দা তাইবু, হ্যামিল্টন মাসাকাদজারা দেশের মশাল বহনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেও দেশটির ক্রিকেট বোর্ডের দারিদ্র্যে এগোতে পেরেছে সামান্যই।
একপর্যায়ে টেস্ট ক্রিকেটে স্বেচ্ছা নির্বাসনে যাওয়া জিম্বাবুয়ের। সেখানে থেকে ফিরে ফের পুনর্গঠনের পথে হাঁটা। কিন্তু বোর্ডের দরিদ্রতা, খেলোয়াড়দের ঠিকঠাক মূল্যায়ন করতে নামায় উদ্দেশ্য সফল হয়নি তাদের। ব্রেন্ডন টেলর, কাইল জারভিসরা তো কলক্যাপ চুক্তি করে ইংল্যান্ডেই পাড়ি দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে টেলররা যে কলপ্যাক চুক্তি ভেঙে ফিরলেন, এর পেছনে কি দেশকে বিশ্বকাপের টিকিট এনে দেওয়াও লক্ষ্য ছিল না?
অনেক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও কিছু ক্রিকেটারদের দেশাত্মবোধ আর আত্মনিবেদনে এখনো টিকে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট। দুই বছর আগের একটি উদাহরণই টানা যাক। শ্রীলঙ্কার মাটিতে খেলতে গিয়ে সেবার ওয়ানডে সিরিজ জিতে ফেরে জিম্বাবুয়ে। ১৭ বছর পর সেটি ছিল তাদের বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয়। যার মূলে ক্রিকেটারদের ওই দেশাত্মবোধ।
খর্বশক্তির জিম্বাবুয়ে দলটারও মাঠে শরীরী ভাষা কী যেন খেলা করে সর্বদায়। যেকোনো দলকে হারানোর আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে মাঠে। এবারের বিশ্বকাপে অনেক অনেক পূর্ণতার মাঝেও জিম্বাবুয়ের সেই জিনিসটিই আনমনে একবার হলেও দোলা দিয়ে যাবে সবার মনে।
একটা চাওয়াও কি থাকবে না? ফিরে আসুক জিম্বাবুয়ে।
