আনন্দমুখর হোক বিশ্বকাপ উৎসব

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ১২:৩৬ এএম

ঈদের লম্বা ছুটির ঠিক আগে গতকাল ওভাল মাঠে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হলো আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ-২০১৯। আগামী ২ জুন এই ওভাল মাঠেই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে। দ্বিতীয় ম্যাচ ৫ জুন নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। খুব সম্ভাবনা রয়েছে দ্বিতীয় ম্যাচটা ঈদের দিনে হওয়ার। আর ঈদ যদি ৬ তারিখে হয়, তাহলে ম্যাচটা পড়ছে ঈদের আগের দিন। অর্থাৎ ঈদের দিনেই হোক বা ঈদের আগের দিন, এবারের ঈদ যে বিশ্বকাপময় হবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ঈদের ছুটি ফুরিয়ে গেলেও, বিশ্বকাপ ফুরোবে না। আগামী ১৪ জুলাই পর্যন্ত বিশ্বকাপের উত্তেজনার পারদ উঠতে থাকবে ক্রমাগত। বাংলাদেশের সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়তে থাকলে সে পারদ চূড়া স্পর্শ করতে পারে। ফলে এই দেড় মাসে বাংলাদেশের রাজনীতি-সংস্কৃতির সব মাঠ ছাপিয়ে সমাজ-সংসারের এক বিশাল অংশের মানুষের চোখ পড়ে থাকবে কেবলই বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মাঠে।

দেশের মানুষ নিজেদের যাবতীয় স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির, সফলতা-ব্যর্থতার সব হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে উঠে এখন এই একটা মাঠেই এসে একসঙ্গে মেশে; এই মাঠ বাংলাদেশের ক্রিকেটের মাঠ। যতই দিন যাচ্ছে ক্রিকেটের এই মাঠ বাংলাদেশের মানুষকে যেন আরও ঐক্যবদ্ধ করছে, কাছে টানছে এক স্বপ্নজয়ের দুঃসাহসী অভিযাত্রায়। তাই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোনো ভালো খবর যেমন পুরো জাতিকে উদ্বেলিত করে, তেমনি কোনো খারাপ খবরেও মুষড়ে পড়ে সারা দেশের মানুষ। ক্রিকেটের জন্য এত আবেগ, এত ভালোবাসা, এত ভালোলাগা দেড়-দুই দশক আগেও ভাবা যেত না। কিন্তু বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেই এই ভালোবাসা আদায় করে নিয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রতি দেশের মানুষের এই ভালোবাসার প্রতিফলন দেখা যায় দেশের সব গণমাধ্যমেও। তাই এখন পত্রিকার পাতা থেকে শুরু করে টেলিভিশনের পর্দা আর রেডিওতেও আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের খবর। বিশেষ সংখ্যা, বিশ্বকাপের আসর নিয়ে নানা বর্ণিল ফিচার-প্রতিবেদন-তথ্যকণিকা-বিশ্বকাপ তারকাদের নতুন-পুরনো ছবিতে জমজমাট সব আয়োজন। শহর-মফস্বল-গ্রাম, পাড়া-মহল্লা, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্রই আগামী দেড় মাস বাজবে বিশ্বকাপের দামামা। এ এক মহোৎসব। সমাজে এমন মহোৎসবেই মানুষ মানুষের কাছে আসে, এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায় সবাই। তবে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এই শিক্ষা নিতে হবে যে, খেলা খেলাই। খেলার মাঠের পক্ষ-প্রতিপক্ষ যেন মানুষকে বিবাদে না জড়িয়ে ফেলে। জয়-পরাজয় মেনে নিয়ে আবেগ-উচ্ছ্বাসকে সংবরণ করার মতো সংযমের চর্চাকে উৎসাহিত করতে হবে।

বাংলাদেশ এবার ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে। ১৯৯৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা জিতে নেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে (১৯৯৯) অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে। বিশ্বকাপে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় বল্গাহীন আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সেই স্মৃতি এখনো ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। ক্রিকেটে অগ্রগতির এই পথ কিন্তু মোটেই মসৃণ ছিল না। বহুবার হোঁচট খেতে হয়েছে মাঠে। ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। প্রায় দেড় দশক অপেক্ষার পর টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল ২০০০ সালে। বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নাম লেখায়, সেই সব দিনের তুলনায় তো বটেই, গত দুই দশকেই ক্রিকেট কত বদলে গেল। আশার কথা এই যে, বাংলাদেশের ক্রিকেট এই দিনবদলের অভিযোজনে পিছিয়ে নেই খুব একটা।

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বিশ্বকাপে কাজে লাগবে। অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার নেতৃত্বে থাকা বাংলাদেশের এই বিশ্বকাপ স্কোয়াডের সব সদস্য মিলে ওয়ানডেতে ১ হাজার ৩০০ ম্যাচের বেশি খেলেছেন। এর মধ্যে পাঁচ জ্যেষ্ঠ ক্রিকেটার সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ ও মাশরাফী খেলেছেন মোট ৯৮০টি ওয়ানডে। এই পাঁচজনের প্রত্যেকে ওয়ানডে খেলেছেন ন্যূনতম ১৭৫টি। ২০০৭ সাল থেকে এ পাঁচ ক্রিকেটার একসঙ্গে মাঠে নেমেছেন ১০৪টি ওয়ানডেতে। এর মধ্যে ৫১ ম্যাচেই জিতেছে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে দলের এই ওয়ানডে অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ পাঁচ ক্রিকেটারের সঙ্গে যুক্ত হওয়া নবীন ক্রিকেটাররাও আশার আলো ছড়াচ্ছেন।

সর্বশেষ ডাবলিনের ম্যালাইহাডে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা জিতে নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরনো খেলোয়াড়দের সঙ্গে যুক্ত হওয়া দলের নবীন খেলোয়াড়দের ঝলসে ওঠাটাও সবার নজর কেড়েছে। বিশ্বকাপেও পুরনো তারকাদের সঙ্গে নবীন ক্রিকেটারদের এমন চমৎকার নৈপুণ্য দেখা গেলে তা বাংলাদেশের জন্য অনেক সম্ভাবনাই বয়ে আনতে পারে। নতুন সম্ভাবনা, নতুন সাফল্যের প্রত্যাশায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জন্য অযুত শুভেচ্ছা। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ উৎসব দেশের মানুষের জন্য আনন্দমুখর হয়ে উঠুক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত