চলতি সপ্তাহে ৫৬ শতাংশ শেয়ারের দর বাড়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ১২৭ পয়েন্ট। এর মধ্যে শেষ তিন কার্যদিবসে টানা ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ছিল পুঁজিবাজার। এ সময় বিভিন্ন খাতের শেয়ার দর বাড়লেও ব্যতিক্রম ছিল উৎপাদনমুখী কোম্পানির শেয়ার। পুঁজিবাজারের মন্দায় পড়ে চলতি বছরের শুরু থেকেই উৎপাদনমুখী কোম্পানির শেয়ার দরে যে নিম্নমুখী ধারা দেখা যায়, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। উৎপাদন ব্যবস্থায় যুক্ত কোম্পানিগুলোর প্রায় ৬৯ শতাংশের বেশি চলতি বছর দর হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে বস্ত্র। এ খাতের ৮০ শতাংশের দর কমেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত বিভিন্ন খাতের কোম্পানির শেয়ার দর বিশ্লেষণে এমন তথ্য মিলেছে। ডিএসইতে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন সিকিউরিটিজের মধ্যে উৎপাদনমুখী কোম্পানির সংখ্যা হচ্ছে ১৯১টি। এর মধ্যে ১৩১টি কোম্পানির শেয়ারের দর ২০১৮ সালের তুলনায় কমে গেছে। যদিও উৎপাদনমুখী কোম্পানিগুলোর অধিকাংশের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। তারপরও চলতি বছর এসব শেয়ারের দর সর্বোচ্চ ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে দেখা গেছে। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে ২০ শতাংশের বেশি। গত দুই বছরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছেÑ এমন অধিকাংশ শেয়ারের দরই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর চলতি বছরের শুরুতে কিছুদিন অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি দেখা দিলেও ২৭ জানুয়ারি থেকে বাজার পরিস্থিতি মন্দায় ফিরে গেছে। এ সময় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। এ সময় ডিএসইতে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ শেয়ারের দর কমলেও বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন উৎপাদনমুখী কোম্পানির শেয়ারে। ২০১৮ সালে উৎপাদনমুখী কোম্পানির শেয়ারে মিশ্রভাব দেখা গেলেও সে সময় ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের শেয়ারের দর কমায় ডিএসইর প্রধান সূচকটি ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পয়েন্ট হারায়।
পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুঁজিবাজারে বাণিজ্যিক ব্যাংকের হিসাবায়ন থেকে ইতিমধ্যেই অতালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার, প্রেফারেন্স শেয়ার, বন্ড ও বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ বাদ দেওয়া হয়েছে। আর বিএসইসি প্লেসমেন্ট শেয়ার, আইপিওসহ প্রাইমারি মার্কেটের উন্নয়নে বেশ কিছু আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া দ্বৈতকর পরিহার, করমুক্ত লভ্যাংশ আয়ের সীমা বাড়ানোসহ পুঁজিবাজারে কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনা দিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পরও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে না।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছর উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে বস্ত্র খাতের। এ খাতের ৬২ কোম্পানির মধ্যে ৫০টির দর আগের বছরের তুলনায় কমে গেছে। এর মধ্যে আর এন স্পিনিংয়ের শেয়ারের দর সবচেয়ে বেশি কমেছে। চলতি বছর এ কোম্পানির শেয়ার দর ৩৩ শতাংশ কমে লেনদেন হচ্ছে ৫ টাকা ৯০ পয়সায়। একই সময় স্টাইলক্রাফট, শাশা ডেনিমস, সিমটেক্স, প্রাইম টেক্সটাইল, জাহিনটেক্স, তুংহাই, কাট্টালি, সিঅ্যান্ডএ ও আলহাজ টেক্সটাইলের শেয়ার দর কমেছে ২১ থেকে ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত।
ইস্পাত শিল্প খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর কমেছে এস এস স্টিলের। ২০১৮ সালে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানিটি চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ দর হারিয়েছে। চলতি বছর ইস্পাত খাতের ছয় কোম্পানির মধ্যে পাঁচটিরই দর কমেছে। এ সময় বিএসআরএম লিমিটেডের শেয়ার দর কমেছে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী খাতের অধিকাংশ কোম্পানির দর বাড়লেও মধ্যে চলতি বছর ৮ দশমিক ৩ শতাংশ দর হারিয়েছে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি।
প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের ৯ কোম্পানির মধ্যে ৫টির দর কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, মেঘনা পিইটি ও মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজের। চলতি বছর এসব কোম্পানির শেয়ার দর কমেছে ২১ থেকে ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত। এ ছাড়া খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ও সিনোবাংলার শেয়ার দরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।
গত কয়েক বছর ধরেই সিমেন্ট শিল্প চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাঁচামাল ও জ¦ালানি ব্যয় বাড়ার কারণে এসব কোম্পানির মুনাফায় অধোগতি দেখা যাচ্ছে। এ কারণে গত দুই বছর ধরেই এ খাতের শেয়ারের দর কমতির দিকে। ২০১৮ সালে এ খাতটি ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ দর হারিয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত খাতটি ১০ দশমিক ৮ শতাংশ দর হারিয়েছে। চলতি বছর এ খাতের সাত কোম্পানির মধ্যে ছয়টির দর কমেছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট কোম্পানি। এ সময় এ কোম্পানির শেয়ার দর কমেছে ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
পশুখাদ্য ও ওষুধ উৎপাদনকারী তিন প্রতিষ্ঠান ডিএসইতে তালিকাভুক্ত রয়েছে। চলতি বছর সব কোম্পানির শেয়ার দরই কমেছে। অটোমোবাইল শিল্পের চার কোম্পানির মধ্যে তিনটির দর কমেছে। এর মধ্যে আফতাব অটো ও ইফাদ অটোমোবাইল কোম্পানির শেয়ার দর কমেছে ১৯ দশমিক ৮ ও ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত। সিরামিক খাতের পাঁচ কোম্পানির মধ্যে চারটির দর কমেছে। কেমিক্যাল খাতের সাত কোম্পানির মধ্যে পাঁচটির দর কমেছে। এর মধ্যে কাশেম ইন্ডাস্ট্রিজের দর কমেছে ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
নির্মাণ খাতের ১৭ কোম্পানির মধ্যে ৯টির দর কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে আরামিট লিমিটেড ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ। ভোগ্যপণ্য খাতের চার কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর কমেছে এসিআই লিমিটেডের। সাবসিডিয়ারি কোম্পানির লোকসানের কারণে এসিআই লিমিটেড বিপর্যয় অবস্থায় রয়েছে।
চলতি বছর এ কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে ২৩ দশমিক ২ শতাংশ। খাদ্য ও পানীয় উৎপাদন খাতের ১৬ কোম্পানির মধ্যে ৯টির শেয়ারের দর ২৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। পাট খাতের সবগুলো কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে। এর মধ্যে সোনালি আঁশ চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ দর হারিয়েছে। এ ছাড়া লিগ্যাসি ফুটওয়্যার, জুটস্পিন, মুন্নু স্টাফলার্স, হাক্কানি পাল্প ও ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডসহ বেশ কিছু কোম্পানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দর হারিয়েছে।
