রোহিঙ্গা নিরাপত্তায় সব প্রস্তাবেই দাতাদের না

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ০২:৪৭ এএম

অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মানবপাচার ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে দেশটি থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে শিবিরগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার প্রস্তাব দাতারা নাকচ করে দিয়েছে। এর আগে কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপ কমাতে তাদের ভাসান চরে স্থানান্তরের প্রস্তাবও দাতারা না করে দিয়েছে। এ নিয়ে সরকার বিপাকে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে দাতাদের নানামুখী চাপে পড়েছে সরকার। প্রতিদিন রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে মারামারি এবং খুনোখুনি পর্যন্ত হচ্ছে। কোনো ধরনের বেষ্টনী না থাকায় এবং বিশাল জনগোষ্ঠী হওয়ায় তাদের প্রতি নজর রাখা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে রোহিঙ্গাদের কারণে। শুধু দেশেই নয়, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে রোহিঙ্গারা দেশের বাইরে যাচ্ছে এবং ধরা পড়ছে। এতে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মনিটরিংয়ের মধ্যে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু দাতা সংস্থা এই প্রস্তাব নাকচ করে আমাদের জানিয়েছে, এতে মানবাধিকর লঙ্ঘিত হবে। আবার রোহিঙ্গাদের ভাসান চরে স্থানান্তরের বিষয়ও দাতারা নাকচ করেছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মুখে শিবিরগুলোকে ঘিরে সিসি ক্যামেরা বসানোসহ নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য রয়েছে, শিবিরগুলোতে অবৈধ অস্ত্রধারী এবং উগ্র কিছু সংগঠন তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। এজন্য মন্ত্রণালয়েও রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সাহায্যকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আপত্তির কারণে তা হচ্ছে না।

কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিবিরগুলোয় রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে কোন্দল থেকে দুই বছরে ৩০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা এখানে আসার পর আমাদের স্থানীদের ভাষা এবং পোশাক থেকে শুরু করে সবকিছুই আয়ত্ত করে ফেলেছে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেকপোস্টগুলো মূলত রাস্তার ওপরে। এ ছাড়া রোহিঙ্গারা গ্রাম, জঙ্গল বা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এটা আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারদিকে যদি কোনো বেষ্টনীর ব্যবস্থা করা যেত, তা হলে আমাদের মনিটরিং থাকত এবং তাদের ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার প্রবণতা কমে আসত। কক্সবাজারের এসপি জানান, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এই উদ্বেগের বিষয় জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী প্রত্যাবাসনবিষয়ক কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেছেন, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যে, কাঁটাতারের বেড়া দেওয়াও অনেক ঝামেলার। এখন দাতাদের নিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা দরকার। তবে শিবিরগুলোকে ঘিরে সিসি ক্যামেরা বসানোসহ নজরদারির ব্যবস্থা জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তিনি জানান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের বিশৃঙ্খলা এবং অভ্যরীণ কোন্দল মেটাতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পে আমরা ১০০ জন করে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করেছি। তিনি বলেন, ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার কারণে বাংলাদেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে সজাগ থাকার বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে রোহিঙ্গাদের সুররক্ষার বিষয়ও। এখন দাতাদেরও বিষয়টি দেখতে হবে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের একটি প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এই প্রস্তাবে দাতাদের আপত্তি রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গারা নিজেরাই নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই আমরা কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার প্রস্তাব করেছি। এখন সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিচ্ছি। দাতারা নিশ্চয়ই এই বিষয়গুলো বুঝবে। তিনি বলেন, এখন তো তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকট হচ্ছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা শিউলী শর্মা বলেন, হতাশা থেকে রোহিঙ্গাদের মধ্যে উগ্র মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা পর্যাপ্ত সুবিধা পাচ্ছে না। অল্প জায়গায় ঘিঞ্জি পরিবেশে অনেক মানুষ থাকতে হচ্ছে, তাই তারা এত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত