আকাশের মুখ ভার। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়ে গেছে কয়েক পশলা। আছে আরও বৃষ্টির শঙ্কা। তবে সে শঙ্কা উপেক্ষা করেই সকালে অনেকে এসেছেন প্রিয় নাট্যব্যক্তিত্ব মমতাজউদদীন আহমদকে শেষ বিদায় জানাতে। অপেক্ষা করছেন গুণী এই ব্যক্তিকে শেষ দেখার। ঘড়ির কাঁটা তখন ১০টা
ছুঁই ছুঁই। সাইরেন বাজাতে বাজাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে এসে থামল মমতাজউদদীনের লাশবাহী গাড়ি। সেখানে হলো তার দ্বিতীয় জানাজা। এরপর অশ্রু আর ফুলেল শ্রদ্ধায় বিদায় জানানো হলো প্রিয় নাট্যকারকে।
গত রবিবার বেলা ৩টা ৪৮ মিনিটে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মমতাজউদদীন আহমদ। ওইদিন রাতে মিরপুর রূপনগরে তার বাসভবনসংলগ্ন মদিনা মসজিদে বাদ এশা প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ ফ্রিজিং ভ্যানে রাখা হয় বাসভবনের সামনে। সেখান থেকেই সোমবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আনা হয়।
মমতাজউদদীন আহমদের দ্বিতীয় জানাজা শেষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল প্রমুখ। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান ও সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ সামাদ।
এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সাম্মানিক সভাপতি রামেন্দু মজুমদার, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, নাট্যজন মামুনুর রশীদ, ম হামিদ, প্রাবন্ধিক-গবেষক মফিদুল হক, নাট্যকার অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী, উদীচীর সহসভাপতি শংকর সাঁওজাল, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, অভিনেতা রহমত আলী, কে এস ফিরোজ, খায়রুল আলম সবুজ, সালাউদ্দিন লাভলু, বাচিক শিল্পী ড. ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।
জানাজা শেষে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মমতাজউদদীন আহমদ ছিলেন দেশের নাট্য আন্দোলনের পথিকৃৎ। মঞ্চনাটক রচনায় তিনি অন্যতম পথপ্রদর্শক। মঞ্চনাটক রচনায় যে পথ তিনি দেখিয়েছেন, তা দেশের নাট্যাঙ্গন অনুসরণ করবে, অনুকরণ করবে।
রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘একাধারে নাট্যকার, অভিনেতা হিসেবে দেশজুড়ে তার খ্যাতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষক হিসেবে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীর মাঝে আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন।’
মামুনুর রশীদ বলেন, ‘অসীম প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব মমতাজউদদীন আহমদের মৃত্যু আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য বেদনাদায়ক। আমরা মঞ্চে, টেলিভিশনে একসঙ্গে নাটক করেছি। তার মৃত্যুতে আমি মর্মাহত।’
মমতাজউদদীন আহমদের ছেলে তিতাস মাহমুদ বলেন, ‘যে সম্মান, গৌরব, অহংকার বাবাকে আপনারা দিয়েছেন, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। আপনাদের দোয়ায় আমার বাবা শ্রেষ্ঠতম স্থানে যাবেন। আমার বাবা সফল, বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য জীবন পেয়েছেন, যা দিয়েছেন আপনারা। সবাইকে জানাতে চাই, বাবার নামে আমরা একটি পুরস্কারের প্রবর্তন করতে যাচ্ছি। প্রতি বছর মমতাজউদদীন আহমদের জন্মদিনে একজন নাট্যকর্মীকে এ পুরস্কার দেওয়া হবে। আগামী জন্মদিনে (১৮ জানুয়ারি ২০২০) প্রথমবারের মতো এ পুরস্কার দেওয়া হবে।’
এরপর ঢাবি কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে মরদেহ রওনা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের উদ্দেশে। রাতে সেখানেই তৃতীয় জানাজার পর বাবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন মমতাজউদদীন আহমদ।
দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের সংক্রমণে ভুগছিলেন মমতাজউদদীন আহমদ। গত ২৬ এপ্রিল অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ১২ মে আবার বাসায় নেওয়া হয়। পরে আবার ১৬ মে থেকে অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বেশিরভাগ সময়ই তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে (আইসিইউ) ছিলেন।
১৯৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার হাবিবপুর থানার আইহো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মমতাজউদদীন আহমদ। বাবা কলিমউদদীন আহমদ ও মা সখিনা বেগম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বিএ (অনার্স) ও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি বাম রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে গোলাম আরিফ টিপুর সঙ্গে তিনি রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। সেই সময় রাজশাহী কলেজে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণেও ভূমিকা রাখেন। রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার কারণে চারবার কারাবরণ করেন।
১৯৯৭ সালে নাট্যকার হিসেবে একুশে পদকে ভূষিত হন মমতাজউদদীন আহমদ। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি বিশেষ সম্মাননা, শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাউল সাহিত্য পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।
