শেষ মুহূর্তে সহস্রাধিক জনবল অনুমোদন ইউজিসির মান্নানের

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৯, ০২:৪৫ এএম

বিদায়ের আগে টানা তিন দিনে পৃথক ৯টি সভায় ৯ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহস্রাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। মেয়াদ শেষের আগ মুহূর্তে এত জনবল অনুমোদন স্বাভাবিক নয় বলে মনে করেন ইউজিসির নতুন চেয়ারম্যান। প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তাও অভিযোগ করেন, সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই তাড়াহুড়া করে জনবল অনুমোদন দিয়েছেন অধ্যাপক মান্নান। শুধু তাই নয়, তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) ১২৩ জনের অবৈধ নিয়োগ অনুমোদন করেছেন। তবে সাবেক চেয়ারম্যান বলেছেন, ব্যস্ততার কারণে আগে সভাগুলো করতে পারেননি। জনবল অনুমোদনে নিয়মের বাইরে কিছু করা হয়নি। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউজিসির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাহিদা মোতাবেক জনবল অনুমোদন একটি চলমান প্রক্রিয়া হলেও বিদায়ের ঠিক আগ মুহূর্তে এত জনবল অনুমোদন অস্বাভাবিক।’ সাবেক চেয়ারম্যান এই জনবল অনুমোদন করে কয়েকশ’ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করে গেছেন বলে অভিযোগ করেন       

তারা।

গত ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল এই তিন দিনে জনবল বরাদ্দ সংক্রান্ত নয়টি সভা করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। এতে ৯ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জনবল অনুমোদন দিয়েছেন ১ হাজারের বেশি।  ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২৩, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩৪, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে ৬০, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭২, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১৭, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০০ এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জনবল বরাদ্দ দেওয়া হয় অন্তত শতাধিক। ইউজিসি চেয়ারম্যান ছাড়াও এসব সভায় বেশিরভাগ সময় অংশ নিয়েছেন ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক মো. কামাল হোসেন, চলতি দায়িত্বে থাকা অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালক মো. রেজাউল করিম হাওলাদার এবং তৎকালীন প্রশাসন বিভাগের উপসচিব মো. শাহিন সিরাজ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে নানারকম চাপে থাকতে হয় বলে স্বীকার করেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কাজী সাজ্জাদ হোসেন। তার প্রতিষ্ঠানে কত সংখ্যক জনবল অনুমোদন হয়েছে প্রশ্ন করলে তিনি তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান। এ উপাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ তথ্যটি দিতে পারছি না বলে দুঃখিত। এটি যদি আমি প্রকাশ করি তাহলে আমি রাজনৈতিকসহ নানারকম চাপে থাকব। বহু তদবির আসবে, আমি চাপ সামলাতে পারব না।’ নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তো অনেকটা ওপেন সিক্রেট ব্যাপার।’

এদিকে ২০১২ সালে ইউজিসির অনুমোদন ছাড়াই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২৩ জনকে নিয়োগ দেয় তৎকালীন প্রশাসন।  গত ২৮ এপ্রিলের সভায় এর বৈধতা দিয়েছেন অধ্যাপক মান্নান। ইবি রেজিস্ট্রার এস. এম. আব্দুল লতিফ বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘২০১২ সালে ইউজিসি’র অনুমোদন না নিয়েই ১২৩ জনকে নিয়োগ দিয়েছিল তৎকালীন প্রশাসন। যা সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল। অনেক চেষ্টার পর গত ২৮ এপ্রিল ওই ১২৩ জন জনবলের অনুমোদন পেয়েছি।’

গত ২৮ এপ্রিল থেকে ৭ মে পর্যন্ত অধ্যাপক আবদুল মান্নানের দৈনিক কর্মসূচিতে দেখা যায়, ২৮ এপ্রিল সকাল থেকে চারটি সভায় অংশ নিয়েছেন তিনি। এর তিনটিই ছিল তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জনবল বরাদ্দ সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় সভা।  এই তিন বিশ্ববিদ্যালয় হলোÑ খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। পরদিনও চেয়ারম্যান চারটি সভা করেছেন; যার সবই জনবল বরাদ্দের বিষয়ে। বেলা ১১টায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, বিকাল ৩টায় রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বিকাল ৫টায় ছিল শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সব শেষে সন্ধ্যা ৬টায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়। এরপর ৩০ এপ্রিল বিকাল ৩টায় হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বিকাল ৫টায় রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সভা করেন অধ্যাপক মান্নান। পরদিন ১ মে তিনি ভারতে যান। সফর শেষে ৫ মে দুপুরে ঢাকায় ফিরে ইউজিসির বাজেট ব্যবস্থাপনা ও অর্থ কমিটির সঙ্গে পৃথক দুটি বৈঠক করেন। ৬ মে জনবল বরাদ্দের সভা না রাখলেও চেয়ারম্যানের শেষ কর্মদিবস ৭ মে’তেও মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জনবল বরাদ্দ সংক্রান্ত সভা রাখেন তিনি। যদিও পরে তা স্থগিত করেন।

বিদায়ের আগে এত সভা ও জনবল অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেকদিন ধরে মিটিংগুলো ঝুলে ছিল। নানা ব্যস্ততায় সময় সুযোগ হচ্ছিল না। এ জন্যই মিটিংগুলো তখন করতে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মূলত এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া। নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। বেশ কিছু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, যেখানে প্রচুর জনবল দরকার। সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ায় নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হবে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল প্রয়োজন। সেসব বিবেচনা করেই জনবল অনুমোদন করা হয়েছে।’

জানতে চাইলে ইউজিসির বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, ‘কী কারণে শেষবেলায় এত জনবল অনুমোদন করলেন তা আমার জানা নেই। অনুমোদন দিলে ক্ষতি নেই কিন্তু বিষয়টি অস্বাভাবিক দেখায়।’ তার ওপর কোনো চাপ থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত