বিমানের নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর হোন

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৯, ১০:৫৭ পিএম

নিরাপত্তার শঙ্কা আর অব্যবস্থাপনার কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আবারও আলোচনায় এলো।  উদ্বেগের বিষয়, এবার এমন ঘটনা ঘটল প্রধানমন্ত্রীকে আনতে যাওয়া ফ্লাইটকে ঘিরে। ফিনল্যান্ড সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে আনার জন্য ৫ জুন রাতে বিমানের ড্রিমলাইনার বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজটি ঢাকা থেকে কাতারে যায়। কিন্তু এই ফ্লাইটের পাইলটের নিজের পাসপোর্টই সঙ্গে ছিল না।  এ ঘটনায় প্রথমে পাইলটকে দোহা বিমানবন্দরে আটকের খবর প্রকাশিত হলেও, পরে তা সঠিক নয় বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু তিনি যে পাসপোর্ট ছাড়াই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হয়েছেন সেটা নিশ্চিত। এ ঘটনায় ইমিগ্রেশন পুলিশের এক উপপরিদর্শককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ চার সদস্যের একটি আলাদা তদন্ত কমিটি করে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে। 

 

প্রধানমন্ত্রীকে আনতে যাওয়া রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী উড়োজাহাজের পাইলটের পাসপোর্টহীন এই যাত্রা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং আমাদের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটিসহ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।  রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীকে বহনকারী ফ্লাইট ঘিরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি ঘটনায় বারবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার নানা ফাঁকফোকর ধরা পড়ায় এ ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ২৮ মে প্রধানমন্ত্রীর ত্রিদেশীয় সফরের শুরুতে বাংলাদেশ বিমানের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে মনোনীত করা বিমান কর্মকর্তার বিষয়ে ‘গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আপত্তি’ থাকায় তাকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসেও প্রধানমন্ত্রীকে লন্ডন থেকে ফিরিয়ে আনার ফ্লাইট থেকে একজন ক্যাপ্টেনকে ‘নিরাপত্তাজনিত কারণে’ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তার আগের বছর প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে ‘নিরাপত্তা সিলগালা’ ছাড়া সরবরাহকৃত খাবার আটকে গিয়েছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়। এর আগে সৌদি আরব সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার সময় রানওয়েতে ধাতববস্তু থাকার ঘটনায় প্রায় ২০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানটিকে আকাশে উড়িয়ে রাখতে হয়েছিল। আবার প্রধানমন্ত্রীর হাঙ্গেরি সফরের পথে তাকে বহনকারী বিমানের জরুরি অবতরণ করতে হয় তুর্কমেনিস্তানের আশখাবাদ বিমানবন্দরে।  

 

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিমানের নতুন উড়োজাহাজ ময়ূরপঙ্খীতে (বোয়িং ৭৩৭, বিজি-১৪৭) চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে ‘ছিনতাই নাটকের’ ঘটনা ঘটে। এর আগে নিয়মভঙ্গ করে নিরাপত্তা বলয় পেরিয়ে পুলিশের এক এসআই এবং এক রাজস্ব কর্মকর্তার ফ্লাইটে উঠে যাওয়ার ঘটনাতেও বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে শোরগোল উঠেছিল। দেশের

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তার ঘাটতির কথা এর আগেও নানাভাবে সামনে এসেছে। বিগত বছরগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকবারই বিমান ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নিরাপত্তায় শিথিলতার সুযোগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে মাদক ও চোরাচালানের অভিযোগ করে যুক্তরাজ্য ২০১৬ সালে ঢাকার সঙ্গে সাময়িকভাবে মালবাহী বিমান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল। এ সময় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) পদক্ষেপে বিমান বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা ও আনসারের সমন্বয়ে এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স (এভসেক) গঠন করা হয়।  এছাড়া প্রতিটি অনিয়ম ও ত্রুটির ঘটনাতেই তদন্ত কমিটি গঠন এবং নানা পর্যায়ে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও পরিস্থিতির কোনো বদল হয়নি।

 

সরকারপ্রধানের ফ্লাইটে বারংবার এ ধরনের ঘটনা নেতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। পাশাপাশি বিমানের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক গাফিলতির প্রমাণও এ ঘটনাগুলো। একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে ভিভিআইপি ফ্লাইটেই যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন অবহেলা বা ঔদাসীন্য থাকে, তাহলে সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানের ক্ষেত্রে কী হতে পারে? অথচ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিমানের প্রত্যেকটি উড্ডয়নের প্রতিটি ধাপের নিরাপত্তা তল্লাশিই গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে সর্বশেষ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিমানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে অবশ্যই ঢেলে সাজানোর চিন্তা করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমানের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত