মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৯, ১০:৫৯ পিএম

জ্যৈষ্ঠ মাস ফলের মৌসুম। বাজারে গেলেই দেখা যায় আম, জাম, কাঁঠাল, আনারস, লিচু, বেল, তরমুজসহ নানা রকম ফল কিনে মানুষ হাসিমুখে বাড়ি ফিরছে। লিচু বিক্রেতা হাতের মুঠোয় লিচুর ছড়ি নিয়ে মানুষকে উদ্দেশ করে বলছেন, ‘নেন ভাই, মজাদার সুন্দর লিচু, মধুর মতো মিষ্টি।’ কিন্তু এই লিচু দেখতে সুন্দর আর খেতে মজাদার হলে কী হবে। এই লালরঙা মনভোলানো লিচু তো বিষ দিয়ে পাকানো! তাই মনে পড়ে চট্টগ্রামের জনপ্রিয় গানের কথা ‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’। অধিক মুনাফার লোভে অসাধু ব্যবসায়ীরা কাঁচা ফলই ক্ষতিকারক রাসায়নিক দিয়ে পাকিয়ে বাজারে নিয়ে আসেন আর ‘মধু’ বলে আমাদের ‘বিষ’ খাওয়ান।

 

কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে ফলের নামে আমরা বিষ কিনে খাওয়াচ্ছি আমাদের পরিবার-পরিজনদের। ব্যাগ ভরে বাসায় আম, লিচু নিলেই সবাই খুশি। সেদিনই পত্রিকার পাতায় একটা লেখা পড়ে জানলাম এসব ফলে শুধু বিষ আর বিষ। টাকা দিয়ে বিষ কিনে আনছি আমরা। আম, লিচু, কাঁঠাল, আনারস, কলাÑ বাজারে এমন কোনো ফল নেই যাতে বিষ মেশান না অসাধু ব্যবসায়ীরা। এসব বিষ মেশানো ফল খেলে গ্যাস্ট্রিক, আলসার, হৃদরোগ, হাঁপানি থেকে শুরু করে মরণব্যাধি ক্যানসারসহ নানা ধরনের জটিল রোগ হতে পারে।

 

আমাদের প্রিয় ফল আম। দুধ-ভাতে পাকা আম মিশিয়ে খেলে কত স্বাদ! আমার বাবা এখনো শত বছর বয়সে আম-দুধের ভাত পছন্দ করেন। প্রিয় ফল আমের পচন রোধে এবং আমকে পাকাতে আমে দেওয়া হচ্ছে সায়ানাইড, ফরমালিনসহ নানা ধরনের কেমিক্যাল। গাছে মুকুল আসার পর থেকে শুরু করে আম পাকা পর্যন্ত বাগানে, আড়তে, দোকানে দফায় দফায় দেওয়া হচ্ছে এসব কেমিক্যাল। বিষাক্ত কেমিক্যালে ভরা এই আম খাওয়া আর বিষ খাওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি? আমরা এই বিষ মেশানো আম খাচ্ছি। মানে আমরা জেনেশুনে বিষ খাচ্ছি।

 

বাজারের বেশির ভাগ আমের মধ্যেই সায়ানাইড ও ফরমালিন নামের বিষাক্ত কেমিক্যাল রয়েছে। পত্রিকার পাতা খুললেই দেখি মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে টনে টনে এই কেমিক্যালযুক্ত আম রাস্তায় ফেলে ধ্বংস করছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করছেন। গত ২৮ মে রবিবার দুপুরে আমার নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৌর শহরের জগৎ বাজারের এক ফলের আড়তে কেমিক্যাল মিশিয়ে আম পাকানোর দায়ে আড়তের মালিককে ভোক্তা অধিকার আইনে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় ৪৪০ কেজি আম ট্রাকের নিচে ফেলে ধ্বংস করা হয়। সায়ানাইড ও ফরমালিনÑ এই দুটি কেমিক্যালে মানবদেহে মারণব্যাধি ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা শতভাগ। দেশে ক্যানসার রোগ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে কি এসব বিষ মেশানো ফল দায়ী নয়?

 

এবার বলি লিচুর কথা। কাঁচা লিচুকে টকটকে লাল করতে, পচন রোধ করতে এবং পোকা ধরা বন্ধ করতে পানির সঙ্গে ‘ক্যামোমেথ্রিন’ ও ‘টিডো’ নামের দুই ধরনের কীটনাশক ও ‘ম্যাগনল’ নামের এক প্রকার হরমোন মিশিয়ে লিচুগাছে ছিটানো হয়। রং ধরার পর লিচু দ্রুত বড় করতে ফের টিডো ও ম্যাগনল ছিটানো হয় গাছে! ক্যামোমেথ্রিন ও টিডো মিশানো এই লিচু খেলে কিডনি ও যকৃৎ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। কেউ কেউ নিশ্চয় পত্রিকায় পড়েছেন ২০১২ সালে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলায় লিচু খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে ১৪ শিশু, এদের মধ্যে ১৩ জনই মারা যায়।

 

মানবদেহে আয়রনের ঘাটতি পূরণ করে কলা। কলাকে দ্রুত পাকানোর জন্য ভাইরাস তাড়ানোর নাম করে কলাচাষিরা স্প্রের মাধ্যমে মার্শাল, হিলডন, রাইজার, বাসুডিনসহ আরও অনেক ধরনের ওষুধ ছিটান কাঁচা কলায়। তা ছাড়া কলাকে সুন্দর আর দাগমুক্ত করতেও ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের রাসায়নিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রাসায়নিক মেশানো কলা খাওয়ার ফলে পাকস্থলীতে এসিডের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। পাকস্থলীতে যদি কোনো ক্ষত থাকে, সেটি আরও বেড়ে যায়।

 

আনারসের কথা শুনলেই জিভে জল এসে যায়। ছোটবেলায় আনারসকে ছোট ছোট চাক করে লবণ-মরিচ মিশিয়ে খেতাম। কতই না স্বাদ লাগত! এখনো খেতে মন চায়। কিন্তু কেমিক্যালের ভয়ে খাই না। আনারস প্রাকৃতিকভাবে খাবার উপযোগী হতে সময় লাগে তিন মাস। কিন্তু লোভী চাষিরা বিভিন্ন রাসায়নিক ছিটিয়ে দুই মাসের মধ্যে আনারসকে খাবার উপযোগী করে তোলেন। ইথাইলিন বা ক্যালসিয়াম কার্বাইড প্রয়োগের কারণে দু-চার দিনের মধ্যেই ফল হলুদ রং ধারণ করে। আর ফল পাকাতে যে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়, তার নাম কার্বাইড। সবশেষে স্প্রে করা হয় ফরমালিন, এতে অসময়ে পাকানো আনারস পচনের হাত থেকে রক্ষা পায়। এভাবে আনারসেও মেশানো হচ্ছে বিষ।

 

সব মানুষই কমবেশি তরমুজ খেতে পছন্দ করেন। রসালো ও সুস্বাদু ফল তরমুজ। আমি জানতাম তরমুজ কেমিক্যালমুক্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় তরমুজেও বিষ! তরমুজকে পাকা এবং লাল দেখানোর জন্য মেশানো হচ্ছে বিপজ্জনক লাল রং ও মিষ্টি স্যাকারিন। ইনজেকশনের সিরিঞ্জের মাধ্যমে তরমুজের বোঁটা দিয়ে এসব দ্রব্য পুশ করে তরমুজ পাকা ও লাল টকটকে বলে বিক্রি হচ্ছে। ক্ষতিকারক দ্রব্য মেশানো এ ধরনের তরমুজ খেয়ে আমাদের পাশের ইউনিয়ন পানিশ্বরে অসুস্থ হয়েছে এক পরিবারের সাতজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব রাসায়নিক পদার্থের কারণে নারীরা বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম দিতে পারেন। শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া রাসায়নিক মেশানোর কারণে ফলের পুষ্টি ও স্বাদ দুই-ই নষ্ট হয়ে যায়।

 

খেজুর আমার পছন্দ। ভাবছিলাম খেজুর শতভাগ বিষমুক্ত। ইন্টারনেট জগৎ ঘুরে দেখলাম খেজুরেও দেওয়া হচ্ছে কেমিক্যাল। ঢাকা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাহিদ রসুল বলেন, পচার হাত থেকে রক্ষা করতে খেজুরে এক ধরনের কেমিক্যাল দেওয়া হয়। আমরা রোজার সময় অভিযান চালিয়ে এর প্রমাণ পেয়েছি (১৪ জুন, ২০১৭, কালের কণ্ঠ)। এরপর বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খেজুরের ৩০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, সব পরীক্ষায় ফরমালিনের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এসব তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে ফরমালিন ছাড়া বাজারে কোনো খেজুর নেই। আমাদের স্থানীয় বাজার অরুয়াইলে সরেজমিনে ঘুরে দেখলাম বস্তা বস্তা খেজুর মাটিতে পড়ে আছে। কোনো কোনো দোকানে খেজুরকে চকচকে করার জন্য তাতে তেলজাতীয় কী জানি মেশানো হচ্ছে। সুপ্রিয় পাঠক সরকারের একার পক্ষে এই পুষ্টিসমৃদ্ধ মৌসুমি ফলকে ভেজালমুক্ত করা সম্ভব নয়। দেশটা আমাদের সবার। আমাদেরও দায়িত্ব আছে। আসুন আমরা সচেতন হই। অসাধু, ভেজাল ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে মৌসুমি ফলকে বিষমুক্ত করার আন্দোলন করি।

লেখক : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বসবাসরত সাংবাদিক

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত