বাজার হারিয়ে লোকসানে ইস্টার্ন কেবলস

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৯, ১১:২৮ পিএম

প্রায় পাঁচ দশকের পুরনো প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন কেবলস লিমিটেড। ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রামে ৩৭ একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটির পণ্যের প্রধান গ্রাহক ছিল সরকার। সরকারি বিভিন্ন কোম্পানির কাছে পণ্য বিক্রি করেই প্রতি বছর মুনাফায় থাকত ইস্টার্ন কেবলস। তবে বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় বাজার হারিয়ে ফেলছে কোম্পানিটি। আশঙ্কাজনক হারে পণ্য বিক্রি কমে যাওয়ায় গত পাঁচ বছরে প্রথমবারের মতো লোকসানে পড়েছে ইস্টার্ন কেবলস।

ইস্টার্ন কেবলস বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক তার উৎপাদন করে থাকে। এক বছরের ব্যবধানে বৈদ্যুতিক তার বিক্রি ৭৮ শতাংশ কমে যাওয়ায় চলতি হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে উৎপাদন পর্যায়েই লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি। আর এ সময়ে প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় শেষে ইস্টার্ন কেবলসের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ১২ কোটি টাকারও বেশি নিট মুনাফায় ছিল কোম্পানিটি।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১১ সালের পর থেকেই ইস্টার্ন কেবলসের পণ্য বিক্রি কমছে। ২০১২-১৩ হিসাব বছরে পণ্য বিক্রি থেকে এ কোম্পানির আয় ছিল ১৭৮ কোটি টাকা। এরপর ধারাবাহিকভাবে পণ্য বিক্রি কমতে কমতে ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে তা ১২৮ কোটি টাকায় নেমে দাঁড়ায়। ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে বিক্রি কিছুটা বেড়ে ১৪২ কোটি টাকায় উন্নীত হলেও চলতি হিসাব বছরে বড় ধরনের অধোগতিতে পড়েছে কোম্পানিটি। চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে (২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত) বৈদ্যুতিক তার বিক্রি নেমে এসেছে মাত্র ২৫ কোটি টাকায়। পণ্য বিক্রির এ ধারা অব্যাহত থাকলে হিসাব বছর শেষে তা সর্বোচ্চ ৩৪ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় উৎপাদন পর্যায়েই লোকসানে পড়েছে ইস্টার্ন কেবলস।

এ বিষয়ে ইস্টার্ন কেবলসের ম্যানেজার হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা পিডিবি ও আরইবির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠান আমাদের কাছ থেকে তার নিলে আমাদের বিক্রি বাড়ে। তবে চলতি অর্থবছরে ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা তেমন কোনো অর্ডার পাচ্ছি না। যদিও বেসরকারি কোম্পানি থেকে তারা পণ্য ক্রয় করছেন। হয়তো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য ক্রয় করতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। 

তিনি আরও বলেন, তার বিক্রির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। এছাড়া আমাদের উৎপাদিত পণ্যের দামও তুলনামূলক বেশি। সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই পরিমাণে আয় বাড়েনি। আবার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এখন ডিপিডিসি মাটির নিচ দিয়ে তার বসাচ্ছে। কিন্তু অত্যাধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় আমাদের সে ধরনের পণ্য উৎপাদন করতে পারছি না। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা কাউকে কমিশনও দিতে পারছি না। এসব কারণেও পণ্যের বাজার হারাতে হচ্ছে।

ইস্টার্ন কেবলসের গত কয়েক বছরের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১২-১৩ হিসাব বছরে ১৭৮ কোটি টাকা বিক্রির বিপরীতে নিট মুনাফা ছিল ১৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। পরের বছর বিক্রি কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১৩০ কোটি টাকায়। এ সময় নিট মুনাফা ছিল ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এরপর থেকে বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি নিট মুনাফাও কমতে থাকে। ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে নিট মুনাফা নেমে আসে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকায়। পরের বছরে বিক্রি কিছুটা বাড়লেও প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রথমবারের মতো লোকসানে পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত এ কোম্পানিটি। আর চলতি হিসাব বছরে বিক্রি তলানিতে নেমে আসায় লোকসানের পাল্লা ভারী হতে শুরু করেছে।

এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন কেবলস বাজার হারালেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বৈদ্যুতিক তার উৎপাদনকারী অপর প্রতিষ্ঠান বিবিএস কেবলস লিমিটেডের বিক্রি প্রতি বছরই বাড়ছে। ২০১৩-১৪ হিসাব বছরে বিবিএস কেবলসের পণ্য বিক্রি থেকে আয় ছিল ১৮৭ কোটি টাকা, যা ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে ৬৫৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বিবিএস কেবলসের পণ্য বিক্রির পরিমাণ আরও বেড়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নিয়মিত ক্রয়াদেশ পেয়ে আসছে কোম্পানিটি। এ কারণে চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে বিবিএস কেবলসের বিক্রি থেকে আয় দাঁড়িয়েছে ৭১৩ কোটি টাকায়, যা বছর শেষে হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে। ২০১৪-১৫ হিসাব বছরে এ কোম্পানির নিট মুনাফা ছিল মাত্র ১২ কোটি টাকা, যা ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে ১১১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। আর চলতি তৃতীয় প্রান্তিক শেষে এ কোম্পানির নিট মুনাফা ১২৭ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

তবে লোকসানে থাকলেও ইস্টার্ন কেবলসের শেয়ারের দর আকাশ ছুঁয়েছে। সর্বশেষ এ কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের সমাপনী দর ছিল ৩৭৮ টাকা। আর বিবিএস কেবলসের প্রতিটি শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে ৯৪ টাকা ৩০ পয়সায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত