অস্ত্রের জাল লাইসেন্সের তথ্য চেয়েছে দুদক

আপডেট : ১১ জুন ২০১৯, ০৩:৪৮ এএম

জালিয়াতির মাধ্যমে সারা দেশে কী পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে তা জানতে চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স সংক্রান্ত তথ্য জেলা পোর্টালে প্রদর্শনসহ কমিশন জাল লাইসেন্স রোধে ৬টি সুপারিশ দিয়েছে। দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখ্ত স্বাক্ষরিত চিঠিতে এসব সুপারিশ করা হয়।

জানতে চাইলে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৩ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে রংপুর জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষর জাল করে ৪০০-এর বেশি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। এ বিষয়ে ২০১৭ সালের ১৮ মে মামলা হয় রংপুরে। ওই মামলার আসামি শামসুল ইসলামকে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তদন্ত শেষে ৩৯১ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দেয় দুদক। ওই চার্জশিটের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক সচিব ৬ দফা সুপারিশসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘রংপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের জেএম শাখার অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক শামসুল ইসলাম আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স শাখার বালাম ও অন্যান্য রেকর্ডপত্রাদি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি বালামের পাতা পরিবর্তন করে নতুন পাতা সংযোজন করেন। আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্মচারীদের সই স্বাক্ষর জাল করে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ৪০০টি ভুয়া ও জাল আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করেন। মামলার তদন্তকালে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া ও ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু অসংগতি দেখা যায়।’ চিঠিতে এসব অসংগতি দূর করতে বলা হয়।

সুপারিশের মধ্যে রয়েছে : রংপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের মতো অন্যান্য জেলায় একইভাবে জাল আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু হয়েছে কি না যাচাই করার পাশাপাশি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের আগ্নেয়ান্ত্রের লাইসেন্স শাখার তথ্যের একটি ডাটাবেজ তৈরি। সকল জেলার আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স জেলার নিজস্ব পোর্টালে প্রদর্শন এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ক্রয় বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য অনলাইনে প্রদর্শনের ব্যবস্থা রাখা এবং লাইসেন্সধারী আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রেতা বা ডিলারদের ডাটাবেজ তৈরি করে অনলাইনে প্রদর্শন করা যাতে ভুয়া লাইসেন্সের মাধ্যমে কেউ আগ্নেয়াস্ত্র কেনার সুযোগ না পায়। লাইসেন্স জালিয়াতি রোধে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানকারী, গ্রহণকারী এবং আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রেতার মধ্যে সমন্বিত আধুনিক তথ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করে দুদক। বেসরকারি নিরাপত্তা প্রদানকারী কোম্পানি কর্র্তৃক বিধিবহির্ভূতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্সধারীদের প্রহরী হিসেবে নিয়োগ বা সংগঠিত করার বিষয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া আগ্নেয়ান্ত্রের লাইসেন্সধারীদের ব্যক্তি গত নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে নিয়োজিত করার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে।

দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত বলেন, আগ্নেয়াস্ত্র জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের কাছে চলে গেলে দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এসব সুপারিশ করা হয়েছে। দুদক কর্মকর্তারা জানান, রংপুরে অস্ত্রের জাল লাইসেন্সের মামলার তদন্তে নেমে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলে। তদন্তে দেখা যায়, জাল লাইসেন্স গ্রহণকারীদের অন্তত ৩৭০ জন সেনা, নৌ, পুলিশ, বিডিআর ও আনসার বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। অন্যরা ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদসহ অন্যান্য পেশার মানুষ। ওই সব অস্ত্রের মধ্যে ছিল শটগান ও একনলা বন্দুক। তদন্তকালে দুদক ৩৫৭টি লাইসেন্স, ৩৫৪টি অস্ত্র এবং ৪ হাজার ৩৮টি কার্তুজ জব্দ করে।

দুদক আরও জানায়, ২০১৭ সালের ১৮ মে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তৎকালীন অফিস সহকারী শামসুল ইসলামকে আসামি করে রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন ডিসি অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা অমূল্য চন্দ্র রায়। জাল লাইসেন্স দিয়ে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হন শামসুল। তদন্তে দেখা যায়, তিনি আগ্নেয়াস্ত্রের ২১টি বালামের ৩৯০টি লাইসেন্সের পুরনো পাতা ছিঁড়ে নতুন পাতা সংযোজন করেন। জালিয়াতি করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আরেক অফিস সহকারীর স্বাক্ষর জাল করে ৩৯০ জন ব্যক্তির নামে ভুয়া বা জাল লাইসেন্স ইস্যু করেন। দুদকের চার্জশিটে শামসুল ইসলাম ও দালাল আবদুল মজিদকে প্রধান আসামি এবং ভুয়া লাইসেন্স গ্রহণকারী ৩৮৯ জনকে আসামি করা হয়। দুদক কর্মকর্তাদের ধারণা, অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য জেলাতেও একই ধরনের জালিয়াতি হতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত