রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তবিক পদক্ষেপ চাই

আপডেট : ১১ জুন ২০১৯, ০৯:৫৮ পিএম

২০০৯ সালের শুরুতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়টাতে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।  বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা।  অর্থাৎ গত ১০ বছর ৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ গুণ। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এ বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে সব ব্যাংক মালিকের সঙ্গে বৈঠক করে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না।’ অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণার আগে আগে ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই ঋণখেলাপিদের জন্য বড় সুবিধা আসার ইঙ্গিতে জানুয়ারি-মার্চ তিন মাসেই দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে আরও ১৬ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো অবলোপনের হিসাব বাদেই দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল।

 

খেলাপি ঋণের এই পরিমাণ বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক তথ্য। তবে ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও অনেক বেশি। অনেক ব্যাংকই বড় অঙ্কের বহু ঋণ আদায় করতে পারছে না, আবার নানা কারণে তা খেলাপি হিসেবেও চিহ্নিত করছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকও এতে যথাযথভাবে নজর দিচ্ছে না বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এ ছাড়া শেয়ারবাজারের অজুহাতে প্রতি বছরই ব্যাংকগুলো নানারকম ছাড় নিচ্ছে। এতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য যেমন বেরিয়ে আসছে না, তেমনি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে না।  

 

এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট একটা বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, ব্যাংকে ঋণ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে সেটার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়ে। বেসরকারি খাতে একদিকে যেমন ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমছে, অন্যদিকে সুদের হার বাড়ছে। দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ ব্যাংকিং খাতে প্রাণ নেই। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাবে তারল্যের ২৬-২৭ শতাংশই সঞ্চয়পত্রে চলে গেছে। বেশি সুদ ও কর ছাড়ের কারণে সবাই সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন। আবার আমদানি যে হারে বেড়েছে, সে হারে রপ্তানি না বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় মূল্যের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। এদিকে, খেলাপি ঋণের কারণে বিপুল পরিমাণ টাকা আটকা পড়েছে। সম্ভবত এসব মিলিয়েই এখন তারল্য সংকট এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। 

 

একদিকে গগনচুম্বী খেলাপি ঋণ, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকটে এখন প্রশ্ন উঠছে এত টাকা তাহলে যাচ্ছে কোথায়? ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি বলছে, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ৭ হাজার কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বিদেশে পাচার হওয়া টাকার সঠিক পরিমাণ সম্পর্কে সরকারি তথ্য না মিললেও এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্যটা আমাদের জানাÑ ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী খেলাপি ঋণের অনুপাত ২ শতাংশের কম রাখতে হয়, যা বাংলাদেশ কখনোই অর্জন করতে পারেনি।  ২০১৭ সাল শেষে দেশের খেলাপি ঋণ ছিল ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

 

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, খেলাপি ঋণ এই পরিমাণ বৃদ্ধির কারণ যতটা না বাস্তব অর্থে অর্থনৈতিক কার্যকারণ সম্পর্কিত তারচেয়ে বহুগুণে বেশি অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বলা যেতে পারে, এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবদুষ্ট হয়ে ঋণগ্রহীতার বাস্তব সক্ষমতা যাচাই না করেই অনেক বেশি ঋণ দেওয়া এবং সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ না করা দুটোই ঘটেছে। আর এই বিপুল পরিমাণ ঋণ যে উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করার কথা সেটা হয়েছে কি না সেটাও এক বড় প্রশ্ন বটে। ফলে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে তাতে তার স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারার শক্তি ও ইচ্ছা রয়েছে কি না সেই প্রশ্নও উঠতে পারে। কেননা, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি, উপরন্তু ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিতে দফায় দফায় নীতিমালা পরিবর্তন করতে দেখা গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে প্রকৃত রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে এসে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত