রোহিঙ্গা ফেরাতে অনিশ্চয়তা উদ্বেগ সরকারে

আপডেট : ১৩ জুন ২০১৯, ০৩:১৮ এএম

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর অনিশ্চয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইস্যুটি নিয়ে সরকারের ভেতরে ভীষণ উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী বাহবা কুড়ালেও ইস্যুটি এখন বিষফোঁড়া হয়ে উঠছে। দেশ রূপান্তরকে তারা বলেন, দ্রুত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে না পারলে এ নিয়ে সংকট ঘনীভূত হবে। অথচ তাদের ফেরত পাঠানোর সব চেষ্টাই যেন ব্যর্থ হতে চলেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি বারবার তুলে ধরা হলেও কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতিকে তা অবহিত করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখেও উদ্বেগ ও হতাশার কথা শোনা যাচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী যেটা বলেছেন, একেবারে সহি কথা বলেছেন। দেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান সংকট তৈরি করতে পারেÑএ আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি তাদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে। কিন্তু নিরাশ হতে হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ব্যাপারে মিয়ানমারের সঙ্গে করা সব চুক্তিই তারা ভঙ্গ করছে। তিনি বলেন, কখন রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো শুরু করতে পারব, তার কোনো দিনক্ষণ বলা যাবে না। বিষয়টি একেবারেই অনিশ্চিত।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিপীড়নে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আর আগে থেকেই ৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত ছিল। গত বছর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য চুক্তি হয়; যাতে প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মিয়ানমারের অসহযোগিতায় বিষয়টা এখনো ঝুলে আছে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও দলীয় নেতারা বলেন, গত রবিবার গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা নিজেও জানিয়েছেন, মিয়ানমার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায় না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন আমরা চুক্তি করেছি। সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। তারপরও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। কিন্তু ওইভাবে তাদের সাড়াটা পাই না। মিয়ানমারই আগ্রহী না।’ তবে আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে এ বিষয়ে ফলপ্রসূ কিছু একটা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা আলাদাভাবে ভারত, চীন ও জাপানের সঙ্গে কথা বলেছি। এসব দেশ মেনে নেয় যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু সমস্যা যেটা দেখতে পাচ্ছি, এই যে বিভিন্ন সংস্থা আছে, আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, তারা কখনোই চায় না কোনো রিফিউজি নিজ দেশে ফিরে যাক। এটাই সমস্যা। তিনি বলেন, আমরা চুক্তি করলাম, তালিকা করলাম। এরপরই তারা আন্দোলন করল যে তারা যাবে না। এই আন্দোলনের উসকানিটা তাহলে কারা দিল?’ আরেকটা সমস্যা হলো, রোহিঙ্গারা মনে করে, তারা সেখানে গেলে তাদের ওপর আবারও অত্যাচার-নির্যাতন হবে। কিন্তু সেখানে তো এখনো কিছু রাখাইন লোকজন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংস্থাগুলো কখনোই চায় না যে রোহিঙ্গারা ফিরে যাক। তাদের ধারণা, এই যে বিশাল অঙ্কের টাকাপয়সা আসে, অনেকের চাকরিবাকরি আছে। রোহিঙ্গারা চলে গেলে তাদের অনেকেরই চাকরি থাকবে না। না হলে কেন এ রকম হবে?

সরকারের দুই মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় বাংলাদেশে পাকাপোক্ত হওয়া শুরু করলে আঞ্চলিক সম্প্রতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক আন্দোলন চাঙ্গা হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। সরকারের ভেতরে এ নিয়ে চরম অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তাই এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই আমরা চেষ্টা করছি অন্তত অর্ধেক রোহিঙ্গা তাদের দেশে ফিরে যাক। ওই দুই মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরের ওপর সরকারের কড়া নজরদারি থাকলেও তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ইতিমধ্যে তাদের অনেকে বিদেশেও চলে গেছে, যা বাংলাদেশের জন্য সুনাম ক্ষুণœ করছে। 

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানো শুরু করা। কারণ রোহিঙ্গারা ভবিষ্যতে সংকট সৃষ্টি করবে। রোহিঙ্গা হটাও ইস্যুতে আঞ্চলিক আন্দোলন শুরু হতে পারে। সারা দেশে ছড়িয়ে যেতে পারে এই আন্দোলন। যার ফলে আমাদের আঞ্চলিক সম্প্রীতি নষ্ট হবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গারা ব্যবহার হতে পারে সরকারবিরোধী নানা ষড়যন্ত্রে। এসব সম্ভাব্য সংকট মাথায় নিয়ে রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত