বাংলাদেশের পাখির চোখ এখন যেমন ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ক্রিকেটবিশ্বেরও! এবারের বিশ্বকাপ আবার যেন পাদপ্রদীপের আলোয় এনে দিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে, বহু বছর পর। আবারও যেন সেই পুরনো দিনের ছোঁয়া। পেস-তাণ্ডব, গেইল-রাসেলদের ছক্কা মারার প্রতিযোগিতা, অপরিণত ব্যাটিংয়ের মাশুল-উসুল করতে দুর্ধর্ষ বোলিংÑ ক্যারিবিয়ানরা এবার কিন্তু বিশেষ করে আশা জাগিয়ে তুলেছেন ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে।
ফুটবলের সঙ্গে তুলনা করলে ক্রিকেটের ওয়েস্ট ইন্ডিজ তুলনীয় ব্রাজিলের সঙ্গেই। মনোহরণ, দুই দলই, সে কারণেই একমাত্র। ব্রাজিল হারলেও মন জিতে নেয় যেমন, হলুদ ঝড় ওঠে গ্যালারিতে, ক্রিকেটে সেভাবে মেরুন ঝড় ওঠে না। কারণ হলো, যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বসেরা ছিল, ক্রিকেট তখনো শ্বেতশুভ্র পোশাকেই খেলা হতো। জামার সেই রং এখন বলে, ক্রিকেট এখন সাদা-পোশাকের নয়, সাদা বলের। মেরুন রং গত শতকের নয়ের দশক থেকে এসেছে। ১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে প্রথম বিশ্বকাপ দেখেছিলাম রঙিন জামায়। পরে, ব্রায়ান লারা ছিলেন, কার্টলি অ্যামব্রোস-কোর্টনি ওয়ালশরাও। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের সূর্য তখন অস্তমিত। মাঝের এই বছরগুলোয় নানা সমস্যায় দ্বীপপুঞ্জের ক্রিকেট অনেকটাই হারিয়েছিল তার কৌলীন্য।
২০১৯ কিন্তু সেই ধারায় ব্যতিক্রম। ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষ পর্যন্ত নকআউটে পৌঁছতে পারবে কি না, সময় বলবে। কিন্তু এখনই যা হয়ে গিয়েছে, তিনটি ম্যাচের পর বেশ উৎসাহী ক্যারিবীয় ক্রিকেটজনতা। পাকিস্তানকে বল বাউন্স করিয়ে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরুর পর হইচইটা বিলেতে বসে দেখতে ভালোই লাগছিল। এখনকার ওয়েস্ট ইন্ডিজে রবার্টস-হোল্ডিং-গার্নার-মার্শাল নেই, যাদের নাম শুনলেই বিপক্ষ ব্যাটসম্যান ম্যাচের আগেই ভাবতে বসত, কখন একটা রান নিয়ে অন্যপ্রান্তে যাবে! কিন্তু রক্ষা তো নেই তাতেও। একমাত্র সুনীল গাভাস্কার যা বলতেন, শুনলে এখনো প্রথমে ছোট্ট হাসি খেলে যায় ঠোঁটে। সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যার টেস্ট শতরান সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, গাভাস্কারকে প্রশ্ন করা হয় যখন, কী করে সামলাতেন বিরাট চেহারার ও অত্যন্ত দ্রুতগতির বাউন্সারগুলো, সানিভাই বলে ফেলেন, ‘আমার উচ্চতাটাই তো আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ তখন। বুঝলে না, ওদের বাউন্সারগুলো তো আমার মাথার ওপর দিয়ে চলে যেত!’
পাঁচ-পাঁচের গাভাস্কার রসিক মানুষ। অবলীলায় নিজের দক্ষতাকে এভাবে দেখতে এবং দেখাতে সক্ষম। মার্শালের বলে তার হাত থেকে কানপুরে ব্যাট পড়ে যাওয়ার পরের টেস্টে দিল্লিতে যখন ২৯তম শতরান করতে গিয়ে তূণ থেকে বের করে এনেছিলেন হুক শট, আমরা পেয়েছিলাম হেলমেটহীন তার দক্ষতার প্রমাণ, প্রখর সূর্যালোকে, ফিরোজ শাহ কোটলায়। ক্রিকেট আসলে এমন বহু রূপকথাসম গল্পের জন্মদাতা বলেই বোধহয় যে সমস্ত দেশ গল্পের মৌতাতে বেড়ে উঠতে চায়, বেঁচে থাকতে চায়, খেলাটা এতটাই গ্রাস করে ফেলে জনমানসকে।
ইংল্যান্ড সেই বিপজ্জনক ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে নামছে সাউদাম্পটনে, শুক্রবার। মজার তথ্য, যে
পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, সেই
পাকিস্তানের কাছেই হারতে হয়েছে আয়োজকদের। এই ছাতা-মাথায় বৃষ্টির বিশ্বকাপে এখন বল মাঠে পড়লেই খবর। দুটো দলই চাইবে ২ পয়েন্ট, ঘরে যোগ হতে পারে একটি-একটি করেও। যদি তা না হয়, চোখ টেনে নেবেন শেলডন কটরেল, ওশেন টমাস আর জোফরা আর্চার, নিশ্চিত।
তিনজনই ক্যারিবীয়, শুধু একজন, জোফরা, খেলবেন ইংল্যান্ডের হয়ে। তাদের বলের জোর যেকোনো প্রজন্মকে উৎসাহী করে তুলবে, তাদের বল সরাসরি স্টাম্পে লাগলে জিং-বেলের সাধ্য নেই স্টাম্পের ওপর অনড় থাকার! আর ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের এবার অন্যরকম আনন্দ দিচ্ছেন কটরেল। বাঁহাতি জোরে বোলার তিনি, জ্যামাইকাজাত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেরা সময়ের চার (কলিন ক্রফটকে ধরলে পাঁচ) জোরে বোলারই ডানহাতি ছিলেন। ক্রিকেট মাঠে ব্যাটসম্যানদের জন্য যেমন, দ্বীপপুঞ্জের ক্রিকেট-দর্শকের কাছেও কটরেলের অবদান তাই ‘নিউ অ্যাঙ্গেল’, নতুন কোণ, দৃষ্টিকোণও!
বাংলাদেশ কেন তাকিয়ে থাকবে? সহজ তো, পরের ম্যাচ, আগামী সোমবারই যে বাংলার বাঘদের খেলতে হবে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই টনটনে, যেখানে বুধবার পাকিস্তানের মোহাম্মদ আমির কালঘাম ছুটিয়ে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলীয়দের, ৩০ রানে ৫ উইকেট নিয়ে। সাকিবরা সাবধান!
