উন্নত দেশগুলো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অর্ধেকের বেশি অর্থ ব্যয় করে বাজেট বাস্তবায়নে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও নেপালেরও বাজেট ব্যয় জিডিপির ২৫ শতাংশের বেশি। রাজস্ব আহরণে খরা আর বাস্তবায়নে দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশের বাজেটের আকার প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার জিডিপির ১৮ শতাংশ। এই বরাদ্দে শিক্ষা,
স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাতেই পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ, জ¦ালানি, পরিবহনের মতো অবকাঠামো খাতেও রয়েছে বরাদ্দের অভাব। রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা না গেলে সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে না।
নতুন অর্থবছরে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৬১ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা বেশি আহরণ করতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ৩০ শতাংশ করে বেশি রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়। এ বিবেচনায় এক বছরে রাজস্বে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য তুলনামূলক যৌক্তিক। তবে এই পরিমাণ রাজস্ব আহণের উদ্যোগ নতুন বাজেটে নেই।
মোবাইল ফোনের কল ও এসএমএসের ওপর ৫ শতাংশ বাড়তি সম্পূরক শুল্ক ও ১ শতাংশ সারচার্জ আরোপের ফলে রাজস্ব আহরণ কিছুটা বাড়বে। তবে এর ফলে ব্যবসার ব্যয়ও বাড়বে। তামাকের বাড়তি করও রাজস্ব বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। তবে কাঠামোর বদল না হলে তামাক আর মোবাইলের কর অর্থনীতিকে সামনে নিয়ে যেতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারবে না। এ লক্ষ্য পূরণ করতে হলে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে।
মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আইন কার্যকর করার উদ্যোগ থাকলেও এর হার এক স্তরে নিয়ে আসতে না পারায় রাজস্ব আহরণে বড় লক্ষ্য পূরণে হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মূসক ধরা হলেও বেশির ভাগ পণ্যের মূসক ধরা হয়েছে ৫ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে। ১ হাজার ২০০ পণ্যে সম্পূরক শুল্ক উঠিয়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের কথা থাকলেও এই প্রতিশ্রুতি রাখা হচ্ছে না। এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়ায় রাজস্ব আহরণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ঘুষ-দুর্নীতির প্রবণতাও বাড়তে পারে।
পর্যাপ্ত আয় না থাকায় অনেক খাতেই পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এখনো জিডিপির ২ শতাংশের কম। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেড় শতাংশের কম। পেনশন বাদ দিলে সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ জিডিপির দেড় শতাংশ। অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ সাড়ে ৪ শতাংশের মতো। পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় এসব খাতে বাংলাদেশে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে কম।
অর্থ আয়ের পাশাপাশি ব্যয়ের দক্ষতা না থাকায় বাজেটের আকার বাড়ছে না। এ ধারা অব্যাহত রেখে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন করা শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবও। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে প্রতিবছর আরও অনেক বেশি বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে আয় ও ব্যয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অন্যথায় পথ হারাতে পারে দেশের অর্থনীতি।
লেখক: মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক, ঢাকা কার্যালয়
