২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের তুলনায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উন্নয়নে বরাদ্দ কমেছে। বিষয়টিকে দেশীয় জ্বালানি খাতের জন্য হতাশাজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সরকার বিদ্যুৎ খাতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তাই এ খাতে ব্যয় বাড়ানো যৌক্তিক। কিন্তু টেকসই বিদ্যুৎ ও শিল্প উন্নয়নে টেকসই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতও জরুরি। এ দুটি খাত পরস্পর সম্পূরক। তাই জ্বালানিতেও বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। এরপরও যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তা দিয়ে শুধু আমদানি বা বেতন প্রদান নয়, খনিজ অনুসন্ধান ও আহরণে জোর দিতে হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য মোট ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৮ হাজার ৫১ কোটি টাকা। চলতি বছর যার পরিমাণ ২৬ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে এককভাবে বিদ্যুৎ খাতের জন্য রাখা হয়েছে ২৬ হাজার ১৪ কোটি টাকা। চলতি বছর যার পরিমাণ ২৪ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরে জ্বালানি খাতে মোট বরাদ্দ ২ হাজার ২০৯ কোটি থেকে কমিয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে ১ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। অসুস্থতার কারণে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তব্য শেষ করতে না পারায় প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনা বাকি বক্তব্য পেশ করেন। তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের একক জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্রমান্বয়ে জ্বালানির বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নানাবিধ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটানো সম্ভব নয় বলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির লক্ষ্যে মহেশখালীতে দৈনিক ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার দুটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এডিপির মোট বরাদ্দের বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৫০ দশমিক ৫২ শতাংশ। বাস্তবায়নের হারে যা অর্ধেক। এত স্বল্প বরাদ্দের পরও বাস্তবায়ন হার কম হওয়াটা আরও হতাশাজনক বলে মনে করছেন এই খাতসংশ্লিষ্টরা। সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির ৫ বছর পরও সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় ইতোমধ্যে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের
তুলনায় এলএনজির দাম বেশি হওয়ায় পেট্রোবাংলাকে অতিরিক্ত ১৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন পড়বে। এ ছাড়া দেশীয় কয়লা উত্তোলন বন্ধ রেখে বিদেশ থেকে আমদানি করা কয়লার ওপর নির্ভর করে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চলছে। দেশীয় জ্বালানির অনুসন্ধান উত্তোলনে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল ও জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল নামে আলাদা দুটি সংস্থা গড়া হলেও বাস্তবে তারা ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং এসব সংস্থার টাকা দিয়ে বিদেশি কোম্পানিকে অনুসন্ধানের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ তামিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনুসন্ধানহীন জ্বালানি খাতে যে বরাদ্দ তাতে এ টাকাই খরচ করা কষ্টকর। শুরু থেকে সরকার দেশীয় জ্বালানির উৎস না খুঁজে আমদানির পথে হেঁটেছে। জ্বালানির উৎস যদি আমদানি হয় তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য করা দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের যে পরিকল্পনা তাতে ২০৩০ সালে মোট জ্বালানির ৯০ ভাগ হবে আমদানিনির্ভর। তখন এই খাতে ব্যয় করতে হবে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার। অথচ আমাদের মোট বার্ষিক বৈদেশিক আয় ২০ বিলিয়ন ডলারের কম।’ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুর্নীতি-অস্বচ্ছতা দূর করা গেলে প্রতি বছর অন্তর ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।’
