টনটন স্টেশনে বাস থেকে নামার মুহূর্তেই একটি ফ্লাডলাইট চোখে পড়ল। পাশের ভ্রমণসঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করি, ওটাই সমারসেট কাউন্টি ক্রিকেট গ্রাউন্ড কি না? উত্তরটা এলো, হ্যাঁ। ইংল্যান্ডের সবচেয়ে ছোট কাউন্টি ক্রিকেট মাঠ ওটি। মাত্র সাড়ে আট হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ছাড়া আন্তর্জাতিক ওয়ানডে হয়ই না। টি-টোয়েন্টি হয়েছে মাত্র একটি, এখনো টেস্ট অভিষেকের অপেক্ষায়। ১৯৮৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু। ২০১৯ পর্যন্ত এসে এখানে ওয়ানডে ম্যাচ হয়েছে মাত্র পাঁচটি। বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচটি হতে যাচ্ছে ছয় নম্বর ওয়ানডে ম্যাচ। সবই বিশ্বকাপের ম্যাচ। ১৯৮৩ বিশ্বকাপে একটি, ’৯৯ বিশ্বকাপে দুটি ওয়ানডের পর এবারের আসরে টনটন পেয়েছে তিনটি ম্যাচ। যার দুটিই হয়ে গেছে। প্রথমটি আফগানিস্তান-নিউজিল্যান্ড, দ্বিতীয়টি পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়া।
২৬ মে ১৯৯৯-এর পর টনটনের কাউন্টি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ওয়ানডে হলো গত ৮ জুন। প্রায় কুড়ি বছর পর! ’৯৯-এর সেই ম্যাচটি দুটি কারণে বিখ্যাত হয়ে আছে। যেকোনো উইকেটে রেকর্ড জুটি গড়েছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি ও রাহুল দ্রাবিড়। দ্বিতীয় উইকেটে ৩১৮ রান করেছিলেন তারা। যেকোনো উইকেট জুটিতে বর্তমানে সেরা ওয়ানডে জুটির রেকর্ড ৩৭২ রানের। গাঙ্গুলি আর দ্রাবিড়ের ৩১৮-এর অবস্থান এখন চারে। আর ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ১৮৩ রানের ইনিংসটি ওই ম্যাচেই খেলেছিলেন প্রিন্স অব ক্যালকাটা সৌরভ গাঙ্গুলি। রাহুল দ্রাবিড়ের ব্যাট থেকে এসেছিল ১৪৫ রান। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভারতের ৬ উইকেটে ৩৭২ রানের ইনিংসটিই টনটনে দলীয় সর্বোচ্চ। পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে তিনবার এখানে তিনশো পেরোনো স্কোর হয়েছে। মাঠ আকারে ছোট। যে কারণে রান হয় অনেক বেশি। টাইমিং ঠিক না হলেও কখনো কখনো ছক্কা হয়ে যায়। এটিই বাংলাদেশ দলের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। ক্রিস গেইল, শিমরন হেটমায়ের আর আন্দ্রে রাসেলদের পাওয়ার হিটিং টাইগার বোলারদের অস্বস্তি ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশ দল সেভাবেই প্রস্তুতি নেবে। ম্যাচের আগে তিন দিন অনুশীলনের সুযোগ আছে।
ব্রিস্টলের ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ার পর গত দুদিন ছুটি পেয়েছিলেন ক্রিকেটাররা। বুধবার বিকেলে দুই ভাগে ভাগ হয়ে বাংলাদেশ দলের কোচিং স্টাফ আর ক্রিকেটাররা টনটনে এসে পৌঁছেন। মাইক্রোবাসে আসেন সব কোচিং স্টাফ। আর ক্রিকেটাররা পৌঁছান বাসে করে। বাস থেকে অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, মাহমুদউল্লাহ, মুশফিকুর রহিমরা তাদের স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নামেন। পরে সন্তানদের নিয়ে হোটেলের সামনে ছোট্ট মাঠে খেলতে নামেন তারা। সৌম্য-মোস্তাফিজরাও নামেন একে একে। শুধু নামলেন না সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, লিটন দাস, রুবেল হোসেন, মোসাদ্দেক হোসেন আর সাব্বির রহমান। কারণ ব্রিস্টল থেকে আসেননি। তারা সেখানে ছুটি কাটিয়েছেন। ছুটি কাটিয়ে সবাই গতকাল দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। আজ ঐচ্ছিক অনুশীলন আছে। তার আগে ক্রিকেটাররা ইউনিসেফ আর আইসিসির উদ্যোগে স্থানীয় স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে এক ঘণ্টা সময় কাটাবেন। তাদের মধ্যে ক্রিকেটের সঙ্গে মানবতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবেন। দুদিন ক্রিকেট থেকে দূরে ছিলেন, ছুটিতে নিজেদের সজীব করে ক্যারিবিয়ান ক্যালিপসো সুর থামানোর প্রস্তুতি নেবেন।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের অনুরোধে সংবাদমাধ্যমে কথা বলেন স্পিন বোলিং কোচ সুনীল যোশি। টনটনের মাঠে স্পিনাররা কখনই সফল হননি। এমনকি মুত্তিয়া মুরালিধরনেরও বলার মতো পারফরম্যান্স নেই। এখানে চারজন বোলার পাঁচ উইকেট নিয়েছেন। সবাই সিমার। এবার বিশ্বকাপে এখানে হওয়া দুটি ম্যাচে দুজন বোলার পাঁচ উইকেট নিয়েছেন। দুজনই সিম বোলার। একজন নিউজিল্যান্ডের জিমি নিশাম, আরেকজন পাকিস্তানের মোহাম্মদ আমির। দুজনের বলেই সুইং বড় অস্ত্র। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি বাদ দিলে, সাউথ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের মোকাবিলায় টাইগার পেসাররা খারাপ বল করেননি। আবার সমীহ করার মতো কিছু করতেও পারেননি। স্পিনাররা প্রথম দুটি ম্যাচে পেসারদের তুলনায় পারফরম্যান্সে পিছিয়ে নেই। সাইফউদ্দিন আর মোস্তাফিজ মিলেই প্রতিপক্ষের ১০ ব্যাটসম্যানকে আউট করেছেন; মাশরাফীর উইকেট একটি। আর সাকিব, মিরাজ ও মোসাদ্দেক মিলে নিয়েছেন ১০টি উইকেট। পেসাররা একটি উইকেট বেশি পেলেও রান দিয়েছেন স্পিনারদের তুলনায় বেশি। স্বাভাবিকভাবেই স্পিন কোচের সন্তুষ্টি আছে, ‘যে কন্ডিশনে খেলা হচ্ছে, এখানে স্পিনারদের ভালো করা খুব কঠিন। এর মধ্যেও সাকিব, মিরাজ, মোসাদ্দেক প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের অসুবিধায় ফেলেছে। আশা করি ওরা এখানেও ভালো করবে।’
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা পাওয়ার হিটার বটে, স্পিনের বিপক্ষে তাদের দুর্বলতা চিরন্তন। ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে যত জয়, প্রায় সবটিতেই স্পিনাররা বড় ভূমিকা রেখেছেন। টনটনের মাঠ ছোট হলেও অত অসুবিধার কিছু দেখছেন না যোশি, ‘যেকোনো মাঠে ভালো বোলিং করার মতো অভিজ্ঞতা সাকিবের আছে। মিরাজ আর মোসাদ্দেকও মাথা খাটিয়ে বল করতে পারে।’ ক্রিকেটারদের দুদিন ছুটি পাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এই সাবেক ভারতীয় বাঁহাতি স্পিনার। টানা ম্যাচ খেলা আর ভ্রমণের ধকল কাটিয়ে উঠতে এই দুটি দিন সহায়তা করবে বলেই যোশির বিশ্বাস।
কিংবদন্তি অলরাউন্ডার ইয়ান বোথাম ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় খেলেছেন সমারসেটের হয়ে। ১৯৭৪ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক থেকে টানা ১২ বছর এখানে কাটিয়েছেন। বোথামের হোমগ্রাউন্ড এই টনটন কাউন্টি ক্রিকেট গ্রাউন্ড। ছোট্ট, সুন্দর, সাজানো-গোছানো শহরটার মতোই মাঠটি। স্যার বোথামের মাঠে রান হয়, পেসাররা সুবিধা পায়। গত বুধবারও এখানে পেসাররা দাপট দেখিয়েছেন। মোহাম্মদ আমির মাঠটির সেরা ওয়ানডে বোলিং ফিগারের মালিক হয়েছেন। এরপর প্যাট কামিন্স আর মিচেল স্টার্ক বলতে গেলে আগুনই ঝরিয়েছেন। মাশরাফী আর মোস্তাফিজ এখনো নিজেদের ছায়া হয়ে আছেন। সাইফউদ্দিন উইকেট তুলে নিলেও রান খরচে অকৃপণ। রুবেলকে এখনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। তুলনায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের শেলডন কটরেল, ওশানে টমাস, জেসন হোল্ডাররা প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়েছেন। টনটনেও তাদেরই বেশি সুবিধা পাওয়ার কথা। তাদের গতি বাংলাদেশের বোলারদের চেয়ে অনেক বেশি। তাছাড়া আবহাওয়ার কারণে বেশিরভাগ সময়ই উইকেট ঢাকা থাকছে। রুবেলকে খেলানো হলে পেসে শক্তি বাড়বে সন্দেহ নেই। বাকিদেরও ভালো করা জরুরি। সবকিছুর পরও ব্যবধান গড়ে দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে স্পিনারদের কব্জির জোরের ওপরই। স্যার বোথামের মাঠে সাকিব-মিরাজদের সামনে এখন পেসবান্ধব কিংবদন্তি পাল্টানোর চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জে উতরে গেলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নতুন লাইফলাইন পাবে।
