বাজেট অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগীদের পক্ষের

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৯, ০২:৪৯ এএম

দেশে যারা অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগী, বাজেট তাদের পক্ষেই গেছে। যারা আয় করে খায়, তাদের করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়েনি। কিন্তু বিত্তবানদের সম্পদের ওপর সারচার্জের আওতা বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ও দলীয় আদর্শের পরিপন্থী। বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক কৌশল দরকার, তারও প্রতিফলন ঘটেনি। সামগ্রিকভাবে বাজেট উচ্চবিত্তদের সুবিধা দিয়ে মধ্যবিত্তদের চাপে ফেলবে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর হোটেল লেকশোরে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই মূল্যায়ন তুলেন ধরেন। তার মতে, বাজেটর বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করলে ‘বাতাসের ভেতরে আশ্বাসের বাণী’ পাওয়া যায়। পুরো বাজেটে ভালো কিছু কথা রয়েছে। কিন্তু কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকার করের আওতা বাড়ানোর কথা বলছে। কিন্তু শুধু করের আওতা বাড়লে হবে না। অর্থ পাচার রোধে ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, করের টাকা বিদেশেও চলে যাচ্ছে। ফলে একটির সঙ্গে অন্যটি জড়িত। এই পুরো বিষয়টি প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রকাশ করা যাচ্ছে না। কারণ সুবিধাভোগীরা এটি নিয়ন্ত্রণ করছে। এ কারণে আমরা বলছি, পুরো বাজেট প্রক্রিয়ায় সচ্ছল ও উচ্চ আয়ের মানুষকে অনেক বেশি সুবিধা দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে যারা অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগী, এই বাজেট তাদের পক্ষে গেছে।

তিনি বলেন, এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাজেটে দেখিনি। কিন্তু সেটি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ও সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ছিল। এর মানে দাঁড়ায় এসব ঘোষণাকে তারা গুরুত্ব না নিয়ে বায়ুবীয় হিসাবে নিয়েছে। অন্যদিকে বাজেটে গরিব মানুষের জন্য প্রান্তিকভাবে একধরনের ব্যবস্থা থাকছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিকাশমান মধ্যবিত্ত, নিন্মমধ্যবিত্ত বাজেট থেকে খুব বেশি উপকৃত হবে না। চিন্তা, চেতনা, বুদ্ধিমত্তা এবং উপার্জনের বিবেচনায় বিকাশমান মধ্যবিত্ত অর্থনীতির চালিকাশক্তি।

কিন্তু সেই চালিকাশক্তিকে পরিপালন না করা ইশতেহারের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ ছাড়া এটি রাজনৈতিক দলের আদর্শ এবং ভোটের ভিত্তির পরিপন্থী। নাগরিক হিসেবে এটি অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়।

তার মতে, বাজেটে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। যেমন রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য ভিন্ন। এনবিআরের তথ্যে আয় বেশি দেখানো হয়েছে। বাজেটে অর্থমন্ত্রী সেই এনবিআরের তথ্যকেই ব্যবহার করেছেন।

দেবপ্রিয় বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায় অমোচনীয় প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে। এই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে পারা যাবে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা নেই। কারণ বিষয়টি উত্তরণের জন্য যে ধরনের সংস্কার, নীতিমালা ও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, বাজেটে তার নির্দেশনা নেই।

এই অর্থনীতিবিদের মতে, বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু পুঁজিবাজারের যে সুশাসন, কাঠামোগত সমস্যা, তা এই ধরনের আর্থিক পদক্ষেপ দিয়ে সমাধান হবে না। একইভাবে ব্যাংক খাতে যেসব আইনি সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তা দিয়ে ব্যাংক খাতের সুশাসনের সমস্যার সমাধান হবে না।

দেবপ্রিয় বলেন, এবারের বাজেটে ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে। এবার ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই পরিমাণ টাকা নিলে বেসরকারি বিনিয়োগে ব্যাংকিং খাত পুঁজির জোগান দিতে পারবে কি না, সেটি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য বৈদেশিক ঋণ ধরা হয়েছে ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ যদি পুরোপুরি না আসে তাহলে ব্যাংকের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে যে ঘাটতির কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে তার চেয়ে কিছুটা বাড়তে পারে। যোগাযোগ, জ্বালানি, শিক্ষাসহ শীর্ষ ৫ খাতে এডিপি বরাদ্দের ৭০ দশমিক ১ শতাংশ যাচ্ছে। আর অবশিষ্ট ১২ খাতে যাচ্ছে ৩০ শতাংশের কম। এতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।

সিপিডির এই ফেলো বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির ভেতরে যে চাপ রয়েছে, সেই চাপের স্বীকৃতি বাজেটে নেই। যেহেতু সমস্যারই স্বীকৃতি নেই, সেহেতু তারা (সরকার) তা সমাধানে অভিনব কৌশল খোঁজেনি, এটি স্বাভাবিক। সামগ্রিকভাবে মুদ্রানীতি, আর্থিক নীতিসহ কোনো নীতিতেই অভিনব কোনো কৌশল নেই। অর্থাৎ বাজেট উপস্থাপনায় অর্থমন্ত্রী যে অভিনবত্ব দেখিয়েছেন, বাজেট প্রস্তাবে আমরা সেটি খুঁজে পাইনি।

তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি রয়েছে, বাজেটে তা বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়নি। যেমন তিন কোটি কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কোন বছরে কোন খাতে কত কর্মসংস্থান হবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে, তা বলা নেই। এক কোটি মানুষ করের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে কিন্তু কোন বছরে কীভাবে কত মানুষ করের আওতায় আসবে এবং তার ফলে কত আয় হবে তা স্পষ্ট নয়।

তিনি বলেন, সিপিডির পক্ষ থেকে বারবার কিছু কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সে ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেই; বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে কমিশন গঠনসহ সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সে রকম কোনো সিদ্ধান্ত নেই; অর্থাৎ কোনো সংস্কারের প্রস্তাব স্বীকৃতিতে আসেনি।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো বলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গরিব মানুষের পক্ষে বলা হয়েছে। কিন্তু এটিকে তারা সিরিয়াসলি নিয়েছেন কি না, জানি না। ইশতেহারের অনেক প্রতিফলন নেই বাজেটে। ইশতেহার বাস্তবায়ন না হওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণ হলো, কোনো খাতে সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা এলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারা এই সংস্কারে বাধা সৃষ্টি করে। দেশের ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে এই বাধা দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার। যারা দুই বাজার থেকে অন্যায্য সুবিধা নিয়েছে, তারা স্বচ্ছতার জন্য কোনো পরিবর্তন আনতে দিতে চায় না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকিং কমিশন হলে যেসব তথ্য-উপাত্ত বের হয়ে আসবে, তা সুবিধাভোগীর জন্য স্বস্তিদায়ক হবে না। আর তারা স্বচ্ছতাকে ভয় পায়, এই দুশ্চিন্তা থেকেই তারা কমিশন করতে দিচ্ছে না।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাস্তবতার আলোকে অর্থমন্ত্রী বাজেট দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এর প্রমাণ হলো বেশ কিছু খাতে গত বছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে বরাদ্দ কমানো হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৫ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ বলা হয়েছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে তা কমিয়ে ২৪ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এটিকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি। কারণ বাড়িয়ে বলার চেয়ে বাস্তবতার নিরিখে কথা বলা ভালো।

দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার অন্যতম একটি সমস্যা। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় টাকার মান অতিমূল্যায়িত হয়ে আছে। মুদ্রার বিনিময় হার সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি করা যেত। এ ছাড়া বাজেটে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে যে নগদ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, সেটি না দিয়ে মুদ্রামানের অবমূল্যায়নই যুক্তিসংগত পদক্ষেপ নেওয়া যেত।

দেবপ্রিয় বলেন, নিন্মমধ্যবিত্তদের করযোগ্য আয়ের সীমা বাড়ল না, কিন্তু বিত্তবানদের সম্পদের ওপর সারচার্জযোগ্য সীমা বাড়ানো হয়েছে। তার মানে হচ্ছে যে আয় করে খায়, তার জন্য আপনার কোনো সমবেদনা রইল না, আপনি সুবিধা দিলেন সম্পদশালীদের। আমাদের কাছে এটি বৈপরীত্য মনে হয়েছে। এটা নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গেও মেলে না।

তিনি বলেন, আবারও অ্যাপার্টমেন্ট, ফ্ল্যাটে কালো টাকা বিনা প্রশ্নে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটা এখন চলতি বিষয়ে পরিণত হয়েছে, এখন আর এটি মৌসুমি কোনো বিষয় নয়। তবে এখন অঘোষিত আয় ও বেআইনি আয়Ñ এ দুটির ওপর পার্থক্য করার সময় এসেছে। এভাবে অবৈধ অপকর্মের মধ্য দিয়ে অর্জিত আয়ও যদি এভাবে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে সেটি শুধু নির্বাচনী ইশতেহারের পরিপন্থীই নয়, এটা সংবিধানেরও বিপরীতে চলে যেতে পারে।

ভ্যাট আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই আইনে জটিলতা রয়েছে। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হবে। এতে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ তৈরি হবে। গত বছরের তুলনায় এই অর্থবছরে ধান-চাল সংগ্রহে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি বলে কৃষক উপকৃত হবেন না বলেও মন্তব্য করেন এই অর্থনীতিবিদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত