দেড় যুগেরও বেশি সময় আগে রাজধানীর রমনা বটমূলে বাংলা বর্ষবরণের দিন বোমা বিস্ফোরণে ১০ জন নিহত ও আহত হন অসংখ্য। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হলেও সাক্ষীর অভাবে আটকে আছে বিস্ফোরক মামলার বিচারকাজ। ২০১৫ সালে অভিযোগ গঠনের পর বিস্ফোরক আইনের এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২৬ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো সাক্ষী না আসায় চাঞ্চল্যকর এ মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে না।
পূর্ব বিরোধের জেরে ১৯৯৮ সালের ১৬ মার্চ রাজধানীর ডেমরার কলিমউল্লাহরবাগ এলাকায় প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হন হযরত আলী ও মাসুদ হোসেন ব্রিটেন নামে দুই যুবক। পরে হাসপাতালে মারা যান হযরত; মাসুদের দুই হাত কনুই থেকে কেটে ফেলা হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০০৪ সালের ৮ আগস্ট অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর নির্দেশ দেয় ঢাকার সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত। তবে ২১ বছর আগের এ মামলায় এখন পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণই শুরু হয়নি। কোনো সাক্ষী আদালতে আসেনি। সম্প্রতি হাইকোর্ট এক আদেশে এ মামলায় সরকারি সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে না এলে তাদের বেতন আটকে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
শুধু এ দুটো মামলাই নয়, দিনের পর দিন মামলাজট বাড়ছে আদালতে। কিন্তু সাক্ষীর অভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে না খুন, ধর্ষণ, ডাকাতির মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ফৌজদারি মামলায় আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণে সাক্ষীরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জেরার মাধ্যমে আসামির অপরাধ প্রমাণিত হয়। কিন্তু অনেক মামলাতে বছরের পর বছর সাক্ষী আসে না, মামলাও নিষ্পত্তি হয় না।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭১ (২) (১) ধারা অনুযায়ী, ফরিয়াদি বা সাক্ষী মামলার শুনানিকালে যাতে আদালতে উপস্থিত হন তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। আর ফৌজদারি বিধান অনুযায়ী প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষীদের আদালতের সামনে উপস্থিতি নিশ্চিত করবে। তবে সাক্ষীকে উপস্থিত করতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে বিষয়ে আইনে কিছু বলা নেই। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা মনে করেন, আইনের এ সুযোগটি গ্রহণ করার কারণেই সাক্ষী হাজিরে পুলিশের জবাবদিহির কোনো বালাই নেই। কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে কিংবা কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এমন নজির নেই বললেই চলে।
ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও সাক্ষ্যগ্রহণের দিনে সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ২০১৫ সালের ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট সাক্ষী সুরক্ষা আইন করার পাশাপাশি সাক্ষীর গরহাজিরে পুলিশ ও সরকারি কৌঁসুলিদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিধান আইনে যুক্ত করার নির্দেশ দেয়। তবে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. আমীর হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চের ওই নির্দেশনা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষী আসেনিÑ এ তথ্য উল্লেখ করে মামলায় একের পর এক সময় নেওয়া হচ্ছে। এতে করে মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে। মামলার জট বাড়ছে। বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও ন্যায়বিচার বিঘিœত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সাক্ষী হাজির না থাকায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও সরকারি কৌঁসুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিংবা কাউকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়েছে এমন শুনিনি। সাক্ষী যদি আদালতে না আসে তাহলে মামলা নিষ্পত্তি হবে কীভাবে, এভাবে কি ন্যায়বিচার হবে?’
ব্যারিস্টার শফিক জানান, আইনমন্ত্রী থাকাকালে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সংশোধনীর খসড়ায় বলা হয়েছিল, সাক্ষী না আসার বিষয়ে কোনো একটি বিশেষ কারণে আদালত যদি সন্তুষ্ট হন, তাহলে শুনানি এক সপ্তাহের বেশি মুলতবি হবে না। এ ছাড়া সাক্ষী আসে না বলে বারবার সময় নেওয়া ও সাক্ষী আনার দায়িত্ব যে কর্মকর্তার তিনি যদি তা করতে ব্যর্থ হন তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু পরে এটি আর আলোর মুখ দেখেনি বলেও জানান তিনি।
পুলিশ ও সরকারি আইনজীবীরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাক্ষীরা আদালতে আসতে অনীহা দেখান। অনেক সময় আসামিরা প্রভাবশালী ও অপরাধপ্রবণ থাকায় সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে ভয় পান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাক্ষীদের ঠিকানায় তাদের পাওয়া যায় না। আদালতের সমন ও অ-জামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেও সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। এ বিষয়ে এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক মামলার ক্ষেত্রে কিছু পুলিশ ও আইনজীবীদের মধ্যে যোগসাজশ থাকে। সাক্ষী আদালতে এলেও সাক্ষীকে দূরে রেখে আদালতকে জানানো হয় যে সাক্ষী আসেনি। এভাবে ন্যায়বিচার হবে না। সাক্ষী হাজির না হলে পুলিশ ও আইন কর্মকর্তার জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হলে মামলা নিষ্পত্তি হবে, ন্যায়বিচারও প্রতিষ্ঠিত হবে।’
তবে সাক্ষীর গরহাজিরে পুলিশ ও প্রসিকিউশনের কোনো অবহেলা নেই বলে মনে করেন ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমন ইস্যুর পরে সাক্ষীদের আদালতে আনার দায়িত্ব পুলিশের। তব প্রসিকিউশনেরও দায়িত্ব রয়েছে। সাক্ষীদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে তাদের আদালতে আসতে বলা এবং এটি আমরা করি। কিন্তু সাক্ষীদের যদি তাদের ঠিকানায় না পাওয়া যায় কিংবা তারা যদি আদালতে আসতে না চান সেক্ষেত্রে তো সমস্যা, সেক্ষেত্রে কী হবে? সাক্ষী না এলে প্রসিকিউটররা কি বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাক্ষী নিয়ে আসবেন, প্রসিকিউটররা কি সারা বাংলাদেশে সাক্ষী খুঁজে বেড়াবেন? সাক্ষীর হাজিরা নিশ্চিত করতে পুলিশ বা প্রসিকিউশনের অবহেলা রয়েছে বলে আমি মনে করি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট মামলায় যে পুলিশ কর্মকর্তা চার্জশিট দেন তার উচিত সঠিক ঠিকানা দেওয়া। এক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে টেলিফোন নম্বরে যোগাযোগ করা যেতে পারে। আর এখন একটি বিধান করা হয়েছে যে চার্জশিটে সাক্ষীদের টেলিফোন নম্বর দেওয়া থাকবে। অনেক সময় এভাবে সাক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়।’
