বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে চিকিৎসক নিয়োগ বাতিলে একাট্টা সবাই

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৯, ০১:৪৫ এএম

উপাচার্যের সঙ্গে অধ্যাপকদের বৈঠক

সংবাদ সম্মেলনে অনিয়ম তুলে ধরলেন সহযোগী-সহকারী অধ্যাপকরা

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) শিক্ষক-চিকিৎসকরাও বিশ^বিদ্যালয় উপাচার্যকে মেডিকেল অফিসার নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের পরামর্শ দিয়েছেন। গতকাল শনিবার সকাল ৯টায় বিশ^বিদ্যালয় উপাচার্য বিভিন্ন বিভাগের অধ্যাপকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে অধ্যাপকরা নিয়োগকে কেন্দ্র করে উপাচার্যের বিভিন্ন কর্মকা-ে ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেন। তারা উপাচার্যকে বলেন, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা পুলিশের উচিত হয়নি। এমনকি এই নিয়োগ দিতে গিয়ে গত এক বছর ধরে বিশ^বিদ্যালয়ে অস্থিরতা চলছে এবং স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

এরপর দুপুর ১টার দিকে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক মিলনায়তনে একই বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন বিশ^বিদ্যালয়ের সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক এবং আওয়ামী লীগপন্থি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতারা। তারা বলেন, এ নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় আটটি সুস্পষ্ট ও নজিরবিহীন অনিয়ম হয়েছে। এসব অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ রয়েছে। ফলে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া        

বাতিলসহ তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে উপাচার্যের করা মামলা প্রত্যাহারেরও দাবি জানান তারা। এসব দাবি আদায় না হলে প্রয়োজনে এ আন্দোলন ভিসির পদত্যাগ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন এসব শিক্ষক ও চিকিৎসকরা।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রতিবেদন পাঠ করেন সহযোগী অধ্যাপক ও স্বাচিপের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আহসান হাবীব হেলাল। উপস্থিত ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয় স্বাচিপের প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক ডা. নাজির উদ্দিন মোল্লা, সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিজয় কুমার পাল, সহকারী অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয় স্বাচিপের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আরিফুল ইসলাম জোয়ার্দার টিটুসহ বিশ^বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক ও চিকিৎসকরা।

অধ্যাপকরা নিয়োগ বাতিলের পক্ষে : গতকাল সকাল ৯টার দিকে উপাচার্য তার কার্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগের অধ্যাপকদের ডাকেন। সেখানে বিশ^বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠক হয়। বৈঠকে অধ্যাপকরা মেডিকেল অফিসার নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট অস্থিরতার নিন্দা জানান এবং সংকট সমাধানের পরামর্শ দেন।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যায়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি (উপাচার্য) ডেকেছিলেন। তাকে বলেছি, গত এক বছর ধরে শুধু এই নিয়োগ নিয়েই আছেন। বিশ^বিদ্যালয়ের কনভেনশন সেন্টার নেই। ডরমিটরি বন্ধ। অনেক বিভাগে যন্ত্রপাতি নেই। অস্ত্রোপচার হচ্ছে না। বিশ^বিদ্যালয়ে এক ধরনের অস্থিরতা ও স্থবিরতা চলছে। তিনি আমাদের কারও পরামর্শ না নিয়ে পুলিশ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন। এটা ঠিক নয়।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও আওয়ামী লীগপন্থি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) এই নেতা বলেন, আমরা বলেছি, যেহেতু মেডিকেল অফিসার নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে, তাই এই নিয়োগ বাতিল করা উচিত। এই দুইশ চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়টি এসেছিল তার সময়েই আদালতের নির্দেশে বিএনপির ১৪৩ চিকিৎসক নিয়োগের প্রসঙ্গ থেকে। কিন্তু তিনি সেটা সুষ্ঠুভাবে করতে পারলেন না। এখন উচিত নতুনভাবে নিয়োগ দেওয়া বা বিশ^বিদ্যালয়ের চিকিৎসকদের মধ্য থেকে লেকচারার নিয়োগ দেওয়া।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়–য়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, অধ্যাপকদের ডেকেছিলাম তারা যেন মেডিকেল অফিসার নিয়োগ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তিতে না পড়েন। তারা নিয়োগ নিয়ে কোনো কথা বলেননি। তবে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা ও মর্যাদার বিষয়ে কথা বলেছেন। আমিও বলেছি, ফের কোনো বিশৃঙ্খলা না করলে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। আমি কথা বলেছি, পুলিশ যেন কাউকে হয়রানি না করে। তবে সেদিন (গত মঙ্গলবার) শিক্ষকরা যা করেছেন তা উচিত হয়নি। তারা চেয়ার ছুড়েছেন। ভাঙচুর করেছেন। তাদের সঙ্গে বহিরাগতরা পর্যন্ত আমার কক্ষে ঢুকেছে।

আট অভিযোগ তুলে ধরলেন শিক্ষক-চিকিৎসকরা : সংবাদ সম্মেলনে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলোÑ সন্দেহজনকভাবে পরীক্ষার ফল প্রকাশের দীর্ঘসূত্রতা, অনৈতিক উপায়ে স্বজনপ্রীতি করে পাস করিয়ে দেওয়া, প্রশ্নফাঁস, প্রার্থীর বয়স সংক্রান্ত দুর্নীতি, প্রবেশপত্রে রোল নম্বর জালিয়াতি, ভিন্ন প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা, ফল প্রকাশের আগেই কথিত তালিকা প্রকাশ ও পরীক্ষাকেন্দ্রে অসদুপায় অবলম্বন।

ডা. আহসান হাবীব হেলাল বলেন, স্বজনপ্রীতির কারণে ভিসির সন্তান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মেয়ের জামাতা, উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী-২ এর সহধর্মিণীসহ অনেকেই প্রথম সারিতে রয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরীক্ষার পূর্বেই প্রশ্নপত্রের ট্রাঙ্ক খোলার বিষয়টি স্বয়ং উপাচার্য স্বীকার করেছেন। সেখান থেকে আমাদের সন্দেহ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘নিয়োগ পরীক্ষায় নানা ধরনের অভিযোগ ওঠার বিষয়টি উপাচার্যকে তদন্ত করার সুপারিশ করলেও তিনি পরীক্ষা চালিয়ে গেছেন। গত ১১ জুন উল্টো পুলিশ ও আনসার দিয়ে দায়িত্বরত শিক্ষক ও মেডিকেল কর্মকর্তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। প্রতিবাদ করতে গেলে আমাদের লাঠিপেটা করা হয়।

এই চিকিৎসক নেতা বলেন, ওইদিন রাতে আমাদের ১৭ শিক্ষক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষক-কর্মকর্তারা দুই দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিএসএমএমইউতে চলমান মেডিকেল কর্মকর্তা নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন প্রকাশের পর নিয়োগ কার্যক্রম চালু এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। এই দাবিতে আজ রবিবার দুপুর ১২টায় উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হবে। তবে এ কর্মসূচি পালনে রোগীদের হয়রানি ও ক্লাস বর্জন করা হবে না বলেও জানান স্বাচিপ নেতারা।

ডা. বিজয় কুমার পাল বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হওয়ায় ছোট ভাইরা প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু ভিসি ক্যাম্পাসের মধ্যে পুলিশ-আনসার মোতায়েন করে আমাদের কর্মস্থলে প্রবেশ রুদ্ধ করেন। প্রতিবাদ করলে আমাকে অমানবিকভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। শুধু তাই নয়, সেদিন রাতেই আবার আমাদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর মামলা করা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের সৈনিক হওয়ার পরও আমাদের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন ও মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত