যেকোনো সময় সাসপেন্ড ডিআইজি মিজান

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৯, ১২:২১ এএম

ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় পুলিশের বিতর্কিত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থানে পুলিশ সদর দপ্তর। তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সরকারের উচ্চপর্যায়কে অবহিত করা হয়েছে। সেখান থেকেও সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। যেকোনো সময় মিজানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হচ্ছে বলে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

তারা জানান, পুলিশ সদর দপ্তর ফৌজদারি মামলা করতে না পারায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সুপারিশ করবে ফৌজদারি মামলা করে মিজানকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে। মামলা করার পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। চলতি মাসেই তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় গত রবিবার সন্ধ্যায় উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এক সপ্তাহের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তবে এর আগেই প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো সময় ডিআইজি মিজানকে সাসপেন্ড করা হবে। সাসপেন্ড করবে মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে আমরা সরকারের শীর্ষ মহলে কথা বলেছি। তারাও ব্যবস্থা নিতে সবুজ সংকেত দিয়েছেন। নতুন তদন্ত কমিটি দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রতিবেদন হাতে এলে তার বিরুদ্ধে

 

বিভাগীয় মামলা হবে। এর আগে তার বিরুদ্ধে আরও দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওইসব প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে এবার আর তিনি পার পাবেন না। তার কারণে পুলিশের বদনাম হচ্ছে।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ঘুষ লেনদেন যেহেতু ফৌজদারি অপরাধ, তাই পুলিশ সদর দপ্তর তদন্তের আলোকে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করবে। ওই সুপারিশ পাঠানো হবে দুর্নীতি দমন কমিশনে। কমিশন তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনসহ দুদকের আইনে মামলা করবে।’

নারী কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন অভিযোগে এক বছর আগেই ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের পদ থেকে শাস্তিমূলকভাবে মিজানকে সরিয়ে ওএসডি হিসেবে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ ঘুষ দেওয়া ও নেওয়ার বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে আমলে নিয়ে তদন্তের কথা বলেছেন। পুলিশ সদর দপ্তর ডিএমপি মিজানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় আসা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুটি তদন্ত কমিটি করে। ওই প্রতিবেদন যদিও আলোর মুখ দেখেনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গতকাল মঙ্গলবার একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জানান, আইন অনুযায়ী ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাকে ওএসডি করা হয়েছে। এখন আইনি প্রক্রিয়া চলছে। তিনি আরও জানান, পুলিশ সদর দপ্তর ও দুদক তদন্ত করছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ডিআইজি মিজানও আইনের ঊর্ধ্বে নন।

এআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে গতকাল বলেন, ‘তিনি (মিজান) কীভাবে ঘুষ দিয়েছেন, ঘুষের টাকা কোথায় পেয়েছেন, সেটারও তদন্ত হচ্ছে।’ তার অপকর্মের দায় পুলিশ বাহিনী নেবে না জানিয়ে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘যেহেতু মিজান নিজেই বলেছেন তিনি ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন, সেটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক; এটা একটা ফৌজদারি অপরাধ। এই অপরাধের কারণে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত বছর ১০ ফেব্রুয়ারি দুদকের উপপরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারীকে মিজানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের নোটিস জারির সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করেন। দুদক তার ও তার স্ত্রীকে অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের নোটিস দেয়, যার অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় দুদকের এনামুল বাছিরকে। অনুসন্ধানকালে তিনি (বাছির) ঘুষ নেন বলে অভিযোগ পেয়েছে দুদক। পাশাপাশি ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের মধ্যে কথোপকথনের তিনটি অডিও রেকর্ড পেয়েছে কমিশন।’

পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘নিজ নামে তেমন কোনো সম্পদ করেননি ডিআইজি মিজান; কিনেছেন নিকটতম আত্মীয়-স্বজনের নামে। শিক্ষানবিস এসআই ভাগ্নের নামে সেগুনবাগিচায় নির্মাণ সামাদ ট্রেড সেন্টারে ১ হাজার ৯১৯ বর্গফুটের বাণিজ্যিক ফ্ল্যাটে কনেন, যার দাম দেখানো হয়েছে ৫৯ লাখ ৯ হাজার টাকা। অথচ ওই ফ্ল্যাটের দাম ২ কোটি ৮৭ লাখ ৮ হাজার ৫০০ টাকা। ওই ফ্ল্যাটটি মাসে লাখ টাকা ভাড়ায় একজন ব্যবসায়ী “কিসমত রেস্টুরেন্ট ও পার্টি সেন্টার” পরিচালনা করছেন। মিজান খুব চতুর। তাকে বাগে আনা কঠিন ছিল। ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি সামনে আসায় তাকে ধরা সহজ হচ্ছে। চলতি মাসেই তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করতে পারে দুদক। দুদক নতুন করে কিছু নথিপত্র তলব করেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে।’

 

উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন : গত রবিবার সন্ধ্যায় ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রধান করা হয়েছে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) ড. মইনুর রহমান চৌধুরী, অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অর্থ) শাহাবুদ্দিন কোরেশী ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার মিয়া মাসুদ হোসেনকে। এর আগের দুটি কমিটির সদস্যও ছিলেন তারা।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেবে বলে আশা করছি।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত