রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকান্ড জনিত বিস্ফোরণ কত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, সে অভিজ্ঞতা পুরান ঢাকার নিমতলী এবং চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ড থেকে আমাদের হয়েছে। ২০১০ সালে নিমতলী ট্র্যাজেডিতে ১২৪ জন এবং এই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ৭১ জনের মৃত্যু ঘটে। এইসব অগ্নিকান্ডের পর পরই আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক কারখানা নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের বিষয়টি নিয়ে সরকার এবং সংশ্লিষ্টরা জোর তৎপরতা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। বড় কোনো দুর্ঘটনার পর সাধারণত একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়, তা হলো কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক জনপ্রতিক্রিয়া প্রশমনের উদ্দেশ্যে সাময়িক পদক্ষেপের আড়ম্বর।
নিমতলী অগ্নিকান্ডের পর ঢাকার কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম স্থানান্তর করার প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছিল সরকার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পের কোনো অগ্রগতির কথা শোনা যায়নি। স্থানীয় জনগণের আপত্তিও এই প্রকল্পের বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। পরে, সরকার কেরানীগঞ্জের প্রকল্প থেকে সরে এসে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে স্থায়ী ভিত্তিতে কেমিক্যাল পল্লী এবং অস্থায়ী ভিত্তিতে ৫৪টি কেমিক্যাল গুদাম নির্মাণের জন্য দুটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। ইতিমধ্যে প্রকল্প দুটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী’ শিরোনামে প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে। এর মধ্যে সরকার অস্থায়ী ভিত্তিতে মজুদকরণের লক্ষ্যে রাজধানীর টঙ্গীতে রাসায়নিক গুদাম নির্মাণ করবে। এর আগে রাজধানীর শ্যামপুরেও অস্থায়ী ভিত্তিতে ৫৪টি গুদাম নির্মাণসংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
টঙ্গীতে যে জায়গায় রাসায়নিক গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে সেখানে জনবসতি রয়েছে। ওই স্থানে প্রায় ৪০০ পরিবারের বাস। আবার শ্যামপুরের যেখানে রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তর করা হচ্ছে তার পাশেও ট্রাকস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন স্থাপনা আছে। তাই এসব জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে যত দ্রুত সম্ভব কেমিক্যাল গুদাম স্থানান্তর করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানকে এর জন্য উপযুক্ত জায়গা বলে মনে করা যায়। তাই সেখানে অতি দ্রুত ‘কেমিক্যাল পল্লী’ নির্মাণে সরকার সচেষ্ট হবে সেটাই সকলের প্রত্যাশা।
রাসায়নিক শিল্প খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য নানা আইন এবং সরকারের নানা সংস্থা ও দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন ও বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশ রাসায়নিকের এক বিশাল বাজার। বছরে ১৬ হাজার ২০০ কোটি টাকার রাসায়নিক আমদানি করে বাংলাদেশ, যা মোট বার্ষিক আমদানির প্রায় সাড়ে সাত ভাগ। সংশ্লিষ্টদের হিসাব মতে, আগামী ১০ বছরে রাসায়নিকের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হবে। ফলে রাসায়নিকের নীতিমালা ও ব্যবহার নিয়ে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং ব্যবসায়ী ও জনসাধারণসহ সর্বস্তরে সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। অচিরেই ‘জাতীয় রাসায়নিক তথ্যভান্ডার’ তৈরি করা দরকার। এছাড়া বাংলাদেশ ২০০৬ সালে দুবাইয়ে ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাপ্রোচ টু ইন্টারন্যাশনাল কেমিক্যাল ম্যানেজমেন্ট’ (এসএআইসিএম)-এ স্বাক্ষর করেছিল। এ বিষয়ে কতটুকু অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তা সরকারের তদারকি করা প্রয়োজন। বিশ্বজুড়ে সব ধরনের রাসায়নিকের শ্রেণীকরণ, লেবেল লাগানো ও মোড়কজাতকরণের জন্য যে ‘গ্লোবাল হারমোনাইজড সিস্টেম-জিএইচস’ আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে তাতেও বাংলাদেশকে খুব দ্রুত স্বাক্ষর করতে হবে। এছাড়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ‘জাতীয় রাসায়নিক কাউন্সিল’ গঠন করার মাধ্যমে রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তদারকি এবং নীতিমালা প্রণয়ন করা সম্ভব হবে।
জানা গেছে, রাসায়নিক পদার্থ নকল প্রসাধনী এবং ভেজাল ওষুধে ব্যবহার করা হয়। এই ব্যাপারটি তদারকি করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া ব্যবসায়ীরাও অতি মুনাফার লোভে রাসায়নিক পদার্থের পরিবহনে যে নিরাপত্তার ব্যাপার জড়িত সেটাকে এড়িয়ে যান। অর্থাৎ তারা রাসায়নিক পদার্থকে যথাযথ মোড়কজাত না করেই পরিবহন করেন। এ কারণেও যেকোনো সময়ে ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
জনবসতির মধ্যে কলকারখানা ও বাণিজ্যিক কারবার ঢুকে যাওয়া ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় নগরের অন্যতম সমস্যা। প্রমাণিত হয়েছে, কেবল পরিবেশের ক্ষতিই নয়, এসব কারখানা জীবনেরও ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। তাই এগুলোকে জনবসতির বাইরে স্থানান্তরের বিষয়টি অতি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা সমীচীন। নিমতলী এবং চুড়িহাট্টার মতো ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পুনরাবৃত্তি আর যেন না ঘটে সে জন্য যত দ্রুত সম্ভব রাজধানী থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা স্থানান্তর সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
