অবিচল ন্যায়ের শাসক খলিফা উমর (রা.)

আপডেট : ২০ জুন ২০১৯, ১০:০৮ পিএম

খলিফার শাব্দিক অর্থ ন্যায়পরায়ণ ও সঠিকভাবে পথনির্দেশপ্রাপ্ত নেতা। হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর সহচরদের মধ্যে চারজনকে এই বিশেষ সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। তারা মহানবী (সা.) ওফাতের পর ইসলামের নেতৃত্ব দেন। খলিফা শব্দটি নেওয়া হয়েছে হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর একটি হাদিস থেকে। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা আমার ও আমার ন্যায়নিষ্ঠ খলিফাদের দৃষ্টান্ত শক্ত করে ধরো।’ ইসলামের দ্বিতীয় খলিফাকে নিয়ে লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ

 

শৈশব

উমর ইবনুল খাত্তাব ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং প্রধান সাহাবিদের অন্যতম। হযরত উমর মক্কার কুরাইশ বংশের বনু আদি গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম খাত্তাব ইবনে নুফায়েল এবং মায়ের নাম হানতামা বিনতে হিশাম। তার মা বনু মাখজুম গোত্রের সদস্য ছিলেন। যৌবনে তিনি মক্কার কাছে তার বাবার উট চরাতেন। তার বাবা বুদ্ধিমত্তার কারণে গোত্রে বিশেষ সম্মানের অধিকারী ছিলেন।

উমর (রা.) বলেন, ‘আমার বাবা খাত্তাব ছিলেন একজন কঠোর প্রকৃতির মানুষ। তিনি আমাকে দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করাতেন। যদি আমি কাজ না করতাম তবে তিনি আমাকে মারধর করতেন এবং ক্লান্ত হওয়া পর্যন্ত কাজ করাতেন।’

ইসলামপূর্ব আমলে আরবে লেখাপড়ার রীতি বেশি প্রচলিত ছিল না। এরপরও তরুণ বয়সে উমর লিখতে ও পড়তে শেখেন। নিজে কবি না হলেও কাব্য ও সাহিত্যের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। কুরাইশ ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনি তার কৈশোরে সমরবিদ্যা, অশ্বারোহণ ও কুস্তি শেখেন।

তিনি দীর্ঘদেহী ও শারীরিকভাবে শক্তিশালী ছিলেন। কুস্তিগির হিসেবেও তিনি ছিলেন সুনামের অধিকারী। হযরত উমর (রা.) ছিলেন একজন সুবক্তা। তার বাবার পরে তিনি তার গোত্রের একজন বিরোধ মীমাংসাকারী হন। হযরত উমর একজন বণিক হিসেবে বাণিজ্য শুরু করেছিলেন। তিনি বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকবার গিয়েছেন। এখানে তিনি রোমান ও পারসিয়ান পণ্ডিতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং এসব সমাজের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হন।

ইসলাম গ্রহণ

৬১০ সালে মুহাম্মদ (সা.) ইসলাম প্রচার শুরু করেন। অন্যান্য মক্কাবাসীর মতো উমর (রা.) প্রথম পর্যায়ে ইসলামের বিরোধিতা করেছিলেন। তার হাতে মুসলিমরা নির্যাতিত হতো। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ৬১৬ সালে। মহানবী (সা.)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে একদিন তিনি বের হয়েছিলেন। রাস্তায় তার বন্ধু নাইম বিন আবদুল্লাহর সঙ্গে দেখা হয়। নাইম গোপনে মুসলিম হয়েছিলেন তবে উমর তা জানতেন না। উমর তাকে বলেন যে তিনি মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন।

এসময় উমর তার বোন ও বোনের স্বামীর ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে জানতে পারেন। রাগান্বিত হয়ে উমর তার বোনের বাড়ির দিকে যান। বাইরে থেকে তিনি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পান। তাকে দেখে তার বোন সেটি লুকিয়ে ফেলেন।

এক পর্যায়ে উমর সেটি দেখতে চাইলে বোন তাকে পবিত্র হওয়ার জন্য গোসল করতে বলেন এবং বলেন এরপরই তিনি তা দেখতে পারবেন। পবিত্র হয়ে তিনি যখন সুরা তাহা’র আয়াতগুলো পাঠ করেন তখন তার মন ইসলামের দিকে ধাবিত হয়। এরপর তিনি মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তার বয়স ছিল ৩৯ বছর। উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের পর প্রকাশ্যে কাবার সামনে নামাজ আদায় করতে মুসলিমরা আর বাধার সম্মুখীন হয়নি।

রাসুলের শ্বশুর

প্রথম খলিফা আবু বকরের মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেন। উমর ইসলামি আইনের একজন অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ ছিলেন। ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করার কারণে তাকে আল ফারুক (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) উপাধি দেওয়া হয়। আমিরুল মুমিনিন উপাধিটি সর্বপ্রথম তার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। ইতিহাসে তাকে প্রথম উমর হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। নামের মিল থাকার কারণে পরবর্তী কালের উমাইয়া খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজকে দ্বিতীয় উমর হিসেবে সম্বোধন করা হতো।

উমর (রা)-এর শাসনামলে খিলাফতের সীমানা অকল্পনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। এসময় সাসানীয় সাম্রাজ্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে।

তার শাসনামলে জেরুজালেম মুসলিমদের হস্তগত হয়। তিনি আগের খ্রিস্টান রীতি বদলে ইহুদিদের জেরুজালেমে বসবাস ও উপাসনা করার সুযোগ দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর শ্বশুর। অর্থাৎ উমর (রা.)-এর মেয়ে হাফসা বিনতে উমর (রা.) ছিলেন রাসুল (সা.)-এর স্ত্রী। ৬২৫ সালে তাদের বিয়ে হয়।

ন্যায়ের শাসক

খিলাফতের প্রতিষ্ঠায় উমর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রথম খলিফা আবু বকর তার মৃত্যুর আগে উমরকে তার উত্তরসূরি নিয়োগ দিয়ে যান। উমর কঠোর প্রকৃতির শাসক ছিলেন। তাই অনেকে তার শাসন সমর্থন করতে চাননি। হযরত আবু বকর (রা.) যতটা পরিচিত ছিলেন তার কোমল নম্র ব্যবহারের জন্য, ঠিক ততটাই লোকে ভয় পেত হযরত উমার (রা)-কে তার বজ্রকঠিন ব্যক্তিত্বের জন্য।

তবে এরপরও আবু বকর তাকে নিজের উত্তরসূরি মনোনীত করে যান। উত্তরসূরি হিসেবে উমরের ক্ষমতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে আবু বকর অবগত ছিলেন। যেদিন আবু বকর মারা যান সেদিনেই উমর সম্পূর্ণ বিবাদহীনভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। উমর তার ইচ্ছাশক্তি, বুদ্ধিমত্তা, রাজনৈতিক সচেতনতা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার এবং দরিদ্র ও অসহায়দের প্রতি সদয় আচরণের জন্য পরিচিত ছিলেন। তার প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল তার প্রজা ও মজলিশ আল শুরার সদস্যদের মন জয় করা। উমর বাগ্মী ব্যক্তি ছিলেন। জনগণের মনে স্থান করে নেওয়ার জন্য তার এই দক্ষতা সাহায্য করেছে। শাসক হিসেবে উমর দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন।

বিভিন্ন যুদ্ধ

৬২৪ সালে উমর (রা.) বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ৬২৫ সালে তিনি উহুদের যুদ্ধেও অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বনু নাদির গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানেও অংশ নিয়েছেন। ৬২৭ সালে তিনি খন্দকের যুদ্ধ এবং তার পরবর্তী বনু কুরাইজা গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিয়েছেন। ৬২৮ সালে তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশ নেন এবং সাক্ষ্য হিসেবে এতে স্বাক্ষর করেন। ৬২৮ সালে উমর (রা.) খায়বারের যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ৬৩০ সালে মক্কা বিজয়ের সময় উমর এতে অংশ নেন। পরে হুনায়নের যুদ্ধ এবং তাইফ অবরোধে তিনি অংশ নিয়েছেন। রিদ্দার যুদ্ধে কয়েক হাজার বিদ্রোহী ও ধর্মত্যাগীকে দাস হিসেবে বন্দি করা হয়েছিল। উমর (রা.) এসব বন্দিকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং তাদের মুক্তির নির্দেশ দেন।

প্রজাবৎসল উমর

প্রজাবৎসল উমর (রা.) সুখে ও দুঃখে রাত্রির অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতেন প্রজাদের অবস্থা নিজ চোখে দেখার জন্য। একবার রাতের বেলা নিজের সহচরী আসলামকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে একটি তাঁবুর কাছে কয়েকটি শিশুর কান্না শুনতে পেলেন। জানতে পারলেন ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদছে। খলিফার বিরুদ্ধে সেই শিশুর মা অভিযোগ করল। তিনি আমাদের খলিফা অথচ আমাদের খবর জানেন না। এই কথা শুনে খলিফা বায়তুল মাল থেকে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস একটি বস্তায় পুরে তাঁবুর কাছে ছুটে এলেন। তারপর সেগুলো তুলে দিলেন সেই শিশুর মায়ের হাতে। এই রকম আরও অনেক গল্প রয়েছে তাকে ঘিরে। তিনি খলিফার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায়ই রাতের অন্ধকারে জনগণের খবরাখবর নিতে বেরোতেন।

প্রসারিত ইসলামি সাম্রাজ্য

হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে দ্রুত হারে ইসলামি সাম্রাজ্য প্রসারিত হতে থাকে। তিনি আদমশুমারি করে মুসলিম জনসংখ্যা গণনা করেন। ৬৩৮ সালে তিনি একই সঙ্গে মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববী (‘নবীর মসজিদ’) বড় করে তোলেন। তিনি নাজরান আর খায়বারের ইহুদি ও খ্রিস্টান গোত্রগুলোকে সিরিয়া আর ইরাকে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেন।

বিশাল সাম্রাজ্যকে ধরে রাখার জন্য তিনি রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে শুরু করেন। তিনি বেশ কিছু প্রশাসনিক সংস্কার সাধন করেন। তার শাসনামলে বসরা ও কুফা শহরদ্বয় নির্মিত ও সম্প্রসারিত হয়।

৬৩৮ সালে তিনি ঘোষণা করলেন, তখন থেকে ইসলামিক পঞ্জিকা হিসেবে সাল গণনা শুরু হবে এবং সেটা হবে হিজরতের বছরকে প্রথম বছর ধরে। সে হিসেবে সেটা ছিল হিজরি ১৭ সাল। ৬৪১ সালে উমর (রা.) বাইতুল মাল গঠন করেন। সেখান থেকে বাৎসরিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। এক বছর পর তিনি দরিদ্র, অভাবী ও বয়স্কদের জন্য ভাতা দিতে শুরু করলেন।

খাল

উমর (রা.)-এর শাসনামলে বসরা শহর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পানীয় জল ও সেচের জন্য তিনি খাল খননের ব্যবস্থা করেন। বিখ্যাত পন্ডিত আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির আল তাবারি বিবরণ অনুযায়ী শহর পরিকল্পনাধীন অবস্থায় উতবা ইবনে গাজওয়ান প্রথম টাইগ্রিস নদী থেকে বসরা পর্যন্ত খাল খনন করেন। শহর তৈরির পর আবু মুসা আশআরিকে এর প্রথম গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়।

আবু মুসা আশআরি বসরা ও টাইগ্রিস নদীকে সংযোগকারী দুইটি গুরুত্বপূর্ণ খাল খনন করান। এগুলো হলো আল-উবুলা নদী ও মাকিল নদী। সমগ্র বসরা অঞ্চলে কৃষির উন্নয়ন এবং পানীয় জলের সরবরাহের জন্য এই খালদ্বয় মূল ভূমিকা পালন করেছে। উমর (রা.) পতিত জমির চাষাবাদের জন্য নীতি গ্রহণ করেন। যারা এসব জমি আবাদ করত তাদের এসব জমি প্রদান করা হয়। এই নীতি উমাইয়া আমলেও চালু ছিল। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে খাল খননের ফলে ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে কৃষিক্ষেত গড়ে ওঠে।

হত্যাকান্ড

৬৪৪ সালে উমর (রা.) একজন পার্সিয়ানের হাতে নিহত হন। হত্যাকাণ্ডটি কয়েকমাস ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পিরুজ নাহাওয়ান্দি (আবু লুলু বলেও পরিচিত) নামক এক পার্সিয়ান দাস উমরের কাছে তার মনিব মুগিরার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে। তার অভিযোগ ছিল যে তার মনিব মুগিরা তার ওপর বেশি কর ধার্য করেছে। উমর (রা.) এরপর মুগিরার কাছে এ বিষয়ে জানতে চান। মুগিরার উত্তর সন্তোষজনক হওয়ায় উমর (রা.) রায় দেন যে পিরুজের ওপর ধার্য করা কর ন্যায্য। পিরুজ বায়ুকল (উইন্ডমিল) তৈরি করতে জানত। উমর (রা.) তাকে বলেন যে সে যাতে তাকে একটি বায়ুকল তৈরি করে দেয়।

পিরুজ এর উত্তরে বলে যে সে এমন এক বায়ুকল তৈরি করবে যা পুরো পৃথিবী মনে রাখবে। পিরুজ উমর (রা.)-কে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সে ফজরের নামাজের আগে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে। এখানে নামাজের ইমামতি করার সময় উমর (রা.)-কে সে আক্রমণ করে।

তাকে ছয়বার ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। হামলার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় আশপাশের লোকেরা তাকে ঘিরে ফেলে। এসময় সে আরও কয়েকজনকে আঘাত করে যাদের কয়েকজন পরে মারা যায়। এরপর পিরুজ নিজ অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করে। তিনদিন পর উমর (রা.) আঘাতের কারণে মৃত্যুবরণ করেন। তার ইচ্ছানুযায়ী ও রাসুলের স্ত্রী আয়েশা (রা.)-এর অনুমতিক্রমে তাকে মসজিদে নববীতে মুহাম্মদ (সা.) ও প্রথম খলিফা আবু বকরের পাশে দাফন করা হয়।

মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় উমর (রা.) তার উত্তরসূরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে যান। তিনি ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটিকে নিজেদের মধ্য থেকে একজন খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত