২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করজাল বাড়ানোর যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা অর্জন খুবই কঠিন হতে পারে। এ ছাড়া ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে যে স্তর কাঠামো দেওয়া হয়েছে, তা ৩০ জুনের মধ্যে স্পষ্ট করতে না পারলে আগামী ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। ভ্যাটের স্তর অস্পষ্ট রাখা কর আদায়ে বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি বাড়াবে। অন্যদিকে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো ও খেলাপি ঋণ আদায়ে বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেই। সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বাজেট মধ্যবিত্তের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রস্তাবিত বাজেটের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক মামুন আব্দুল্লাহ
দেশ রূপান্তর : প্রস্তাবিত বাজেটে এক কোটি মানুষকে করজালে আনা হবে বলা হয়েছে। এটা সম্ভব হবে বলে মনে করেন?
জাহিদ হোসেন : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুসারে বাংলাদেশে চার কোটি মানুষ করযোগ্য। কিন্তু কর দেয় মাত্র ২০ লাখ মানুষ। সরকারের আলটিমেট উদ্দেশ্য হলো এই চার কোটিকে আমরা করের আওতায় নিয়ে আসব। কিন্তু সেটা তো একবারে হবে না, তাই আপাতত টার্গেট হলো এক কোটিতে ওঠানো। কাজেই সেটা করতে হলে এনবিআরের সক্ষমতা অবশ্যই বাড়াতে হবে। এজন্য উপজেলা পর্যন্ত এনবিআরের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ লোকবল বাড়াতে হবে। দেশব্যাপী করযোগ্য ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে হবে। এরপর তারা যাতে রেজিস্টার বা ট্যাক্স ফাইল করেন এবং ট্যাক্স পরিশোধ করেন সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : কর আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো কী তাহলে?
জাহিদ হোসেন : এখন কর প্রশাসন যদি করদাতাবান্ধব না হয়, তাহলে শুধু উপজেলা পর্যায়ে অফিস করে এই লক্ষ্য পূরণ সহজ হবে না। করদাতাবান্ধব হতে গেলে এনবিআরকে প্রযুক্তিবান্ধব হতে হবে। এনবিআর ইনকাম ট্যাক্স ও ভ্যাট অটোমেশনের যে প্রকল্পগুলো নিয়েছে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। যদিও এগুলোর অগ্রগতি খুব কম, বাস্তবায়নের হার খুবই ধীর। অন্যদিকে এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ালেই শুধু হবে না, ভ্যাটের জন্য ব্যবসায়ীদেরও দক্ষতা বাড়াতে হবে। এখন ব্যবসায়ীরা ১০০ টাকা ভ্যাট নিলে ৫০ টাকা এনবিআরে জমা হয়। সেটা এনবিআর জানেও না। এটা বন্ধ করতে হবে। এটা বন্ধ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব মেশিন কেনার জন্য মাত্র টেন্ডার হয়েছে। এর মানে এই মেশিনগুলো কিনতে হবে, আনতে হবে, বসাতে হবে। এ ছাড়া যারা এগুলো ব্যবহার করবে, তাদের লোকজনকেও তো প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তার মানে দুই দিকের মানুষকেই শেখাতে হবে। কাজেই বাজেটে এক কোটি লোককে করের আওতায় আনা খুব কঠিন। আমাদের কাজ করার যে রীতি দেখেছি অতীতে, তাতে আরও ৮০ লাখ নতুন করদাতা করজালে নিয়ে আসা বিরাট চ্যালেঞ্জ।
দেশ রূপান্তর : এই কর মধ্যবিত্ত এবং সর্বসাধারণের ওপর চাপ বাড়াবে কি?
জাহিদ হোসেন : কর আদায়ের যে টার্গেট, তা যদি বর্তমান ২০ লাখ করদাতার ওপর বর্তায় তাহলে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ অবশ্যই বাড়বে। শুধু তাই নয়, নতুন সংখ্যা যদি বাড়ানো না যায়, তাহলে এটা আরেক ধরনের বৈষম্যের সৃষ্টি করবে।
দেশ রূপান্তর : নতুন ভ্যাট আইনে কয়েক স্তরে ভ্যাট নেওয়ার যে প্রক্রিয়া চালু হচ্ছে, এই ভ্যাট স্তর কোনো জটিলতা তৈরি করবে কি? যদি করে কীভাবে করবে?
জাহিদ হোসেন : প্রচুর জটিলতা তৈরি করবে। প্রথম কথা হলো অনেক কিছু এখনো পরিষ্কার হয়নি। কোন পণ্যে ৫ শতাংশ হবে, কোনটা সাড়ে ৭ শতাংশ, কোনটাতে ১০ শতাংশ, আর কোনটাতে ১৫ শতাংশ তা এখনো পরিষ্কার করা হয়নি। আবার আরও কিছু খুঁটিনাটি বিষয় আছে। যেমন ধরুন অগ্রিম কর। এটা তারা কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সেটা এখনো পুরোটা পরিষ্কার নয়। ‘মূসক আরোপযোগ্য ভিত্তিতে বলা হয়েছে’, এখন প্রশ্ন হলো কোন মূসক? ব্যবসায়ীরা যে পণ্যে আমদানির ওপর শুল্ক দিয়েছে তার ওপর, নাকি সেটার সঙ্গে কাস্টম ডিউটি, সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি যোগ হওয়ার পর ৫ শতাংশ। এটা আগে, নাকি পরে হবে সেটা পরিষ্কার করা জরুরি। কারণ এখানে তো বড় ব্যবধান। ১০০ টাকা আমদানি মূল্যের সঙ্গে ২৫ শতাংশ সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি আছে, কাস্টম ডিউটি ১০ শতাংশ, রেগুলেটরি ডিউটি ৫ শতাংশ যোগ করলে পণ্যের মূল্য হবে ১৪০ টাকা। এখন এই অগ্রিম কর ১৪০ টাকার ওপর হবে নাকি ১০০ টাকার ওপর সেটা পরিষ্কার নয়। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন হলে শুধু বাণিজ্যে নয়, উৎপাদিত মূল্যের ওপরও ভ্যাট বসবে। এখন যারা টেলিভিশন অ্যাসেম্বল করে, টেলিভিশনের সব পার্টস যদি আমদানি করে, ওই আমদানির ওপর আগে এটিভি (অ্যাডভান্স ট্রেড ভ্যাট) বা অগ্রিম কর দিতে হতো না। এখন বলছে, অ্যাডভান্স ট্রেড ভ্যাট এখন সব আমদানির ওপরে। এর মানে উৎপাদনের মেটেরিয়াল, ফিনিশ গুডস, ইন্টারমিডিয়েট গুডস সবগুলোর ওপরই ৫ শতাংশ দিতে হবে।
দেশ রূপান্তর : এই অগ্রিম কর ব্যবসা ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন?
জাহিদ হোসেন : ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি আলাদা খরচ। তাদের পণ্যে নতুন করে ব্যয় যুক্ত হবে। যদিও বলা হচ্ছে, এটি পরে ফেরত পারে। কিন্তু বাংলাদেশে কোনো কিছু ফেরত পেতে হলেও আলাদা খরচ রয়েছে। এই খরচ কিন্তু সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। যেটাকে অতিরিক্ত ‘হিডেন ট্যাক্স’ বা ‘স্পিড মানি’ও বলতে পারেন।
দেশ রূপান্তর : বাজেট সার্বিকভাবে মধ্যবিত্তকে কতটা চাপে ফেলবে বলে মনে করেন?
জাহিদ হোসেন : প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন এসেছে ভ্যাট আইন। এতে নতুন করে কয়েকটি স্তর এসেছে। ভালোভাবে খুঁজলে আরও দুয়েকটি রেট খুঁজে পাওয়া যাবে। তার মানে ভ্যাট স্তরে একটু জটিলতা বেড়ে গেছে। ভ্যাট তো শুধু মধ্যবিত্ত নয়, সবার জন্য। কিন্তু আমাদের দেশে গরিব আর মধ্যবিত্তের সংখ্যা বেশি, ধনী লোকের সংখ্যা কম। এই যে ভ্যাটের স্তরে ৫, সাড়ে ৭, ১০, ১৫ এবং ২ শতাংশ ভ্যাট আরোপের কথা বলা হচ্ছেÑ কোন ক্ষেত্রে কোনটা প্রয়োগ হবে সেটা এখনো কেউ সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছে না। ৩০ জুনের মধ্যে এটা পরিষ্কার না করলে ১ জুলাই থেকে তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? প্রস্তাবিত বাজেটের ফলে ব্যবসায়ীরা যে ভ্যাট দেবে, তার ওপর আবার ভ্যাট দিতে হবে। তাতে করের ওপর কর বসছে। সব পর্যায় যোগ করলে সেটা ৩২ শতাংশ দাঁড়াতে পারে। তখন মধ্যবিত্তের ওপর আরও চাপ বাড়বে। কারণ ব্যবসায়ীরা তো এই টাকাটা নিজের পকেট থেকে দেবে না।
দেশ রূপান্তর : মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়ার আর কোনো কারণ আছে কি?
জাহিদ হোসেন : ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি আছে। কিন্তু অন্যান্য খরচ, যেমনÑ রেস্তোরাঁয় খাওয়া, প্রসাধনী কেনা, টেলিভিশন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন কেনা। এগুলোর সবই মধ্যবিত্তের ওপর বর্তাবে। এ ছাড়া মোবাইল স্মার্ট ফোন, সিম কার্ড, উবার-পাঠাও, অনলাইনে কেনাকাটা সবই তো মধ্যবিত্তের জন্য। এজন্য বাজেটের চাপটা মধ্যবিত্তের ওপর পড়ার আশঙ্কাটা খুব বেশি। কিন্তু সেই চাপটা কতটা বোঝা হয়ে উঠবে, সেটা নির্ভর করছে এই ভ্যাটের রেট কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তার ওপর। এই নিয়ে একটা ধূম্রজাল রয়ে গেছে। ৩০ জুনের মধ্যে এটা পরিষ্কার করতেই হবে।
দেশ রূপান্তর : এটা পরিষ্কার করা না হলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে? এতে কি দুর্নীতি বাড়ার সুযোগ আছে?
জাহিদ হোসেন : এটি একটি বিরাট কনফিউশন সৃষ্টি করবে কর আদায়ের ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে এতে কর আদায়ে বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দুটোই বাড়বে। কারণ যারা কর আদায় করবে, তারা ইচ্ছেমতো পণ্যে ভ্যাট বসাবে। তারা ব্যবসায়ীদের বলবে, এই পণ্যে ভ্যাট ১৫ শতাংশ। ব্যবসায়ীরা বলবে এটা ২ শতাংশে নিয়ে আসেন। আপনি ৪ শতাংশ নেন, আমি ৪ শতাংশ নিই। আইনের অপব্যবহারের সুযোগটা বেশি তৈরি হবে।
দেশ রূপান্তর : ডিজিটাল বাংলাদেশের সেøাগানের সঙ্গে কি প্রস্তাবিত বাজেট সামঞ্জস্যপূর্ণ?
জাহিদ হোসেন : একটা বিষয় বলতেই হয়, ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলে স্মার্ট ফোনে করারোপ কেন? এটা তো এখন বিলাসী পণ্য নয়। স্মার্ট ফোন এখন অনেকটা মূলধনী যন্ত্রপাতির মতো। শেয়ার ব্যবসা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক সিদ্ধান্ত এর মাধ্যমেই করা হচ্ছে। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ-ভাইবারে মিটিং পর্যন্ত করা যায়। এজন্য এর ওপর করারোপ বাস্তবসম্মত হয়নি। একটা উদীয়মান প্রযুক্তির দিকে কেন হাত দেওয়া হলো? টেলিকম অপারেটরদের ওপরও কর বাড়ানো হয়েছে। এমনিতেই তাদের ওপর করপোরেট কর বেশি ছিল। এজন্য প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি ও নতুন বিনিয়োগ তৈরিতে এই উদ্যোগ বাধার সৃষ্টি করবে বলে মনে করি। এটা কোনো সুচিন্তিত পদক্ষেপ হয়নি।
দেশ রূপান্তর : দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে কোনো চাপ রয়েছে বলে মনে করেন কি?
জাহিদ হোসেন : সার্বিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ঠিক আছে, খুব একটা চাপ নেই। একটা চাপ হলো বহির্বাণিজ্য খাতে ঘাটতি, আরেকটি চাপ হলো আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা। খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, ‘আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।’ কিন্তু সে কঠোর ব্যবস্থাটা কী বা কবে নেওয়া হবে তা বলা হয়নি। এ ছাড়া ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, সেটা চিহ্নিত হবে কীভাবেÑ এর সংজ্ঞাটা কী? এটা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কয়েকটি ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা থাকলেও তার সঙ্গে ঋণখেলাপির কাছ থেকে টাকা আদায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। বলা হয়েছে, ব্যাংক ও কোম্পানি আইন সংশোধন করব। তা যথেষ্ট নয়।
দেশ রূপান্তর : এক্ষেত্রে সরকারের কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে হয়?
জাহিদ হোসেন : যদি অর্থঋণ আদালতকে শক্তিশালী করা যায়, দেউলিয়া আইন যদি যুগোপযোগী করা যায় এবং ইচ্ছাকৃত ঋণের সংজ্ঞা যদি পরিষ্কার করা যায়, তাহলে যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি তাদের বিরুদ্ধে দেউলিয়া আইনের মাধ্যমেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। প্রস্তাবিত বাজেটে ওই ধরনের কোনো সংস্কারের কথা বলা হয়নি। আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় রোগ ও বিষফোঁড়া হচ্ছে খেলাপি ঋণ, এটা বন্ধ করতে না পারলে ক্যানসারে পরিণত হবে। কিন্তু বাজেটে এটার চিকিৎসা বা সংস্কারে কোনো রকম সুচিন্তিত মতামত বা পদক্ষেপ পাইনি।
ভ্যাট তো শুধু মধ্যবিত্ত নয়, সবার জন্য। কিন্তু আমাদের দেশে গরিব আর মধ্যবিত্তের সংখ্যা বেশি, ধনী লোকের সংখ্যা কম। এই যে ভ্যাটের স্তরে ৫, সাড়ে ৭, ১০, ১৫ এবং ২ শতাংশ ভ্যাট আরোপের কথা বলা হচ্ছে কোন ক্ষেত্রে কোনটা প্রয়োগ হবে সেটা এখনো কেউ সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছে না। ৩০ জুনের মধ্যে এটা পরিষ্কার না করলে ১ জুলাই থেকে তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? প্রস্তাবিত বাজেটের ফলে ব্যবসায়ীরা যে ভ্যাট দেবে, তার ওপর আবার ভ্যাট দিতে হবে। তাতে করের ওপর কর বসছে। সব পর্যায় যোগ করলে সেটা ৩২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তখন মধ্যবিত্তের ওপর আরও চাপ বাড়বে
