মা কথা বলতে পারেন না। বাকপ্রতিবিন্ধতার শিকার এই মায়ের কাছেই দলের জন্য নিবেদন, ভালো করার জেদ শিখেছেন মুশফিকুর রহিম। বাবা তাকে দিয়েছেন ক্রীড়াপ্রেম, চাচা বইয়ের প্রতি টান। লিখেছেন জে এম রউফ
‘মনা’র মা পরিষ্কার কথা বলতে পারেন না। তবে তিনি একেবারে বোবা নন। আধো উচ্চারণে বলেন। সঙ্গে তার ইশারা-ইঙ্গিত থাকে। বছরের পর বছর এভাবে মায়ের সঙ্গে মিশতে মিশতে, মায়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে ‘মনা’ তার সব কথা বুঝতে পারেন। এই মায়ের কাছ থেকেই নিয়মের প্রতি নিষ্ঠা, সময়ের কাজ সময়ে ঠিক করা শিখেছেন মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশ দলের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান-উইকেট কিপারের ধারাবাহিক সাফল্যের রহস্য কী? এই প্রশ্নের জবাবে তার বাবা মাহবুব হামিদ তারা অবলীলায় বলে দিলেন, ‘সেই ছোটকাল থেকে ওদের মা সময়ের কাজ সময়ে করছে। যেকোনো কিছু নিয়ম মেনে করা ওর মায়ের চিরকালের অভ্যাস। ছেলেও মায়ের কাছ থেকে দেখে দেখে, মায়ের নির্দেশে সেভাবে চলে বড় হয়েছে। ফলে সে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছে। ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়, কোনো দিন মুশফিকের জন্য দল কোনো সফরে দেরি করেনি কোথাও। লেখাপড়াও সে ভালোভাবেই শেষ করেছে। এখন এমফিল করছে। পরে পিএইচডি করবে।’ রহিমা খাতুনের পাঁচ সন্তান। চার ছেলে ও একটি মাত্র মেয়ে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত মুশফিক। তবে একটি বিষয়ে তিনি অন্য ভাইবোনদের পেছনে ফেলতে পারেননি। সেটি হলো মাকে ভালোবাসা। তাদের মায়ের কথা জড়িয়ে যায়, তিনি সমাজে-জীবনে একটু পিছিয়ে থাকেন। সে জন্য তার মধ্যে যে বেদনা আছে; সেটি সমানভাগে ভাগ করে নিয়েছেন তাদের সব ভাই-বোন। জীবনেও হয়েছেন তারা কৃতী। মুশফিকের কথাই বলি।
জন্ম তার ১৯৮৭ সালের ৯ মে। বয়সের হিসাবে তিনি এখন ৩১ বছরের ক্রিকেটার। এতগুলো বছর আগে বগুড়াতে জন্মেছিলেন তিনি। ক্রিশ্চিয়ান মিশন হাসপাতালে। মা দেখতে সুন্দর, ছেলেও তেমন। তাই নাম রেখেছিলেন ‘মনা’। মায়ের মন ছেলেটির জন্মের গর্বে ভরে উঠেছিল বলে তিনি ডাকনাম রেখেছিলেন মন থেকে ‘মনা’। আত্মীয়স্বজনের কাছে এখনো ৬৬ টেস্টে ৩৫ দশমিক ১৪ গড়ে ৪ হাজার ৬ এবং ২০৮টি ওয়ানডেতে ৩৫ দশমিক ১৭ গড়ে ৫ হাজার ৬৯৯ রান করা এই তুমুল ব্যাটসম্যানের নাম ‘ফরসা মনা’। তবে তার মূল পরিচয় তিনি দলের একমাত্র উইকেট কিপার। সেই ১৬ বছর বয়স থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছেন।
অভিষেক হয়েছে বিখ্যাত লর্ডসের মাঠে, ইংল্যান্ডে। ২০০৫ সালের ২৬ মে। অনেক কষ্ট করতে পারেন, কখনো কোনো চাপের মুখেও মুশফিককে রাগতে দেখা যায় না, সবার সঙ্গে মিলিয়ে চলেন, দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলেনÑ এই সবগুলো গুণ যেকোনো মানুষের মধ্যেই বিরল। মুশফিকের মধ্যে এগুলোর জন্ম হয়েছিল মাকে দেখে, মায়ের কাছ থেকে শিখে। পরে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) সেগুলো পূর্ণতা পেয়েছে, দেশ-বিদেশে খেলতে খেলতে সমৃদ্ধ হয়েছে।
খেলার প্রতি ভালোবাসা অবশ্য মিতুর বাবার কাছ থেকেই পাওয়া। বাংলাদেশ দলের সাবেক এই অধিনায়ককে বন্ধুরা এই নামেই ডাকেন। স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ের জীবনে তিনি ভালো ফুটবলার ছিলেন, নামকরা ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন। যৌবনে দল নিয়ে ঢাকায়ও খেলতে গিয়েছিলেন। বগুড়ার খেলার ভুবনে এখনো তার অবদান অনেক। আগের কালের খেলোয়াড়দের সংগঠন সোনালি অতীতের তিনি সভাপতি। যে ক্লাবের হয়ে মুশফিকের ক্রিকেট খেলার শুরু ১৯ বছর আগে, সেই মাটিডালি ক্রীড়া চক্রের তিনি সভাপতি। বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত মুশফিক এই ক্লাবের মাঠেই পড়ে থাকতেন সারাটি বেলা। ক্লাবের পাশের স্কুল মাটিডালি উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনি পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি। খেলাঘরের বগুড়া শাখার সভাপতি। অনেক বছর ধরে বগুড়াতে খেলাধুলার বিকাশে অনন্য ভূমিকা রাখা এই বাবাই ছেলের হাতে খেলার সামগ্রী তুলে দিয়েছিলেন। পেশায় তিনি নির্মাণ ব্যবসায়ী। বিখ্যাত হামিদ অ্যান্ড ব্রাদার্সের অন্যতম মালিক।
তবে ছেলের বিশ^জুড়ে অর্জনে এই বাবার গর্ব দিন দিন মøান হয়ে যাচ্ছে। মুশফিকের খেলা দেখতে, বাংলাদেশের দল ও সমর্থকদের উৎসাহ দিতে তিনি প্রায়ই গ্যালারিতে থাকছেন। মিতুদের নিয়ে তার অনেক আশা। তার নিজের ছেলের লেখাপড়ার শুরু হয়েছিল বাড়িতে। মা-ই তার প্রথম শিক্ষক। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু হয়েছিল আলোর মেলা কেজি স্কুলে। এটি আছে বগুড়ার কাটনা পাড়ায়। তবে অন্যসব ছেলেমেয়েকে নিয়ে প্রতি সন্ধ্যায় পড়াতে বসতে মায়ের কোনো ভুল হয়নি। সেও তার মতোই চুপচাপ, মনোযোগী। তাই লেখাপড়ায় ভালো করতে লাগল। প্রতিটি বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো করতে লাগল। ফলে বগুড়া জেলা স্কুলে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হলো সে চতুর্থ শ্রেণিতে। তত দিনে ফুটবলের জোয়ারে ভাগ বসিয়েছে ক্রিকেট।
আকরাম খানদের আইসিসি জয়ের গল্প আলো ফেলতে শুরু করেছে আমাদের পাড়ায়, গলিতে, মাঠে। স্কুলের বিশাল মাঠেও জড়িয়ে গেলেন মুশফিক ক্রিকেট ব্যাট-বল নিয়ে। ছোটখাটো গড়নের ছেলেটি তার মায়ের ধাঁচ পেয়েছে। চুপচাপ বলে বন্ধুরা ঠেলে দিয়েছে উইকেটের পেছনে। বাবা তাকে আরও ভালো খেলোয়াড় হিসেবে তৈরি করবেন ঠিক করলেন। নিজের যৌবন, কৈশোরের ছায়া দেখলেন তার মধ্যে। ২০০০ সালে ভর্তি করালেন বিকেএসপিতে। তখন মুশফিক সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। সেখানেও সে ভালো করতে লাগল। কেন এমন হলো মুশফিক? মাহবুব হামিদের মনে হয়, ‘ওর চাচা বিদ্বান লোক। আমার এই ভাইয়ের নাম ড. মোকসেদ হামিদ। তিনি মস্কো বিশ^বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাবিজ্ঞানে পিএইচডি। তার পড়ালেখার প্রতি আগ্রহই সে পেয়েছে। বাড়িতে যখনই তিনি এসেছেন লেখাপড়া নিয়ে কথা বলেছেন, বই নিয়ে থেকেছেন। তাই তার এই গুণটি জন্মেছে।’ বলতে বলতে একটি গল্প মনে পড়ল বাবার, তখন সে বিকেএসপিতে নাইনে পড়ে। হঠাৎ তার এক শ্রেণি-শিক্ষকের ফোন এলো। ঢাকায় যেতে হবে। খুব জরুরি আলাপ। সব কাজ ফেলে বাবা চলে গেলেন সাভারে। গিয়ে শুনলেন, ভালো ছাত্র হয়েও মুশফিক আর্টসে (মানবিক) পড়বে। বন্ধুরা তাকে সায়েন্সে পড়ার জন্য উৎসাহ দিলেও শিক্ষকদের অনুরোধ না রেখে সে আর্টসে পড়ার জন্য অনড়। ‘কী করবেনÑ এখন সিদ্ধান্ত নিন’, বললেন শিক্ষক। বাবা ছেলের সঙ্গে আলাদা কথা বললেন। তখন সে বলল, লেখাপড়া-গবেষণা নিয়ে পড়ে থাকলে খেলায় সময় দেব কখন? ফলে বাবা ফিরে বললেন, ‘আমার মুশফিক ঠিকই বলেছে, সে আর্টসেই পড়–ক।’ তবে লেখাপড়ার প্রতি তার ভালোবাসা মোটেও কমেনি। এসএসসি পরীক্ষার মাসখানিক আগে বাড়িতে চলে এলেন। বিকেএসপির নিয়মই তাই। সেই যে লেখাপড়া নিয়ে থাকলেন, খাওয়ার সময় বাদে অন্য কোনো সময় বই থেকে তার মুখ উঠল না। ক্রীড়ামোদী পরিবারের সবাই অবাক হয়ে গেলেন। তবে তারা বিকেএসপির ফোন পেয়ে খুশিই হয়েছিলেন। সে কথা মুশফিককে বলতে তিনি নারাজ হলেন। কোনোভাবেই ঢাকা যেতে রাজি নন। সামনে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষা। বাবা যতই বলেন, বিদেশ থেকে দল এসেছে। বিকেএসপির অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে তোমাকে খেলতে হবে, না হলে অন্য কোনো খেলোয়াড় তোমার জায়গায় চলে আসবে। সে ভালো করলে তুমি পিছিয়ে পড়বে। তাই তোমার শিক্ষকরা ভালোবেসে তোমাকে খেলতে যেতে অনুরোধ করেছেন। তারা তোমার প্রতিভা ছড়িয়ে পড়–ক চেয়েছেন। পরে মায়ের অনুরোধে সপ্তাহখানেকের জন্য পড়ায় বিরতি দিলেন তিনি। তাতে জিপিএ ৫ হলো না। পেলেন ৪.৩। তবে ভবিষ্যতের ভালো খেলোয়াড়দের আলাদা করে চিনে নিল বাংলাদেশ। তবে এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে ঠিকই ভালো ফল করেছেন তিনি। মায়ের মতোই অভিমানী মুশফিক। সরলও বটে। তাকে এক থেকে ছয়Ñ যেকোনো ব্যাটিং অর্ডারে খেলানো যায়, খেলতে তার কোনো দ্বিধা নেই। এইচএসসির ফলাফল বাবাকে মোবাইলে জানানোর পর তিনি ছেলের সঙ্গে রহস্য করলেনÑ ‘এই ফলাফল কী সত্য?’ সঙ্গে সঙ্গে অভিমানী মুশফিকের জবাব, ‘আমার কথা বিশ^াস করছেন না?’ এত ভালো ছাত্রকে তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে চেয়েছিলেন। তবে দেশের হয়ে বিদেশে খেলতে গিয়ে তিনি ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারলেন না। আগে থেকে শিডিউল জানতেন বলে বাবা তখন অনেককে অনুরোধ করেছেন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গেও তার দেখা করার সুযোগ হয়েছিল। তবে নিয়ম বদলাননি তিনি। বলেছেন, ভর্তি পরীক্ষায় পাস না করলে কোনো ছাত্রই প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে ভর্তি হতে পারবে না। পরে তিনি ভর্তি হয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে। পড়ার বিষয় ইতিহাস। যাতে খেলায় সময় দিতে পারেন, দেশ-বিদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানতে পারেন। অনার্স-মাস্টার্সে তার ফলাফল প্রথম শ্রেণি। খেলার সময়ও ব্যাগে বই নিয়ে যান তিনি। হয় ক্রিকেটের, নয় তার পড়ার বই পড়েন অবসরে। এখন তিনি এমফিল গবেষক। গবেষণার বিষয়Ñ দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেট ও বাংলাদেশ। পরে ভারতীয় উপমহাদেশের (ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) ক্রিকেটের ইতিহাস নিয়ে পিএইচডি করবেন।
ব্যক্তিগত জীবনও গুছিয়ে ফেলেছেন বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করা এই ব্যাটসম্যান। স্ত্রী জান্নাতুল কিফায়াত ও একমাত্র ছেলে শাহরোজ রহিম মায়াকে নিয়ে তার সংসার। মায়ের সঙ্গে তিনি, তার স্ত্রী প্রতিদিন কথা বলেন। নাতির খবর দেন। তবে এখনো আগের মতোই তার টান। ২০১৩ সালে মা-বাবার ডায়াবেটিস হওয়ার পর থেকে তাদের রাতে রুটি খাওয়া বাধ্যতামূলক হলো। পরে মা-বাবার দিকে তাকিয়ে ছেলেমেয়েরাও রুটি খেতে শুরু করলেন। মায়ের পক্ষে রুটি খাওয়া সম্ভব হলো না বলে সবাই আবার ভাতে ফিরে এলেন।
