হার যখন গলার হার!

আপডেট : ২২ জুন ২০১৯, ০১:৩৯ এএম

কষ্ট হয়। বুকের ভেতর মুচড়ে ওঠে অব্যক্ত যন্ত্রণা। গলার স্বর হঠাৎ ভারী। ভালো লাগে না কিছু। থম-হয়ে-থাকা অনুভূতি। মেলে না হিসাব, কী পেলাম!

অস্ট্রেলিয়ার কাছে বাংলাদেশের হারটা তেমন। ৩৮২ তাড়া করে ৩৩৩ রানে শেষ। একটা ক্যাচ মিস। ব্যাটসম্যান তখন ১০ রানে। তিনি তারপর আউট হলেন ব্যক্তিগত আরও ১৫৬ যোগ করে! সাব্বির রহমানের নামটা ঢুকে গেল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায়। তিনি যদি ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ধরে ফেলতে পারতেন ডেভিড ওয়ার্নারের ক্যাচটা...

কিন্তু সবসময় সব হয় না। হয় না বলেই তো গৌরবময় অনিশ্চয়তা শব্দ দুটো জড়িয়ে-মড়িয়ে আছে খেলাটার সঙ্গে, শুরুর সেই দিন থেকে। যদি আরও গোটা ৪০ রান কম হতো, যদি সাকিব আল হাসান বুঝতে ভুল না করতেন, যদি তামিম ইকবালের ব্যাট আরও চওড়া হয়ে থেকে যেত আরও কিছুক্ষণ, যদি চোটের জন্য চার ম্যাচে ৯ উইকেট পাওয়া সাইফউদ্দিন বা মোসাদ্দেক ছিটকে না যেতেন...

খেলার আসর আসলে এমনই। বড় ব্যথা দেয়। তার জন্যই তো আঁকড়ে ধরা, আরও নিবিড় করে। নিংড়ে নেওয়া খেলার রূপ-রস-গন্ধ। আগেও বিশ্বকাপে বাংলাদেশ সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু এমন মন-কেমন করা গন্ধে মাতাল করেছে কি? মনে হয়, না। খেলতে খেলতে স্মরণীয় জয় কিছু আসেই। তাদের মধ্যে গুটিকতক আবার অবিস্মরণীয় ক্যাটেগরিতে। ২০১৯-এর বাংলাদেশ সেই সব পেরিয়ে এসেছে। এখন মাশরাফী মোর্ত্তজার দল চায় দাপটে জিততে। সেই

 

জয়ের ধারা ধরে রাখতে। না পারলে হতাশ হয়। কারণ বিশ্বাস এসেছে দলে, তুমুল আত্মবিশ্বাস। বিপক্ষে যে-ই থাকুক, আমরা পারি, পারব। নাম দেখে ভীত হওয়ার দিন শেষ। এখন লড়াইয়ের পর্ব, দাঁতে দাঁত চেপে। এমন লড়াই যা ছিনিয়ে আনতে চায় জয়, পরাজয়ের ভ্রুকুটির কিনারা থেকে। এই উত্তরণই আসল। এগিয়ে নিয়ে যায়। অনেকটা।

খেলায় প্রচলিত কথা, ‘অলসো র‌্যান’, যারা সঙ্গে দৌড়য়। উসাইন বোল্টের সঙ্গে যে সাতজন দৌড়েছিলেন, কতজন মনে রাখেন! মজার কথা হলো, সেই সাতজন না থাকলে বোল্টও কি আর বিদ্যুৎ হয়ে উঠতে পারতেন? দলগত খেলাতেও নতুন উঠে-আসা দলের একটা সময়ক্রম থাকে। শুরুটা ওই ‘অলসো র‌্যান’ হিসাবে। ক্রমেই ‘ট্যাগ’টা ফেলে দিতে হয়। পারফরম্যান্স দিয়ে। মানুষের মনে ভরসা জাগিয়ে। সেই কাজটাই নিজেদের শেষ বিশ্বকাপে অধিনায়ক মাশরাফীর সঙ্গেই হয়তো করছেন বাংলার দামাল তরুণরা। জন্মাচ্ছে এক অন্য বাংলাদেশ, ক্রিকেট মাঠে। সাধে কি আর জিওফ বয়কটরাও প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছেন!

পাকিস্তানকে দেখুন। অবিশ্বাস্য রকমের ধারাবাহিকতার অভাব। ২০১৯ বিশ্বকাপে হয়তো সেরা দল ইংল্যান্ড। কিন্তু সেই আয়োজকদের হারিয়ে আর কাউকেই হারাতে পারছে না! শ্রীলঙ্কার দিকে তাকান। কষ্ট হয় ভাবতে গিয়ে যে, একসময় এই দলে অর্জুন রানাতুঙ্গার মতো নেতা ছিলেন, শ্বেতাঙ্গ দুনিয়ার রক্তচক্ষুর সামনে যিনি চোখ নামাননি। অরবিন্দ ডি সিলভা, মুরালিধরন, জয়াসুরিয়া, মাহেলা, সাঙ্গাকারাÑ ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ে লেখা নাম সব। সুনামি আসে দ্বীপরাষ্ট্রে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব। ক্রিকেটও। অবস্থা এমন, এই বিশ্বকাপে বৃষ্টিতে ভেস্তে যাওয়া ম্যাচই তাদের পয়েন্ট পাওয়ার সেরা সম্ভাবনা!

ভারতকে এই মুহূর্তে ধরা কঠিন। ক্রিকেটীয় বিচারে নয়, ক্রিকেট ঘিরে জন্মানো আবেগ দিয়ে। ১৩০ কোটির দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ক্রিকেটাররা উঠে আসছেন নিয়মিত। সুযোগ-সুবিধা, পরিকাঠামো, পরিচর্যা, টাকা-পয়সাÑ সব দিক দিয়েই এগিয়ে অনেকটা। একই সঙ্গে এই প্রশ্নটাও উঠে আসছে, এশীয় স্তরে ভারতের পর এই মুহূর্তে কে? বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো দেশই বা কাছাকাছি আসতে পারে!

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আর এক দশকের মধ্যেই এশীয় ক্রিকেটের হেডকোয়ার্টার হয়ে উঠবে বাংলাদেশ। ক্রিকেট ঘিরে দেশের আবেগের জায়গাটা দিন-দিন বাড়বে আরও। ভারতীয়দের মধ্যে এক্ষুনি যদিও ক্রিকেটের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ার কোনো লক্ষণ নেই, তিরাশি থেকে উঠতে উঠতে আজ এই জায়গায়। আরও ওপরে ওঠাটা কঠিন। হয়তো এই জায়গাটা ধরে রাখবে ভারতীয় ক্রিকেট, আরও কিছু বছর। তারপর?

বাংলাদেশ ছাড়া তখন আর কে এশীয় ক্রিকেটে ছড়ি ঘোরাতে জানপ্রাণ লড়িয়ে দেবে? ক্রিকেট নিয়ে ঝড় উঠবে এমনভাবে, আরও। ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল এখনও অনেক দূর। ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ম্যাচ বাকি। তিনের মধ্যে দুটি জিতলেও কঠিন তখন। তিনটে ম্যাচই জিতলে আবেগের যে বিস্ফোরণ হবে দেশজুড়ে, পনেরোজন বাংলাভাষীর সৌজন্যে, সেই যৌবন জলতরঙ্গ তখন রুধিবে কে!

চলার পথে গোলাপের সঙ্গেই থাকে কাঁটাও। রক্তাক্ত হতে হয়। সেটাই নিয়ম। জীবনের মাঠে, ক্রিকেট মাঠে। হারতে হারতেই জিততে শিখতে হয়, হয়েছে, হবেও। ধরে রাখতে হয় জয়ের উদগ্র বাসনা। হার তখন গলার হার! সাকিব-মুশফিকুর-মাহমুদউল্লাহ-তামিমদের ব্যাটে, মাশরাফী-মোস্তাফিজ-রুবেলদের বলে, নতুন রূপকথা লিখতে আগ্রহী বাংলাদেশ এখন ক্রিকেট-বৃত্তে অন্য জায়গা করে নিচ্ছে ব্যাট-বলের টুংটাংয়ের মিষ্টি ভালোবাসায়!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত