রাজধানীতে অবৈধভাবে ও অনিয়মের মাধ্যমে গড়ে তোলা বহুতল ভবনসমূহ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে শিগগির ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। এসব ভবনের মালিকরা যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, এমনকি মন্ত্রী-এমপি হলেও কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ার করেছেন মন্ত্রী।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে আয়োজিত ‘মিট দ্য রিপোর্টার্স’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। ডিআরইউ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
সম্প্রতি ঢাকার বহুতল ভবনে রাজউকের ২৪টি পরিদর্শন দলের অনুসন্ধানে ১ হাজার ৮১৮টি বাড়িতে অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে জানান মন্ত্রী। এসব বাড়ির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এসব বাড়ির মালিকরা অনেকেই ক্ষমতাবান, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি; তাদের সম্পর্কে রিপোর্ট করা হবে অনেকেই ভাবেননি, কারণ তারা এত পাওয়ারফুল। এসব বিল্ডিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি, আপনারা আমাদের সাহায্য করেন।
শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজউককে নির্দেশ দিয়েছি, বলেছি একটা বাড়িও ড্রপ হবে না। যদি কোনো মন্ত্রী-এমপির বাড়িও হয়, আমার নিজের কোনো আত্মীয়স্বজনও হয়, ড্রপ হবে না, আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। ঢাকার অন্য ভবনগুলোর বিষয়েও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। একটি বাড়িকেও আইনের বাইরে রাখতে চাই না।’
বনানীর এফ আর টাওয়ারের তদন্তে অভিযুক্ত রাজউকের ৬২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে গৃহায়নমন্ত্রী বলেন, ‘আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সে অনুযায়ী তদন্ত রিপোর্ট সাংবাদিকদের সামনে আমি নিয়ে এসেছি। আমার মনে হয় বাংলাদেশের ৪৮ বছরের ইতিহাসে এমন কোনো রেকর্ড নেই যে, নিজ সংস্থার ৬২ জনকে দায়ী করে মন্ত্রী প্রেস ব্রিফিং করে সবার হাতে রিপোর্ট তুলে দেন। ৬২ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে রাজউককে আমরা লিখিত নির্দেশ দিয়েছি।’
নকশার বাইরে নতুন কোনো ভবন নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কোনোরকম দুর্নীতি ও অনিয়মের ভেতর দিয়ে ঢাকা মহানগরী কংক্রিটের জঞ্জাল শহরে পরিণত না হোক; মানুষের জীবন বিপন্ন না হোক। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বনানীর অগ্নিদুর্ঘটনার মতো ঘটনা আর না ঘটুক। অনুমোদিত নকশা, ফাঁকা জায়গা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, গ্যারেজ ছাড়া ভবন নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না। পূর্বাচল, উত্তরার মতো জায়গায় নকশার বাইরে ন্যূনতম কিছু হতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, পুরান ঢাকার জন্য আমরা রিডেভেলপমেন্ট প্রস্তাব দিয়েছি। নতুন ঢাকায় বেশি অনিয়মের বিল্ডিংগুলো ভেঙে ফেলতে হবে, কম অনিয়মের যেটাকে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায়, সে বিল্ডিংকে সেভাবে ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। বেশি অনিয়মের বিল্ডিং ভাঙা না হলে সিলগালা করে দেওয়া হবে। রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যথাযথ কাজ না করলে তাদের ধরার দায়িত্ব যেমন আমার, তেমনি সব নাগরিকেরও।
ভবনে অনিয়ম নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, যেখানে যে অনিয়ম দেখেন তার নিউজ হওয়া উচিত। পত্রিকার নিউজের ভিত্তিতে আমরা তদন্ত করব। এরই মধ্যে মিডিয়ার নিউজের ওপর ভর করে ১২টি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি।
ভবনের নকশা অনুমোদনসহ যাবতীয় প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে জানিয়ে গৃহায়নমন্ত্রী বলেন, আগে নকশার জন্য ১৬টি দপ্তরের অনুমোদন নিতে হতো, আমার নির্বাহী ক্ষমতাবলে ১২টি দপ্তরের অনুমোদনের ধাপ বাদ দিয়েছি। আইন করে দিয়েছি ৫৩ দিনের ভেতর নকশা অনুমোদন হতে হবে, ভূমির ছাড়পত্র, নামপত্তন সাত দিনের মধ্যে হতে হবে। অটোমেশন চালু করে দিয়েছি যাতে বাসায় বসে নকশার আবেদন করা যায়।
নিজের মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে রেজাউল করিম বলেন, মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে সিন্ডিকেট ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারলেও কমিয়ে আনতে পেরেছি। অনেক চূড়ান্ত টেন্ডারকে বাতিল করে নতুন টেন্ডার করিয়েছি। আমার জায়গা আমি যতটা পারি পরিষ্কার রাখতে চাই। আমি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছি, ওপরে আল্লাহ, নিচে শেখ হাসিনা, মাঝখানে আমার কোনো তদবির নেই।
বিজিএমইএ ভবন ভাঙা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিজিএমইএ ভবন ভাঙার জন্য টেন্ডার আহ্বান করে আমরা সর্বোচ্চ দরদাতাকে নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাদের সঙ্গে চুক্তি করা হবে এবং চুক্তির শর্তে কোনোভাবেই জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ভবন ভাঙতে দেওয়া হবে না।
ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদক কবির আহমেদ খানের সঞ্চালনায় মিট দ্য রিপোর্টার্স অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ডিআরইউ সভাপতি ইলিয়াস হোসেন।
