আমরা তাহলে কেন কর দেব

আপডেট : ২২ জুন ২০১৯, ১০:৪১ পিএম

আমরা অনেকেই হয়তো নানা কারণে সরকারকে ট্যাক্স বা কর দিই না, যদিও কর দেওয়াটা নাগরিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং কোনো বছরের আয় করযোগ্য না হলেও প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দাখিল করাটাও এই দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

আমরা মধ্যবিত্তরা যে খুব বেশি আয়কর দিই তা নয়, তারপরও আয়কর দিতে মন সায় দেয় না। কেন জানি মনে হয়, টাকাটা বুঝি জলে গেল। আমার কষ্টার্জিত টাকাটার সদ্ব্যবহার হলো না। যে ডিআইজি মিজান ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছে, তার বেতন তো দেওয়া হচ্ছে আমাদের মতো অসংখ্যজনের আয়করের টাকায়। দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের কথাও বলা যায়। এই ভদ্রলোকও তো দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। এমন অসংখ্য মিজান-বাছিররা তো আমাদের ট্যাক্সের টাকায় বেতন-ভাতা গ্রহণ করেই অন্যায় কাজ চালিয়ে গেছেন। অবৈধ সম্পদ অর্জন করছেন। তাহলে আমরা যারা সৎপথে থেকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কোনো রকমে খেয়ে-পরে চলার মতো উপার্জন করছি, তারা আয়কর দেব কেন?

প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে সর্বশেষ অর্থবছরে আয়কর দিয়েছেন মাত্র ১৯ লাখের মতো মানুষ। এ-বছর সেই সংখ্যা কিছুটা বাড়বে আশা করা হলেও সেটি মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র এক শতাংশও হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।  যদিও গবেষকরা বলছেন, এই সংখ্যা ৫ থেকে ৬ গুণ করার সুযোগ রয়েছে।

এদিকে প্রত্যক্ষ কর না দিয়ে বা বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দিয়ে একদিকে অনেকে বেঁচে যাচ্ছেন, অন্যদিকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর করের চাপ বাড়ছে এবং পরোক্ষ করের বোঝা বাড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরেও।

আমাদের সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, প্রায় এক কোটি মানুষকে সরকার কর দেওয়াতে পারে না।  বড় বড় কোম্পানিদের কর ছাড় এবং আইন মোতাবেক কর ফাঁকি দেওয়ার গল্পও প্রচুর। দেশের মোট জনসংখ্যার যে মাত্র এক শতাংশ আয়কর দেন, তারা কেন ঠিকঠাক কর দিচ্ছেন না, তা নিয়ে বাকি ৯৯ শতাংশের চিন্তার শেষ নেই! এরই নাম গণতন্ত্র। খুব সহজ করে বললে, ‘পাবলিক ফাইনান্স’ বা সরকারি খাই-খরচার তত্ত্বগ্রাহ্য সংজ্ঞা হলো, পরের সম্পদে পোদ্দারি করা।

নাগরিকরা কেন কর দিতে চান না, সে বিষয়ে প্রচুর গবেষণা আছে। একটা কথা অনেক বার উঠে এসেছেÑ অনেক নাগরিক আছেন যারা রাষ্ট্রের দুর্নীতিকে এড়ানোর জন্য কর দেন না! আবার কর ব্যবস্থা জটিল হওয়ার কারণেও অনেকে কর দেন না এমন তথ্যও রয়েছে। তবে আমার সাধারণ জ্ঞানে মনে হয়, কর না দিয়েও পার পাওয়া যায় বলেই আমাদের দেশের মানুষ কর দেন না।

তবে সবচেয়ে হতাশা হলো আমরা যারা কর দিই, তাদের।  আমার দেওয়া করের টাকা কীভাবে খরচ হয় যদি তার হিসাব করি, তা হলে দেখব, যে যে খাতে যত টাকা খরচ হচ্ছে, তার কোনোটাই আমার মনঃপূত নয়। আমাদের দেশে দীর্ঘকাল ধরে রাস্তা ভাঙাগড়ার বিড়ম্বনা চলে, আর আমরা রাস্তার জন্য কর দিয়ে যাই। আজ শিক্ষা-উচ্চশিক্ষা সব তলানিতে গিয়ে ঠেকছে আর আমরা কর দিয়ে চলেছি।  দুর্নীতিগ্রস্ত জনপ্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের আজীবন দেখভাল, অকারণে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গবেষণার জন্য টাকা না দেওয়া, পরিবর্তে মিটিং-সেমিনারের নামে টাকার শ্রাদ্ধÑ সবই দেখছি আমরা, তবুও বলব, সরকার বাহাদুরের ঘরে কর জমা দিয়ে চলা আমাদের পবিত্র কর্তব্য?

সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা হচ্ছে করনীতির বৈষম্য। আমি বেসরকারি চাকরি করে যা আয়কর দিই, আমার এক ব্যবসায়ী বন্ধু আমার চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি রোজগার করে একই পরিমাণ আয়কর দেন। তার বাড়ি, গয়না, দশটা ক্রেডিট কার্ড, গাড়ি-ড্রাইভার আরও কত কী! তিনি যদি আমার মতোই তার গোটা আয়ের ওপর কর দিতেন, তবে তার মোট আয়করের পরিমাণ আমার দেওয়া করের তুলনায় ঢের বেশি হতো।  তিনি দেননি, বা সরকার তাকে সেই কর দিতে বাধ্য করতে পারেনি। তাতে এটাই দাঁড়াল যে আমার রোজগারের একটা অংশ সরকারের ঘরে চলে গেল, কিন্তু আমার বন্ধুর টাকা তার নিজের হাতেই থাকল। পাবলিক ফাইনান্সের তত্ত্ব বলবে, কর বাবদ জমা দেওয়া আমার টাকাটা এখন গোটা দেশের সব মানুষের টাকা। প্রশ্ন হলো, যারা রোজগার করেন না, অথবা রোজগার করেও কর দেন না, আমার রোজগারের টাকা কীভাবে তাদের সম্পদ হয়ে দাঁড়ায়?

আসলে, কর ব্যবস্থা খানিকটা বেরোজগেরে আর নিঃস্ব রাজাদের সংসার খরচ চালানোর জন্য একটি আইনানুগ ব্যবস্থা। সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য যতটা কর দেওয়া প্রয়োজন, ততটা দিতে কারও আপত্তি থাকা না থাকা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু আমার রোজগারের টাকা আপনি ক্ষমতার জোরে কেড়ে নিচ্ছেন, এটাই আসলে আয়কর। যার গতি নেই, সে দিচ্ছে; না দিয়েও যাদের উপায় আছে, তারা দিচ্ছে না।  কোনটা ভালো কাজ আর কোনটা খারাপ কাজ, কোনটা আসল সাদা আর আসল কালো, কে জানে।

যে টাকায় কর দেওয়া হয়নি, সেটাই কালো টাকা। এই কালো টাকা নিয়ে গত প্রায় দুই দশক ধরে কথা খরচা কিছু কম হয়নি। কালো টাকা নিয়ে, কর ফাঁকি দেওয়া নিয়ে যত কথা হয়েছে, সেই তুলনায় করের টাকা কোথায় যায়, কীভাবে ব্যবহৃত হয় এবং হয় না, তাতে কার কতখানি উপকার, আমার সাদা টাকাই বা অর্থনীতিতে কার উপকারে লাগে, আর কালো টাকায় কারা কারা কতটা ফুলেফেঁপে উঠছে সেই প্রশ্নগুলো কার্যত ওঠেনি। কাজেই, আরও একটা প্রশ্ন তুলে রাখা যাক।

ধরুন, আমি মোট ১০০০ টাকা রোজগার করি। তার ওপর ১০ শতাংশ হারে আয়কর দিই ১০০ টাকা।  বাকি ৯০০ টাকার মধ্যে ৪০০ টাকা ব্যাংকে সঞ্চয় করি। ব্যাংক আবার সেই ৪০০ টাকা বড়লোক ব্যবসায়ীকে ধার দেয়। তিনি ঋণটা খেলাপি করেন, অর্থাৎ টাকাটি আর ফেরত দেন না। তখন সরকার অন্য করদাতাদের টাকায় ব্যাংকে ভর্তুকি দেয়। সেই টাকায় ব্যাংক আমাকে আমার জমা রাখা ৪০০ টাকার ওপর সুদ দেয়। যে ব্যবসায়ী ব্যাংকের ঋণ মেরে দিলেন, তার অন্য ব্যবসা কিন্তু দিব্যি ধার পায়। প্রশ্ন হলো, ওই ৪০০ টাকা কোথায় গেল? কার উপকারে লাগল?

ধরুন, আমি কর ফাঁকি দিতে আরম্ভ করলামÑ অর্ধেক আয় লুকিয়ে রাখতে আরম্ভ করলাম। এখন আমি ৫০০ টাকার ওপর কর দিই ৫০ টাকা। ব্যাংকে ২০০ টাকা জমাই, হাতে নগদ কালো টাকা রাখি ২০০ টাকা। সেই ২০০ টাকা আমি আমার বাড়ির পাশের এক ক্ষুদ্র হতদরিদ্র পটোল বিক্রেতাকে ধার দিলাম। বিনা সুদে নয়, বরং ব্যাংকের সুদের হারের চেয়ে বেশি সুদেই। আমি সুদ পাই, পটোল বিক্রেতারও সংসার চলে।  আমি খুশি, পটোল বিক্রেতাও খুশি। আমার কালো টাকা কিন্তু এই গরিব মানুষটির উপকারে লাগল।

ওই পটোল বিক্রেতা ব্যাংকে গেলে কোনো দিন ২০০ টাকা ঋণ পাবেন না, কারণ ঋণ পাওয়ার জন্য নিজেকে ‘সাদা’ প্রমাণ করতে হবে। তার ব্যবসার ধরনই তাকে সেই সেই সুযোগ দেয় না। বলতেই পারেন, অসংগঠিত ক্ষেত্রের চড়া সুদের ঋণ তার ওপর প্রতি দিন আরও বেশি বোঝা চাপিয়ে চলেছে তিনি কোনো দিন সেই বোঝা ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াতে পারবেন না। কিন্তু, সরকার তো তার জন্য নেই।  সরকার তাকে পটোল বিক্রেতা ছাড়া আর কিছু হতে সাহায্য করেনি, ব্যবসায়ী হলেও কোনো ব্যাংক তাকে সাহায্য করে না। চড়া সুদ দিতে হলেও তিনি সংসার চালিয়ে নেন, না হলে মারা পড়তেন। ভেবে দেখুন, ব্যাংকে জমা রাখা আমার সাদা ৪০০ টাকা যা করতে পারেনি, কর ফাঁকি দেওয়া কালো ২০০ টাকা কিন্তু সেই কাজটাই করল।

এখন ভয় পেয়ে আমি ওই ২০০ টাকা নিয়ে ব্যাংকে দৌড়ালাম, জেলে যাওয়ার ভয়ে। আমার করভার বেড়ে গেল আমি সাদা হলাম। আমার ২০০ টাকা আবার কোনো বড়লোকের বিনিয়োগের নামে লোপাট হয়ে গেল। আমার চেয়েও যার বুকের পাটা বেশি, আমাদের পটোল বিক্রেতা হয় এমন কোনো মহাজনের কাছে আরও চড়া সুদে ধার নিতে শুরু করলেন, নয়তো মারা গেলেন। টাকা কালো থেকে সাদা হওয়া মানে আসলে পটোল বিক্রেতা থেকে ওই ধার শোধ না-করা বড়লোক ঋণগ্রহীতার হাতে টাকা হস্তান্তর।

বলতেই পারেন, সরকার ৪০০ টাকা থেকে প্রাপ্ত কর বিনিয়োগ করে, খরচা করে পটোল বিক্রেতার অশ্রুমোচন করতে পারে। কিন্তু, তিনি হয়তো তার ছেলেমেয়েকে পড়াতে চান, উচ্চ গুণমানের শিক্ষা দিতে চান, তাদের জন্য পুষ্টি চান, স্বাস্থ্য চান। দেশের প্রায় প্রতি পঞ্চাশটি শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, ক্লাস সেভেন-এইট নাগাদ অন্তত ৫০ ভাগের বেশি ছেলেমেয়ে স্কুল ছেড়ে দেয় উচ্চশিক্ষায় পৃথিবীর নিরিখে আমাদের স্থান লজ্জা পাওয়ার মতো। তাহলে করের টাকা কি ঠিকভাবে খরচা হয় আদৌ?

প্রশ্ন হলো এত সব ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ও ‘প্রশ্নের’ পরও আমরা কর দেব কেন? কেন?

যে টাকায় কর দেওয়া হয়নি, সেটাই কালো টাকা। এই কালো টাকা নিয়ে গত প্রায় দুই দশক ধরে কথা খরচা কিছু কম হয়নি। কালো টাকা নিয়ে, কর ফাঁকি দেওয়া নিয়ে যত কথা হয়েছে, সেই তুলনায় করের টাকা

কোথায় যায়, কীভাবে ব্যবহৃত হয় এবং হয় না, তাতে কার কতখানি উপকার, আমার সাদা টাকাই বা অর্থনীতিতে কার উপকারে লাগে, আর কালো টাকায় কারা কারা কতটা ফুলেফেঁপে উঠছে সেই প্রশ্নগুলো কার্যত ওঠেনি

লেখক

লেখক ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত