নতুন ধানের সঙ্গে কৃষিতে আসুক নতুন দিন

আপডেট : ২২ জুন ২০১৯, ১০:৪৫ পিএম

দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।  ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিপুল খাদ্য চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন খাদ্যশস্যের উচ্চ ফলনশীল নানা জাতের উদ্ভাবন কৃষিক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সাফল্যের নেপথ্যে কাজ করেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৯০টির বেশি উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে বিআরআরআই। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি আরও তিনটি ‘উফশী’ জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি আমন ও বোরো মৌসুমে চাষের উপযোগী রোপা আমনের জাত ‘ব্রি ধান-৯০’ ও বোনা আমনের জাত ‘ব্রি ধান-৯১’ এবং বোরো মৌসুমের পানি সাশ্রয়ী জাত ‘ব্রি ধান-৯২’ গত বুধবার চাষাবাদের অনুমোদন পায়। ধান উৎপাদনে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এই সংযোজন ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

নতুন জাত ‘ব্রি ধান-৯০’ এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ টন। এ ফলন আমন মৌসুমের জনপ্রিয় জাত ‘ব্রি ধান-৩৪’ এর চেয়ে হেক্টরপ্রতি প্রায় এক থেকে দেড়টন বেশি। নতুন জাত ‘ব্রি ধান-৯১’ এর হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ২ দশমিক ৩৭ টন, যা স্থানীয় জাত ‘ফুলকরি’র চেয়ে প্রায় দেড় টন বেশি। আর নতুন বোরো জাত ‘ব্রি ধান-৯২’ এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৮ দশমিক ৩ টন। ‘ব্রি ধান-৯০’ এর আধুনিক উচ্চ ফলনশীল ধানের সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান এবং উচ্চমাত্রার প্রোটিনসমৃদ্ধ এ জাত হালকা সুগন্ধযুক্ত। নতুন উদ্ভাবিত এই জাত স্থানীয় জাত চিনিগুঁড়া এবং চিনি আতপের বিকল্প হিসেবে ভোক্তাদের চাহিদা পূরণ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন আরেকটি জাত ‘ব্রি ধান-৯১’ এর গড় উচ্চতা ১৮০ সেন্টিমিটার এবং তা সহজে হেলে পড়ে না। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে এটি বাড়তে পারে এবং এটি জলমগ্নতা-সহিষ্ণু এবং এর গড় জীবনকাল ১৫৬ দিন। আর বোরো মৌসুমের পানি সাশ্রয়ী জাত ‘ব্রি ধান-৯২’ চাষে তুলনামূলক কম পানি ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়া যাবে বলে বরেন্দ্র অঞ্চলে এই জাত চাষে বেশি সুফল পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

বিগত দশকগুলোতে সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত, কৃষি-গবেষণা এবং শ্রমনিষ্ঠ কৃষকদের পরিশ্রমে বাংলাদেশ এখন খাদ্যশস্যে অনেকটাই স্বনির্ভর। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের পথে এটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।  কিন্তু ‘খাদ্য নিরাপত্তা’র পাশাপাশি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা ‘নিরাপদ খাদ্য’। অর্থাৎ যে খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে এবং জনসাধারণ যা ভোগ করছে সেই খাদ্য কতটা নিরাপদ। এই বিষয়টি কেবল মোড়কজাত ও বাজারজাত খাদ্যপণ্যের মান ও ভেজাল মেশানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সামগ্রিকভাবে দেশের পুরো কৃষি ও কৃষির উৎপাদন পদ্ধতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কেননা, এখন খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিবেশ, প্রতিবেশ, বৈচিত্র্য ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রশ্নটিও বিবেচিত হচ্ছে। কেবল নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তা নয়; মানুষের পাশাপাশি প্রকৃতির সব প্রাণসত্তার নিরাপদ খাদ্যের কথাও এখন বিশ্বজুড়ে নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। এজন্য নতুন ধরনের কৃষিনীতি এবং দেশের কৃষিব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। 

বাংলাদেশ এখন প্রতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’ পালন শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও জোগানের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দাবি করে। কেননা, আমাদের চারপাশের বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ আজ নানাভাবে দূষিত ও বিপর্যস্ত। দেশে প্রতিদিনই কমছে কৃষিজমি এবং প্রাকৃতিক পানির উৎসস্থলগুলো। এ অবস্থায় সবার জন্য নিরাপদ খাদ্যের জোগান দেওয়া সত্যিই এক দুরূহ কাজ। কিন্তু আমাদের সবার সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য এবং ভবিষ্যতের নিরাপদ বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই নিরাপদ খাদ্যের জোগান জরুরি। আর নিরাপদ খাদ্যের প্রাথমিক শর্ত হলো দূষণমুক্ত পরিবেশ। এ জন্য অধিক খাদ্য উৎপাদনে উচ্চ ফলনশীল জাতের প্রচলনের পাশাপাশি আমাদের অবশ্যই সংহারী বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে আরও সংবেদনশীল ও সচেতন হতে হবে। একইসঙ্গে উদ্যোগ নিতে হবে কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় নতুন ধারা প্রবর্তনের। যাতে কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যায় এবং কৃষকের জীবনমানের উন্নতি ঘটানো যায়। এভাবে কৃষি-গবেষণায় প্রকৃতিবান্ধব জাতের উদ্ভাবন, সুলভ কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ, কৃষিতে ক্রমান্বয়ে বিষাক্ত কীটনাশক ও সংহারী বীজমুক্ত করা এবং কৃষিবাজার ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানোর মধ্য দিয়েই দেশের কৃষিতে নতুন দিন আনা সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত