ভারতবর্ষ থেকে ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে ব্রিটেন

আপডেট : ২২ জুন ২০১৯, ১১:২২ পিএম

বণিক বেশে এসে ২০০ বছর ভারতবর্ষ শাসন করেছে ব্রিটিশরা। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ উৎস পাটনায়েকের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে অন্য কথা। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তিনি দাবি করেছেন, ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ মেয়াদের শাসনামলে ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটেন আত্মসাৎ করেছে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থের এ অঙ্ক বর্তমান যুগে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৭ গুণ বেশি। আর এ অর্থ পাচার হয়েছিল বাণিজ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।  

উপনিবেশের সময় ভারতীয় উৎপাদকদের কাছ থেকে নিজেদের প্রয়োজনে চাল ও বস্ত্র কিনত ব্রিটিশরা। অন্য দেশের বাণিজ্যিক লেনদেনের মতো এসব পণ্যের দাম তারা পরিশোধ করত রুপার মুদ্রা দিয়ে। কিন্তু ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই উপমহাদেশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ভারতীয় বাণিজ্যে একাধিপত্য বিস্তার করে ব্রিটিশরা।

একাধিপত্যের মূল ভিত্তি হিসেবে ভারতবর্ষ থেকে কর সংগ্রহ শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সংগৃহীত করের এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করতে থাকে নিজেদের প্রয়োজনীয় পণ্য ভারতবর্ষ থেকে কেনার কাজে। অর্থাৎ আপাত দৃষ্টিতে ভারতীয়দের কাছ থেকে মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য কিনছে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তারা কর থেকে সংগ্রহ করা অর্থই ব্যবহার করেছে এই কাজে। একে পুকুর চুরি বললেও ভুল হবে না। ইংরেজদের এই চাল ভারতীয়রা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। কারণ কর সংগ্রাহক ও নানা পণ্যের ক্রেতা ছিল ভিন্ন ব্যক্তি। ভারতীয়দের কাছ থেকে কেনা পণ্যের কিছু ব্যবহার করত ব্রিটিশরা। বাকিগুলো বিক্রি করে দিত অন্য কোথাও। আর পুনঃরপ্তানি ব্যবস্থা ব্রিটেনকে ইউরোপ থেকে আমদানি প্রবাহ অর্থায়নে অনুমোদন দেয়। ব্রিটেনে শিল্পায়নের প্রয়োজনে ভারত থেকে কেনা লোহা, টিম্বারের মতো পণ্য ব্যবহার করত ব্রিটিশরা। দেশটির শিল্প বিপ্লবের একটি অংশ নির্ভর হয়ে পড়ে এই চৌর্যবৃত্তির ওপর।

১৮৫৮ সালে ব্রিটিশরাজ সরাসরি ভারতবর্ষের ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিলে কর ও ক্রয় ব্যবস্থায় আসে নতুন মোড়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একাধিপত্যের ইতি ঘটে। ভারতীয়রা সরাসরি পণ্য রপ্তানির সুযোগ পান। তবে শর্ত ছিল, লেনদেনের অর্থ শেষ পর্যন্ত লন্ডনেই আসতে হবে। যারা ভারতবর্ষ থেকে পণ্য কিনতে চাইত তাদের ব্যবহার করতে হতো বিশেষ কাউন্সিল বিল। এটি এক ধরনের বিশেষ কাগজের মুদ্রা। ব্রিটিশরাজ ইস্যু করা এই কাউন্সিল বিল স্বর্ণ বা রুপার বিনিময়ে লন্ডন থেকেই সংগ্রহ করতে হতো। কাউন্সিল বিলের মাধ্যমেই ভারতীয় উৎপাদকদের দাম মেটাতেন ক্রেতারা। তারপর স্থানীয় ঔপনিবেশিক কার্যালয়ে ভারতীয়রা সেই বিল নগদ করলেই পেতেন রুপি। এই রুপি দেওয়া হতো ভারতীয়দের কাছ থেকে সংগৃহীত কর রাজস্ব থেকেই। এটাও এক ধরনের বড় জালিয়াতি। কারণ স্বর্ণ ও রুপা দিয়ে লেনদেন শেষ হওয়ায় লাভটা হয় ব্রিটিশদের। আর ভারতীয়দের মেলে কেবল কিছু কাগজ। এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাপনায় বিশে^র বাকি অংশের সঙ্গে বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্তের শিকার হয় ভারতবর্ষ। এই উদ্বৃত্তের বোঝা ভারতবর্ষকে বহন করতে হয়েছে বিশ শতকের প্রথম তিন দশক পর্যন্ত। ভারতের রপ্তানি থেকে প্রকৃত আয় সম্পূর্ণভাবে ব্রিটেনের বিবেচিত হওয়ায় এই উদ্বৃত্তকেই দেখানো হয় জাতীয় হিসাব ঘাটতি হিসেবে। এই কাল্পনিক ঘাটতি পর্যবেক্ষণ করে অনেকেরই মনে হতে পারে, সে সময় ব্রিটেনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভারতবর্ষ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভারতবর্ষ ছিল ব্রিটেনের স্বর্ণের ডিম পাড়া হাঁস। এক্ষেত্রে ভারতীয়দের কাছে অন্য কোনো উপায় ছিল না। আমদানির জন্য ব্রিটেনের কাছ থেকে ঋণ নিতেই হতো।

জালিয়াতি করে ভারতবর্ষ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ ব্রিটেন বিনিয়োগ করে নতুন উপনিবেশ সৃষ্টি ও পুরনো উপনিবেশ নিয়ন্ত্রণে যেমনÑ এই অর্থের সহায়তায় ১৮৪০ সালে চীন আক্রমণ করেছিল তারা। এছাড়া ১৮৫৭ সালে ভারতীয় বিদ্রোহ দমনও করা হয় এই অর্থ দিয়ে। পাটনায়েক বলেছেন, ভারতীয় সীমান্তের বাইরে ব্রিটেন যেসব নতুন যুদ্ধে জড়িয়েছে তার খরচ মিটেছে ভারতীয় রাজস্ব থেকে। শুধু তাই নয়, ভারতীয় অর্থনীতির সহায়তায় ব্রিটেন ইউরোপ ও ইউরোপীয় উপনিবেশ, যেমনÑ কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় পুঁজিবাদের বিস্তার করতে পেরেছিল। ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ভারতীয় ঔপনিবেশকালের অর্থনীতিকে চারটি সময়কালে ভাগ করেন পাটনায়েক। হিসাব-নিকাশ করে তিনি দেখান, ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটেনে পাচার হয়েছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এই হিসাবে ব্রিটিশরাজের শাসনামলের ভারতবর্ষের ওপর ব্রিটেনের চাপানো ঋণের বোঝা নেই। তাই এই চিত্রটি খুবই রক্ষণশীল। ৪৪ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের হিসাব মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। অর্থ পাচারে ভারতবর্ষের লোকসানের প্রকৃত হিসাব বের করা সম্ভব নয়। ভারতবর্ষ উন্নয়নে ভারতীয়দের অর্থ ব্যয় হলে ইতিহাসটাই পাল্টে যেত। সে-সময়ই বিশে^র অন্যতম অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউসে পরিণত হতো ভারতবর্ষ। ব্রিটিশ শাসনে ভারতবর্ষের উন্নয়নই হয়েছে বলে দাবি করেন রক্ষণশীল ইতিহাসবিদ নিয়েল ফার্গুসন। আবার দ্বিমত পোষণ করেন অনেকে। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন, ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষের উন্নতিতে ভূমিকা রেখেছে সামান্যই।

ব্রিটিশ শাসনের ২০০ বছরে ভারতীয়দের মাথাপিছু আয় বলতে গেলে বাড়েনি। বরঞ্চ উনিশ শতকের শেষভাগে ভারতীয়দের আয় কমে গিয়েছিল। ১৮৭০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে ভারতীয়দের গড় আয়ু কমেছিল এক-পঞ্চমাংশ। নীতি প্ররোচিত দুর্ভিক্ষে ১০ লাখে ১০ জন ভারতীয় অকালে প্রাণ হারিয়েছে। অতএব, ব্রিটেন ভারতকে উন্নত করেনি। ব্রিটেনের অর্থনীতি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ভারতবর্ষের, তা অর্থনীতিবিদ উৎস পাটনায়েকের গবেষণা থেকে স্পষ্ট।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত