২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসায়ীবান্ধব হলেও ব্যবসাবান্ধব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সংলাপে অংশ নেওয়া একাধিক বক্তা। তাদের মতে, বাজেটে ঘাটতি পূরণে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ কমবে। গতকাল রবিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত সংলাপে তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন।
সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় সংলাপে বক্তব্য দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, অর্থ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান কাজী নাবিল আহমেদ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপিদলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাসহ বিভিন্ন সংগঠন ও খাতের প্রতিনিধিরা।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘বাজেট নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। এর কারণ একেকজন একেক অ্যাঙ্গেল থেকে দেখছেন।’ তিনি বলেন, বাজেটে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এসেছে। কিন্তু ২০০৯ সালের সঙ্গে তুলনা করলে এই বাজেট অনেক স্বচ্ছ। তার মতে, সরকার সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে দারিদ্র্য বিমোচনে। এ কারণে বর্তমানে মোট দরিদ্রের সংখ্যা তিন কোটির নিচে। এর মধ্যে হতদরিদ্র ৫০ থেকে ৬০ লাখ, যা মোট জনগণের মাত্র ৫ শতাংশ।
বিএনপির সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিএনপি জনগণ বলতে যাদের বোঝায়, তারা পাঁচ তারকা হোটেল, প্রেস ক্লাবসহ বড় জায়গায় বসে থাকে। কিন্তু চরাঞ্চলসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, অর্থনীতি নৈতিক বিজ্ঞান নয়। এটি নিষ্ঠুর বিজ্ঞান। বাজার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ পুরো অর্থনীতিতে বাজারই হলো প্রভু। এ প্রভুই ঠিক করে দেবে, কার ভাগ্যে কত বণ্টন হবে। ব্যাংকিং খাতের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন মহল থেকে কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। সরকারও বিষয়টি চিন্তা করছে।
বিএনপি নেতা আমীর খসরু বলেন, ‘সরকার দাবি করছে, জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এটি সঠিক হলে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে হবে কেন?’ তিনি বলেন, ‘ভোট নিয়ে তিনবার চুরি হয়েছে। ভোটের আগের রাতে, ভোটের দিন এবং ফলাফল ঘোষণার সময়।’ খসরু বলেন, ‘কাদের কল্যাণে ও সিদ্ধান্তে বাজেট হয়, কারা দেশে প্রভু, এটি বড় প্রশ্ন। তবে এই প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি। ব্যবসা-বাণিজ্য, সংসদসহ সবকিছু তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে।’
সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রবৃদ্ধির সঙ্গে অন্য সূচকগুলোর মিল নেই। কারণ ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ হলো প্রবৃদ্ধির চালক। কিন্তু দেশে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে।’ তিনি বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পাঁচ বছরে সরকার ২০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের কথা বলেছে। এ সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। ওই পাঁচ বছর শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিনিয়োগ এসেছে সাত বিলিয়ন ডলার। এরপর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জনের কথা বলছে সরকার। এখানে কোন ম্যাজিক কাজ করেছে, তা আমাদের বুঝে আসে না।’
সিপিডির চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহান বলেন, ‘বাজেটে বরাদ্দ, টাকা ব্যয় ও আয়ের মধ্যে আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এখান থেকে কী অর্জন হবে, সে আলোচনা ওইভাবে আসে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনীতিতে বড় সমস্যা বৈষম্য। বর্তমানে এটি জটিল আকার ধারণ করেছে।’
নামী এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে ভর্তুকির জন্য জনগণের টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর মানে হচ্ছে, সরকারি নীতি অল্প মানুষের সহায়তার জন্য। সামগ্রিকভাবে সমাজে বৈষম্য কমাতে ওইভাবে অবদান রাখছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার সংসদে ঋণের তথ্য দিয়েছে। সেখানে দেখা গেল একটি গ্রুপের ঋণ ১৫ হাজার কোটি টাকা, শতকরা হিসাবে যা সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দের বড় একটি অংশের সমান। এটি ন্যায়বিচার নয়।’
সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান বলেন, নতুন বাজেট ব্যবসায়ীবান্ধব হলেও ব্যবসাবান্ধব নয়। কারণ ব্যবসার ব্যয় কীভাবে কমানো হবে, তা বলা হয়নি।
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সাংসদ ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বাজেটের মাধ্যমে একটি সরকারের চরিত্র বোঝা যায়। কারণ কোন খাতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেটি বাজেটে উল্লেখ থাকে। ধনী বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়। কিন্তু হতদরিদ্রের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চতুর্থ।’
অর্থনীতিতে বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২০১০ সালে দেশের মোট আয়ের দশমিক ৭৮ শতাংশ ছিল নিম্নবিত্ত ৫ শতাংশের হাতে। ২০১৬ সালে তা কমে দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এর মানে হলো দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে অন্যতম সমস্যা খেলাপি ঋণ। বর্তমানে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু অবলোপন ধরলে এটি ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি। এ ছাড়া পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন বিবেচনায় নিলে খেলাপি ঋণ ৩ লাখ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।’
