২০১৪ সাল। মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে যৌথ প্রযোজনার ছবির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে এফডিসি কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীরা। সেই আন্দোলনে মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে হাজির হয়েছিলেন ঢাকাই ছবির শীর্ষ নায়ক শাকিব খানও। মাত্র ২ বছর না পেরোতেই ২০১৬ সালে ভুল পাল্টে শাকিব খান নিজেই যুক্ত হলেন যৌথ প্রযোজনার ছবিতে। সে বছর ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় শাকিব অভিনীত যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘শিকারি’। জয়দেব মুখার্জি পরিচালিত এ ছবিতে শাকিবের নায়িকা ছিলেন শ্রাবন্তী। ঈদুল আজহায় মুক্তি পায় ‘নবাব’। এতে শাকিবের নায়িকা ছিলেন শুভশ্রী। শ্রাবন্তী, শুভশ্রীদের টানে শাকিব খান পাড়ি জমান কলকাতায়। কলকাতায় গিয়ে বাংলাদেশি পরিচালকদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন। যাদের হাত দিয়ে শাকিব খানের জন্ম সেই পরিচালকদেরকেই শাকিব বেকার ও অযোগ্য বলে দাবি করেন। শাকিব খানের এমন মন্তব্যে সেসময় উত্তাল হয়ে পড়ে চলচ্চিত্রাঙ্গণ। চলচ্চিত্র পরিবার এ কারণে শাকিব খানকে নিষিদ্ধও করে।
শাকিব খানের একাধিক ছবির পরিচালক বদিউল আলম খোকন নিজেই একসময় শাকিব খানকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছিলেন। শাকিবের বিরুদ্ধে মিছিল করেছেন মিশা সওদাগরও। সেই সব দ্বন্দ্ব ভুলে এবার শাকিব খানের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন মিশা সওদাগর। কাজ করছেন একসঙ্গে। শুধু তাই নয়, শাকিব খান নিজের প্রযোজিত ছবির পরিচালক হিসেবে বদিউল আলম খোকনকেও নিয়েছেন। গত ঈদে শাকিবের প্রযোজনায় মুক্তি পায় ‘পাসওয়ার্ড’। এ ছবির পরিচালক মালেক আফসারী। যদিও একসময় মালেক আফসারীও শাকিব খানের বিরুদ্ধে ফেসবুকে নানা মন্তব্য করেছিলেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, যে পরিচালকরা একসময় শাকিবের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তাদের সঙ্গেই কেন আবার কাজ করছেন তিনি? উল্টো সেই সব পরিচালকদের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে কলকাতায় পাড়ি জমানো শাকিব খান কেন আবার নিজের দেশের পরিচালকদের কাছেই ফিরলেন?
এর জবাব নিয়ে বেশি কিছু ভাবার নেই। কারণ কলকাতার প্রযোজকেরা শাকিব খানকে টুপ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শাকিব খানের ওপর ভর করে বাংলাদেশের সিনেমা বাণিজ্যে প্রভাব বিস্তার করা। কিন্তু যৌথ প্রযোজনার নীতিমালা কঠিন হওয়া ও সাফটা চুক্তির নানা জটিলতার কারণে কলকাতার প্রযোজকেরা বাংলাদেশে ভালো মতো ব্যবসা করতে পারছেন না। অপরদিকে শাকিব খানকে নিয়ে কলকাতার প্রযোজকেরা ছবি নির্মাণে আগ্রহী নয়, কারণ তারা কখনোই চান না বাইরের কোনো নায়ক এসে তাদের ওখানে ব্যবসা করুক।
ফলে বাধ্য হয়েই শাকিব খানকে ফিরে আসতে হয় নিজের দেশে। ফিরতে হয় অবহেলা করা পরিচালকদের কাছেই। কয়েক মাস আগেও যে পরিচালকদের অযোগ্য বলে দাবি করেছেন শাকিব খান সেই সব পরিচালকদের কাছেই তাকে ফিরতে হলো।
‘পাসওয়ার্ডে’র সফলতার পর শাকিব খান নিজের প্রযোজনা সংস্থা থেকে আরও চারটি ছবি নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। ২৩ জুন, রোববার বিএফডিসির জহির রায়হান কালার ল্যাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চারটি সিনেমার নাম ঘোষণা করেন তিনি। এসকে ফিল্মসের ব্যানারে ‘পাসওয়ার্ড-২’ সিনেমা নির্মাণ করবেন মালেক আফসারী, ‘বীর’ সিনেমাটি নির্মাণ করবেন কাজী হায়াৎ, ‘ফাইটার’ সিনেমাটি নির্মাণ করবেন বদিউল আলম খোকন এবং ‘প্রিয়তমা’ সিনেমাটি নির্মাণ করবেন হিমেল আশরাফ।
শাকিব খান বলেন, ‘চলচ্চিত্র আমাকে নাম, যশ, খ্যাতি ও অর্থ সবই দিয়েছে। সুসময়ে যখন আমি সব পেয়েছি চলচ্চিত্রের এই দুঃসময়ে আমি তাকে ছেড়ে যেতে পারি না। আজকে আমি চারটি সিনেমা প্রযোজনার ঘোষণা করছি। আমাকে দেখে আরও পাঁচজন হয়তো দশটা সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা করবেন। আমি চাই, বাংলা চলচ্চিত্র আবারও ঘুরে দাঁড়াক।’
আপাত দৃষ্টিতে শাকিব খানের মতো নায়কের ছবি নির্মাণের ব্যাপারটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা। তার উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও একটা কিন্তু থেকে যায়। চলচ্চিত্র বোদ্ধারা মনে করছেন অবহেলিত পরিচালকদের কাছে শাকিবের ফিরে আসার বিষয়টি ইতিবাচক। কিন্তু শাকিব খান ফিরে আসলেন পুরোনো নৌকায় চড়ে। ভক্তরা ভেবেছিলেন শাকিব খান হয়তো তার নতুন ছবিগুলোতে দেশের তরুণ ও বুদ্ধিদীপ্ত পরিচালকদের নেবেন। কিন্তু শাকিব তা না করে পুরোনো পরিচালকদের ওপরই ভর করলেন। যেসব পরিচালকদের বেশিরভাগই নকল সিনেমা ছাড়া মৌলিক সিনেমা বানাতে পারেন না। এমনকি গত ঈদে মুক্তি পাওয়া মালেক আফসারীর পাসওয়ার্ড ছবিও নকলের অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণ পরিচালক বলেন, ‘কলকাতার ছবিতে অভিনয় করে শাকিব খান নিজের যে ইমেজ তৈরি করছেন। সেই ইমেজ ধরে রাখতে হলে তাকে সৃষ্টিশীল পরিচালক যেমন, দীপঙ্কর দীপন, অমিতাভ রেজা, রায়হান রাফি’র মতো পরিচালকদের দ্বারস্থ হওয়া উচিত ছিল। এই পরিচালকদের দিয়ে ছবি বানালে শুধু তার ভালো ইমেজই তৈরি হবে না, ইন্ডাস্ট্রিও উপকৃত হবে।’
শাকিব খানের নতুন প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলবেই। শেষ পর্যন্ত পুরোনো পরিচালকদের ওপর শাকিবের নির্ভর করা সঠিক না বেঠিক ছিল তা জানা যাবে-এই চারটি ছবি মুক্তির পর। ততদিন তার ভক্তদের ধৈর্য ধরতেই হবে।
