রেলপথ নিরাপদ করা জরুরি

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৯, ১০:১৮ পিএম

নিরাপত্তাহীন সড়কে মৃত্যুর মিছিলে পর্যুদস্ত সাধারণ মানুষের কাছে রেলওয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য। কিন্তু এবার হয়তো সে ধারণা বদলে যাবে। এখন নিয়মিতই ছোট-বড় রেল দুর্ঘটনার খবর আসে। এবার যাত্রীদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিল কুলাউড়া দুর্ঘটনা। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। গত রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিলেট থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল রেলক্রসিং এলাকার কাছে সেতু ভেঙে আন্তঃনগর ‘উপবন এক্সপ্রেস’ ট্রেনের কয়েকটি বগি খালে পড়ে যায়। আরও তিনটি বগি স্থলভাগের সীমানায় লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। মোট পাঁচটি বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।

সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, ট্রেনটি সেতু অতিক্রম করার সময় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সহ্য করতে না পারায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেলওয়ের ৯০ শতাংশ সেতু মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ২৮ হাজার ৭৮ কিলোমিটার রেলপথ ৩ হাজার ৬২৯টি ছোট-বড় সেতুর ওপর দিয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্তত ৩ হাজার ২৪০টি ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। কাদের ভুলে নাজুক সেতুটি সংস্কার করা হয়নি সেটি নিশ্চয় তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখবে।  অতিরিক্ত যাত্রী ছিল কি না বা ট্রেনের গতিতে কোনো সমস্যা ছিল কি না তাও তদন্তের মাধ্যমে বের করা দরকার।

বাংলাদেশ রেলওয়ের কিছু সেতু পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে তৈরি হলেও অধিকাংশই ব্রিটিশ আমলে তৈরি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেতুগুলোর বয়স ৮০ থেকে ১০০ বছর পার হয়ে গেছে। এসব সেতুর অবকাঠামো একেবারেই নড়বড়ে হওয়ায় সারা বছর ধরেই মেরামতের কাজকর্ম চালিয়ে যেতে হয়।  জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে ট্রেন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলেও সেতুগুলোর অধিকাংশই ঝুঁকিমুক্ত নয়। রেলওয়ের মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত কিংবা পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। রেলওয়েতে নতুন নতুন উন্নয়ন বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো নতুন করে নির্মাণ বা সংস্কারের উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে নাÑ তা বোধগম্য নয়। অতীতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে চালক, গার্ড, স্টেশন মাস্টারসহ সংশ্লিষ্টদের ভুলের কারণে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালানো, লাইনের সংস্কার সময়মতো না করা, লাইনে পাথর না থাকা, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটি, লাইন ক্ষয়, সিøপার নষ্ট, লাইন ও সিøপারের সংযোগস্থলে লোহার হুক না থাকা ইত্যাদি কারণে দুর্ঘটনা বেড়েছে। কাজেই এসব দিকে গুরুত্ব সহকারে নজর দেওয়া দরকার। রেলওয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে, ট্রেন পরিচালনায় চালক ও গার্ডের স্বল্পতা রয়েছে। তবে আগামী দেড় বছরের মধ্যে এ খাতে প্রশিক্ষিত চালকরা ট্রেন চালাবেন এমন প্রতিশ্রুতি মিলছে। প্রশ্ন হলো, ততদিন কি ট্রেন চলবে ঝুঁকিপূর্ণভাবে?

দক্ষ জনবলের সংকট, প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে নানারকম প্রতিবন্ধকতা, অনেক ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যাওয়া, অদূরদর্শী পরিকল্পনা ইত্যাদি বহুবিধ কারণে রেলওয়ের দুরবস্থার কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে রেলকে এখনো মানুষ পছন্দের শীর্ষেই রাখতে চায়; কিন্তু রেলওয়ের অব্যবস্থাপনার কারণেই অনেকে সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।  সড়কপথে ক্রমাগত চাপ বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনাও।

বিশ্বের সর্বত্র যেখানে রেল ব্যবস্থা সম্প্রসারিত ও আধুনিক হচ্ছে, সেখানে অজ্ঞাত কারণে দেশে এ গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থাটি অবহেলার শিকার। বর্তমান সরকারের আমলে রেলওয়ের ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি রেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৪৪টি জেলার রেল যোগাযোগের সঙ্গে আরও নতুন ১৫টি জেলা সম্পৃক্ত হচ্ছে। রেল গণমানুষের পরিবহন। একে ঝুঁকিতে রেখে দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে রেললাইনগুলো ঝুঁকি ও ত্রুটিমুক্ত করতে হবে। এ লক্ষ্যে যন্ত্রাংশ চোরদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। রেলওয়েতে লোকবল বাড়িয়ে লাইনগুলোয় নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। রেলে বিদ্যমান দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে জোরদার পদক্ষেপ নিতে হবে।  রেলের দখল হওয়া জায়গা ও সম্পদ উদ্ধার করতে হবে। দেশের সবচেয়ে বড় যোগাযোগ অবকাঠামো রেলওয়ের উন্নয়ন এবং রেল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। 

কুলাউড়ার ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ ক্ষেত্রে আশু দৃষ্টি দিয়ে প্রতিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তদন্তক্রমে কারণ চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীলদের সমন্বয়হীনতা দূরীকরণে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আমলে নিয়ে রেলের সব সমস্যা দূর করে রেলকে নিরাপদ বাহনরূপে গড়ে তোলা হবে, এটিই প্রত্যাশা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত