ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৯, ০৩:০১ এএম

পুলিশের বিতর্কিত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের (৫৪) বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সোমবার দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ মামলাটি করেন পরিচালক মো. মঞ্জুর মোর্শেদ। দুদকের সংশোধিত বিধিতে নিজস্ব দপ্তরে করা এটাই প্রথম মামলা। এর আগে সব মামলা থানায় করত দুদক। মামলায় ডিআইজি মিজানের স্ত্রী সোহেলিয়া আনা রত্না (৫০), ছোট ভাই মাহবুবুর রহমান (৫০) ও ভাগ্নে রাজধানীর কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাহমুদুল হাসানকেও (২৯) আসামি করা হয়েছে। ৩ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার ৪২১ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও ওই সম্পদ জ্ঞাতসারে হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তরের অভিযোগে দুদক আইন, ২০০৪ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় মামলাটি রেকর্ড করেছে দুদক।

এদিকে ডিআইজি মিজান ও দুদক পরিচালক (সাময়িক বরখাস্ত) খন্দকার এনামুল বাছিরের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তে দুজনকেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে। আগামী ১ জুলাই তাদের কমিশনে হাজির হতে বলেছে দুদক।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, মিজানের স্বনামে ও বেনামে ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৭৪ হাজার ৪৪৩ টাকার সম্পদ রয়েছে। তিনি ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। এর মধ্যে ৩ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার ৪২১ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন তিনি।

এতে আরও বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ১০ জুলাই মিজানুর রহমানকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিস দেওয়া হয়। একই বছরের ১ আগস্ট কমিশন সচিব বরাবর নির্ধারিত ছকে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন তিনি। এতে তিনি ১ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ২৬০ টাকার স্থাবর ও ৪৬ লাখ ২৬ হাজার ৭৫২ টাকার অস্থাবর সম্পদ প্রদর্শন করেন। গত ১৩ জুন তার সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে দুদক। অনুসন্ধান ও যাচাইকালে প্রাপ্ত তথ্য ও রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি তার অপরাধলব্ধ অর্থ দিয়ে বিভিন্ন সময়ে নিকট আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পদ ক্রয় বা অর্জন করে নিজেই ভোগ দখল করে আসছেন।

এজাহারে বলা হয়েছে, ডিআইজি মিজান তার ভাগ্নে মাহমুদুল হাসানের নামে ২০১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ২৪ লাখ ২১ হাজার ২২৫ টাকা দিয়ে গুলশানের পুলিশ প্লাজা কনকর্ডে ২২১ বর্গফুট আয়তনের দোকান বরাদ্দ নেন। ওই দোকান তার স্ত্রীর নামে ভাড়া দেখিয়ে নিজের দখলে রাখেন। এ ক্ষেত্রে তিনি নিজ অর্থ দ্বারা ওই সম্পদ অর্জন করলেও অসৎ উদ্দেশ্যে সম্পদ বিবরণীতে তার তথ্য গোপন করেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মিজান নমিনি হয়ে তার ভাগ্নে মাহমুদুলের নামে ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর ওয়ান ব্যাংকের কারওয়ানবাজার শাখায় ৩০ লাখ টাকা এফডিআর করেন। দুদকে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর পর পর সুদে-আসলে এফডিআরটির ৩৮ লাখ ৮৮ হাজার ৫৭ টাকা তুলে নেন; যা তিনি আয়কর বিবরণীতে গোপন করেন। মিজান তার ভাই মাহবুবুরের নামে রাজধানীর বেইলি রোডে ৬৫ লাখ ৯৯ হাজার ৭৮৯ টাকায় ২৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট কেনেন এবং ওই ফ্ল্যাটে তিনি নিজেই থাকতেন। অনুসন্ধানে তার ভাইয়ের এই পরিমাণ অর্থ থাকার কোনো উৎস পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, আসামি মিজান নিজ অর্থ দ্বারা ফ্ল্যাটটি ক্রয় করে ভোগদখলে রাখলেও অসৎ উদ্দেশ্যে তা সম্পদ বিবরণীতে প্রদর্শন করেননি।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ডিআইজি মিজান তার স্ত্রী রতœার নামে কাকরাইলের ৬৩/১, পাওনিয়ার রোডে ‘নির্মাণ সামাদ ট্রেড সেন্টারে’ ১৭৭৬ বর্গফুটের বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট কেনেন এবং নগদে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫০ টাকা নির্মাণ কোম্পানিকে পরিশোধ করেন। ২০১৬ সালের ১৬ জুন ফ্ল্যাটটি তার ভাগ্নে মাহমুদুলের নামে দলিল রেজিস্ট্রি করেন। রেকর্ডপত্রে আসামি মিজান অর্থের জোগানদাতা হলেও সম্পদ বিবরণীতে ওই টাকার হিসাব গোপন করছেন। মহানগর দায়রা জজ ও সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত আসামিদের এসব স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছে। মামলার তদন্তকালে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সেটাও এজাহারে সন্নিবেশিত করা হবে বলেও এতে বলা হয়েছে।

২০১৭ সালের শেষদিকে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে এক নারীকে তুলে নিয়ে বিয়ে করার অভিযোগ ওঠে। এরপর ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) পদে কর্মরত মিজানকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত (ওএসডি) করা হয়। এর আগে তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ছিলেন। ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দপ্তরও আলাদা তদন্ত করছে।

এনামুল ও মিজানকে তলব : ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ডিআইজি মিজান ও সাময়িক বরখাস্ত হওয়া পরিচালক এনামুল বাছিরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুদক। গতকাল দুদক প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো তলবি নোটিসে তাদের আগামী ১ জুলাই হাজির হতে বলা হয়েছে। দুদকের পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্লার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম অনুসন্ধানের দায়িত্ব পালন করছে। টিমের অন্য সদস্য হলেন দুদকের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ও সালাহউদ্দিন আহমেদ।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের মুখে থাকা ডিআইজি মিজান সম্প্রতি দুদকের তৎকালীন অনুসন্ধান কর্মকর্তা পরিচালক এনামুল বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন বলে দাবি করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত