ছাত্রদলের বিবদমান দুই পক্ষকে ঘিরে বিএনপির রাজনীতিতে সৃষ্টি হওয়া অচলাবস্থা কাটেনি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিষয়টির নিষ্পত্তি করে স্থায়ী কমিটিকে নির্দেশনা দিলেও কার্যত তার কোনো প্রতিফলন মাঠে নেই।
বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনাতেই বিষয়টি থমকে আছে। এর মধ্যে সিনিয়র নেতারা বিবদমান উভয়পক্ষকে ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছেন।
বয়সসীমা মেনে নেওয়ার পক্ষে অবস্থানকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একাধিক নেতা অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন ছাত্রদলের কমিটি গঠনের কোনো প্রক্রিয়া ছিল না। এরপর ঈদের আগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভেঙে দেওয়া ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে একটা বয়সসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তখন তারা সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার কথা বললেও এখন মানছেন না। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতারা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। কারণ পেছনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ কয়েক নেতার ইন্ধন রয়েছে। এই তালিকায় আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য আমানউল্লাহ আমান। তাদের সমর্থন পেয়ে বিক্ষুব্ধরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
বয়সসীমা মেনে নেওয়া নেতাদের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল মঙ্গলবার মির্জা আব্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি ঠিক নয়। কারও সঙ্গেই আমার কোনো যোগাযোগ নেই। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারে।’ একই বিষয়ে জানতে আমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদলের নেতাদের সমর্থনের বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটি গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তাতে ভেঙে দেওয়া ছাত্রদল নেতাদের পাশাপাশি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদেরও সম্মতি আছে। এখন বাইরে অনানুষ্ঠানিকভাবে কে কী করছে সে বিষয়ে আমার জানা নেই। এখানে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের কিছু নেই। এরপরও কেউ করলে দলের হাইকমান্ড খোঁজখবর নিয়ে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।’
গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে
যারা আগ্রহী তাদের পূরণের জন্য ফরম তৈরির কাজ করছেন তারা। এ সময় কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দলের চেইন অব কমান্ড ভেঙে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের কাউন্সিল পরিচালনা কমিটির প্রধান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন পর ছাত্রদলের কমিটি গঠনে একটি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। কমিটি গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। এখানে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে বলা যাবে না। বরং দলের সবাই একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এখন থেকে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রতিটি কমিটি হবে কাউন্সিলের মাধ্যমে।
বিক্ষুব্ধ ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার জন্য তাদের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কোনো ধরনের যোগাযোগ করছে কি না জানতে চাইলে খোকন বলেন, বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা যোগাযোগ করেছেন কি না জানতে চাইলে ভেঙে দেওয়া ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি এজমল হোসেন পাইলট গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত ১৫ দিন ধরে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কোনো যোগাযোগ করছেন না। আমরা ভেসে আসিনি। আমাদের সঙ্গে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা আছেন। এভাবে চলতে থাকলে নির্ধারিত ১৫ জুলাই কাউন্সিল তো করতেই পারবেন না। বরং লাঞ্ছিত হবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। কারণ আমাদের জীবন ধ্বংস করে তারা ভালো থাকতে পারবেন না।’
বয়সসীমা মেনে নিয়েছেন ভেঙে দেওয়া ছাত্রদলের এমন কেন্দ্রীয় সংসদের নেতারা বলেছেন, ১৯৯২ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি হয়েছিল। এরপর বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য আমানউল্লাহ আমান সেই কমিটি ভেঙে দিয়েছেন। এরপর থেকে ছাত্রদলের যত কমিটি হয়েছে তাতে আমান ভাইয়ের কর্তৃত্ব ছিল। কিন্তু ২৭ বছর পর তার ক্ষমতা খর্ব হয়েছে। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। তার এ উদ্যোগে সাড়া দিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। বিষয়টি দলের বেশিরভাগ নেতা মেনে নিয়েছেন। তবে মেনে নেননি আমান। তাই তিনি বিক্ষুব্ধদের সমর্থন দিচ্ছেন।
চেয়ার-টেবিল, সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর বিক্ষব্ধ ছাত্রদল নেতাদের : গতকাল দুপুর ১২টার দিকে কাকরাইলের স্কাউট ভবনের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতারা বিএনপি কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় কার্যালয়ের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বয়সসীমা মেনে নেওয়া ছাত্রদলের বেশকিছু নেতাকর্মীকে ধাওয়া দেন বিক্ষুব্ধরা। এতে মাহবুবুর রহমান নামে এক বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। বিক্ষুব্ধরা কার্যালয়ের নিচের শাটার ও প্রবেশপথে লাথি মারেন।
ভেঙে দেওয়া ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি (বর্তমানে বহিষ্কৃত) ইখতিয়ার কবির অভিযোগ করে বলেন, ‘ভেতরে যারা আছেন, তারা চেয়ার-টেবিল, সিসি ক্যামেরা ভেঙেছেন। আমরা যখন কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে চেয়েছিলাম, তখন ভেতরে থাকা নেতাকর্মীরা আমাদের দিকে কাপ ছুড়ে মারেন। এতে আমাদের একজন আহত হয়েছেন।’
কার্যালয়ে ভাঙচুরের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভাঙচুরের বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য নেই। তবে তফসিল অনুযায়ী আগামী ১৫ জুলাই ছাত্রদলের কাউন্সিল হবে। সেভাবে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
পরে দুপুর ১২টার দিকে বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘যারা আন্দোলন করছে, তারা আমাদেরই ছোট ভাই। আমরা আশা করব, জ্যেষ্ঠ নেতারা যে তফসিল ঘোষণা করেছেন, তা মেনে নিয়ে তারা আমাদের সহযোগিতা করবে।’
