আফগানিস্তানের বিপক্ষে ক্রিকেট খেলতে নামা মানে দুটো প্রতিপক্ষকে সামলানো। এক আফগান ক্রিকেট দল, দুই এভারেস্টসম মানসিক চাপ। যে চাপটা ক্রিকেটাররাই নিয়ে নেন। সোমবার সাউদাম্পটনের রোজ বোলে টাইগার দল সেই চাপ মাটিচাপা দিয়ে এসেছে। ৬২ রানের জয়ে সেমিফাইনালের দিগন্তরেখা দেখা দিয়েছে। সহজ সমীকরণ, ভারত আর পাকিস্তানকে পরের দুই ম্যাচে হারিয়ে নিজেদের কাজটা করে রাখতে হবে। সঙ্গে তাকিয়ে থাকতে হবে ইংল্যান্ডের দিকে। শুধু যে নিজেদের দুই ম্যাচ জিতলে হবে, তা না। স্বাগতিকদের হার-জিতে নির্ভর করছে অনেক কিছুই। আফগান বাধা পার হওয়ার পর একজন ছাড়া দলের সব সদস্যই ফুরফুরে মেজাজে আছেন। সেই একজন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। নটিংহ্যামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সময় কাফ মাসলে টান পড়েছিল। পুরো ফিট না হয়েই সাউদাম্পটনে খেলেছেন। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ব্যাট করেই ২৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছেন। পরে ফিল্ডিং করেননি। নিবেদিতপ্রাণ এই ক্রিকেটার মঙ্গলবার বার্মিংহাম গেছেন ক্র্যাচে ভর দিয়ে। সাউদাম্পটনের দ্য গ্র্যান্ড হারবার হোটেল থেকে বেরিয়েছেন মাথা নিচু করে, চোখেমুখে রাজ্যের হতাশা নিয়ে। দুই হাত ক্র্যাচে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে বাসে উঠেছেন। ম্যাচের পর চোটের জায়গায় স্ক্যান করা হয়েছে। বার্মিংহামের উদ্দেশে বাস ছাড়ার আগে টাইগার দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে শঙ্কার খবর দিয়ে গেছেন, ‘হ্যাঁ, শঙ্কা তো আছেই। গ্রেড ওয়ান ইনজুরি। কিন্তু ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না, আপনারা নিজেরাই দেখেছেন। ভারতের সঙ্গে খেলার আগে সাত-আট দিন সময় আছে। এই সময়টায় আমরা ওকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখব। খেলার সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি।’
রিয়াদকে নিয়ে দুশ্চিন্তাটুকু ছাড়া বাকি দল ফুরফুরে মেজাজেই আছে। ২৫ থেকে ২৯ জুন, পাঁচ দিন ছুটি মিলেছে। সাকিব আল হাসান স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে সোমবার রাতেই লন্ডন চলে গেছেন। সেখান থেকে সুইজারল্যান্ড আর প্যারিস ঘুরে বার্মিংহামে আসবেন। গতকাল সাউদাম্পটনেই তামিম ইকবাল ও মোস্তাফিজুর রহমান বাকি দল থেকে আলাদা হয়ে গেছেন। অন্যরাও বার্মিংহাম পৌঁছে যে যার মতো করে ছুটি কাটাতে চলে যাবেন। এই ছুটিটা দেওয়া হয়েছে মূলত টানা খেলা আর ভ্রমণক্লান্তি ঝেরে ফেলার জন্য। ব্যক্তিগত জীবনে দারুণ কিছু সময় কাটিয়ে পুরো সতেজ হয়ে যেন ক্রিকেটাররা মাঠে ফিরতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই ছুটিটা দেওয়া। কারণ এখন বাংলাদেশের পয়েন্ট ৭, পরের দুটি ম্যাচ কঠিন, একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। ক্লান্তি ঝেরে ফেলে এজবাস্টনে ভারতকে মোকাবিলা করতে আবারও ব্যাটে-বলের প্রস্তুতি শুরু হবে ৩০ জুন। ওপেনার সৌম্য সরকারও মনে করেন, বিশ্রামটুকু দরকার ছিল। তিনি বলেন, ‘আফগানিস্তানকে হারানোটা জরুরি ছিল। এখন আমাদের সামনে সেমিতে খেলার সুযোগটা ভালোভাবেই আছে। যেহেতু বড় একটা ছুটি পাওয়া গেছে, আমরা নিজেদের নিয়ে আরও কাজ করে ভারতের ম্যাচে খেলতে যেতে পারব। আমরা যেভাবে খেলছি, অবশ্যই ভারতকে হারানো সম্ভব।’
তামিমের সঙ্গে সৌম্যর জুটিটা যথেষ্ট জমাট। তারপরও আফগানিস্তান ম্যাচে তাকে পাঁচ নম্বরে ব্যাট করতে হয়েছে। তামিমের সঙ্গে এদিন ইনিংস শুরু করতে নামেন লিটন দাস। এটি ছিল দলীয় পরিকল্পনারই অংশ, ‘দলের প্রয়োজনেই ব্যাটিং অর্ডারে নিচে নেমেছি। টিম ম্যানেজমেন্ট মনে করেছে এই ম্যাচে লিটনকে ওপেন করানো দরকার, করিয়েছে।’
বোলিংয়ে সব নজর নিজের দিকে নিয়ে গেছেন সাকিব। মোস্তাফিজ, সাইফউদ্দিন, মোসাদ্দেকরা ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু সাকিবের পারফরম্যান্সের কাছে অন্যরা বড্ড মøান। আফগান ব্যাটসম্যানরা সাকিব-ধাঁধার কোনো কূল-কিনারাই করতে পারেননি। এই ম্যাচে তিনি অন্তত অর্ধডজন বিশ্বকাপ রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সুপারম্যান সাকিব আল হাসান পুরো ক্রিকেট দুনিয়াকেই মুগ্ধতায় অবশ করে রেখেছেন। আর সতীর্থদের করছেন গর্বিত। সৌম্য বার্মিংহামের বাসে ওঠার আগে বলে গেলেন, ‘আমরা সাকিব ভাইকে রেকর্ডগুলোর জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছি। ওনার সঙ্গে খেলি, ড্রেসিংরুম শেয়ার করি, এটা অনেক গৌরবের। আমরা সবাই ওনার কাছ থেকেই অনেক কিছু শিখি। আমি তো শিখিই।’
সত্যিই, বাংলাদেশের ভাগ্য, দলে সাকিব আল হাসান নামে একজন মুকুটহীন সম্রাট আছেন!
