দুধভাতে উৎপাত : কাকে বিশ্বাস করবে মানুষ

আপডেট : ২৬ জুন ২০১৯, ১০:১২ পিএম

প্রতিদিনের খাবারে ভেজাল-দূষণে মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। মাছ-মাংস, ফলমূল, শাক-সবজি থেকে শুরু করে চাল-ডাল, তেল-নুন, হলুদ-মরিচ, দুধ-দই-ঘি কীসে ভেজাল নেই? কীসে মেশানো হচ্ছে না মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নানা রাসায়নিক? কীসে নেই ভয়ংকর ফরমালিন, অ্যান্টিবায়োটিক, সিসার মতো প্রাণঘাতী নানা উপাদান? সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে বিস্তর প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে আর ভেজাল ও দূষিত খাদ্যের ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষও দীর্ঘদিন ধরে এসব নিয়ে হা-হুতাশ করে যাচ্ছে। অবশ্য সম্প্রতি খাদ্যে ভেজাল-দূষণ রোধের জন্য জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআই-এর তৎপরতা এবং উচ্চ আদালতের নানা নির্দেশনায় সাধারণ মানুষের মনে আশা সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু এবার বাজারে থাকা নানা ব্র্যান্ডের দুধের মান নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে চলে গেছেন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং সরকারি মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে সেসব জেনে মারাত্মক বিভ্রান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যে ভয়াবহ ভেজাল-দূষণের এই কালে আক্ষরিক অর্থেই দুধভাতে উৎপাতে পড়া মানুষ এখন কাকে বিশ্বাস করবেÑ বিএসটিআইকে নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে?

দেশের বাজারে যেসব তরল দুধ পাওয়া যায়, সেগুলোর মান নিয়ে দুই রকম প্রতিবেদন দিয়েছে বিএসটিআই ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মঙ্গলবার বিএসটিআই উচ্চ আদালতে একটি গবেষণা প্রতিবেদন দাখিল করে বলেছে, তাদের দ্বারা অনুমোদিত পাস্তুরিত তরল দুধে কোনো ক্ষতিকারক উপাদান নেই। অন্যদিকে বাজারে প্রচলিত সাতটি পাস্তুরিত দুধের নমুনা পরীক্ষা করে সে-সবে মানব চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ও তিনটি অপাস্তুরিত দুধে ফরমালিন এবং ডিটারজেন্টের উপস্থিতি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টার ও ফার্মেসি অনুষদের গবেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বাজারের পাস্তুরিত যে সাতটি দুধে অ্যান্টিবায়োটিক পেয়েছেন, সেগুলো হলোÑ মিল্কভিটা, আড়ং, ফার্ম ফ্রেশ, প্রাণ, ইগলু, ইগলু চকোলেট ও ইগলু ম্যাংগো। আর অপাস্তুরিত দুধের তিনটি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে রাজধানীর পলাশী, গাবতলী ও মোহাম্মদপুর বাজার থেকে। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ও ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক এবং ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ। তারা জানান, পরীক্ষাগারে পাস্তুরিত দুধের সাতটি নমুনার সবগুলোতেই মানবচিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক লেভোফ্লোক্সিন, সিপ্রোফ্লোক্সাসিন ও এজিথ্রোমাইসিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়াও অপাস্তুরিত দুধের একটিতে ফরমালিন, অন্যটিতে ডিটারজেন্ট পাওয়া গেছে। এদিকে, দুধ ছাড়াও বাজারের বিভিন্ন ফ্রুট ড্রিংকস, সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, ঘি, গুঁড়ো মসলা, শুকনা মরিচ, হলুদ, পাম অয়েলেও মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। বিএসটিআই মান অনুযায়ী কৃত্রিম মিষ্টিকারক ‘সাইক্লামেট’ ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও ১১টি পণ্যের সবগুলোতেই এর ব্যবহার ছিল অতিমাত্রায়। এর আগে গত মে মাসে, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে বাজারের তরল দুধ এবং দুগ্ধজাত সামগ্রীর ৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করে ৯৩টিতেই সিসাসহ মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান পাওয়ার কথা জানায় আদালতে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে। এছাড়া প্যাকেটজাত ৩১টি দুধের মধ্যেও ১৮টিতে ক্ষতিকর উপাদান এবং কিছু কিছু দুধের নমুনায় টেট্রাসাইক্লিন ও সিপ্রোফ্লোক্সাসিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয় তাদের প্রতিবেদনে।

নাগরিকদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ অনুসারে ২০১৫ সালে ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ’ গঠিত হয়। পাশাপাশি গত বছর থেকে ২ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’ পালিত হচ্ছে। দেশে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকার জরিমানার বিধানও আছে। কিন্তু মোড়কজাত খাদ্য বিপণনকারী কোম্পানি এবং খোলাবাজারের খাদ্য বিক্রেতা উভয়ের বিরুদ্ধেই খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যে ভেজাল ও দূষণের অভিযোগ থাকলেও কখনোই কারোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা শোনা যায়নি।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ, বিএসটিআইয়ের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় ও সম্পর্কহীনভাবেই যার যার মতো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।  এমনকি খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ রোধ এবং বাজার থেকে মানহীন পণ্য সরিয়ে নেওয়ার জন্য উচ্চ আদালতের নানা নির্দেশনাও যথাযথভাবে অনুসৃত হতে দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সবার আগে অবশ্যই দুধের মান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএসটিআইয়ের পরস্পরবিরোধী গবেষণা প্রতিবেদন থেকে উদ্ভূত বিভ্রান্তি নিরসনে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ বা এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্নও হওয়া যেতে পারে। সর্বোপরি, দুধের মতো শিশুখাদ্য এবং দুধ ও দুধজাত পণ্যসহ খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যে ভেজাল-দূষণ বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাসহ সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত