এবার দিকভ্রান্ত গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ‘বসন্ত’!

আপডেট : ২৬ জুন ২০১৯, ১০:২০ পিএম

আরব বসন্তের রেশ এখনো কাটেনি। আরবের কয়েকটি দেশে স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু এর পরিণতি সবদেশে সুখকর হয়নি। চলতি বছরেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দানা বেঁধে উঠেছে বিক্ষোভের আগুন। এই আগুনে পুড়ছে চেক প্রজাতন্ত্র থেকে শুরু করে হংকং, কাজাখস্তান, আলজেরিয়া এবং সুদান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে, এই আন্দোলনগুলো বিপথগামী গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে। আন্দোলনগুলোর গতিপ্রকৃতি নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি

 

প্রাগে স্মরণকালের সেরা বিক্ষোভ

স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জমায়েতের মুখোমুখি চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগ শহর। গত ২৩ জুন এই শহরে প্রায় আড়াই লাখ বিক্ষোভকারী জড়ো হয়। দেশটির ইতিহাসে ১৯৮৯ সালের পর এই জনসমাগমকেই সবচেয়ে বড় আন্দোলন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সেবার ‘ভেলভেট রেভল্যুশন’-এর মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপের এই দেশটি থেকে কমিউনিজমকে বিদায় করা হয়েছিল।

এবারের আন্দোলনটি চেক রিপাবলিকের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ বাবিজকে কেন্দ্র করে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, ‘দুর্নীতি ও প্রতারণার অভিযোগে ক্ষমতা থেকে শিগগিরই পদত্যাগ করতে হবে আন্দেজকে।’

গত ২৩ জুনের আন্দোলনটি সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে চলমান আন্দোলন থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম। কারণ কয়েক সপ্তাহজুড়ে সারা দেশেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে আন্দোলন করছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু ২৩ জুন তারা প্রাগ শহরে জমায়েত হয়। এই জমায়েত নিশ্চিতভাবেই চেক রিপাবলিকে ক্ষমতাসীনদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। তবে অনেকের দাবি, এই আন্দোলন চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না।

২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর চেক প্রজাতন্ত্রের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন দেশটির এএনও পার্টির প্রধান আন্দ্রেজ বাবিজ। তিনি একজন ধনকুবের। প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদ রয়েছে তার। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ২০ লাখ ইউরো অপচয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। আন্দোলনের মুখে চেক পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হবেন বাবিজ। কিন্তু বিরোধী দলগুলো তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভোট সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

গত মার্চ মাসেও প্রাগ শহরে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। চেক রিপাবলিকের প্রেসিডেন্ট মিলস জিমানস দেশের গণমাধ্যমকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখায় ওই আন্দোলন সংঘটিত হয়। প্রাগ ক্যাসলে নতুন মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর জিমানস দেশটির গণমাধ্যমগুলোকে নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেন। তার মন্তব্যের প্রতিবাদে কয়েকজন বিরোধীদলীয় নেতা অনুষ্ঠান ত্যাগ করেন এবং প্রাগের ওয়েনসেসলেস স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে প্রেসিডেন্ট জিমানস এবং প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ বাবিজের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়।

হংকং

চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হংকংয়ে আসামি প্রত্যর্পণ বিল পুরোপুরি বাতিল করার জন্য বিক্ষোভ করছিল সাধারণ মানুষ। তারা বিলটি বাতিল করার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেয়। তবে এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় গত ২১ জুন আবারও রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ।

আন্দোলনকারীদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। সকালে তারা কালো পোশাক পরে শান্তিপূর্ণভাবে আইনসভার বাইরে অবস্থান নেয়। বিক্ষোভের মাধ্যমে তারা তাদের হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। তাদের এই ক্ষোভ হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি লামকে ঘিরে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হংকংয়ের আইনসভায় আসামি প্রত্যার্পণ বিল উত্থাপন করা হয়। বিলটি আইনে পরিণত হলে হংকংয়ের ভূখন্ডে অবস্থানরত যেকোনো সন্দেহভাজন আসামিকে মূল ভূখন্ডে নিয়ে বিচার করতে পারবে চীন। হংকংয়ের জনগণ বলছে, এই আইনের অপব্যবহার হবে। এই অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে। প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। সম্প্রতি এই বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে। গণআন্দোলনের মুখে বিলটি স্থগিত করেছিলেন ক্যারি লাম। কিন্তু আন্দোলনকারীদের দাবি বিলটি যেন বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে চীনের আজ্ঞাবাহী হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি লামের পদত্যাগও দাবি করছে তারা। এই দাবি নিয়ে তারা আইনসভার সামনে থেকে সরে পুলিশ সদর দপ্তরের চারদিকে অবস্থান নিয়ে বিলটি পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানাতে থাকে। এই আন্দোলন এখনো চলমান। জি-৮ সম্মেলনকে সামনে রেখে হংকংয়ের বিক্ষোভকারীরা বিশ^নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

গত বছর এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আসামি প্রত্যাবর্তন বিলটি তৈরি করা হয়। তাইওয়ানে ছুটি কাটানোর সময় অন্তঃসত্ত্বা বান্ধবীকে হত্যার অভিযোগ ওঠে হংকংয়ের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। কিন্তু তাইওয়ানের সঙ্গে হংকংয়ের বন্দি বিনিময়ের কোনো চুক্তি না থাকায় সেই ব্যক্তিকে এখন হংকং থেকে তাইওয়ানে পাঠানো যাচ্ছে না।

প্রস্তাবিত বিলে এমন পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত অপরাধীকে ফেরত পাঠানোর পথ সুগম করা হয়। কিন্তু চীন এ আইনের সুবিধা নিয়ে হংকংয়ের বাসিন্দাদের ওপর খবরদারি বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা থাকায় বিষয়টি সেখানে এটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সাধারণ বাসিন্দা ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

পাশাপাশি তাইওয়ানও জানিয়েছে যে, সন্দেহভাজন সেই খুনের আসামিকে তারা ফেরত নিতে চায় না। কারণ এটি এমন এক উদাহরণ তৈরি করবে যা চীন ভবিষ্যতে কাজে লাগাতে পারে। পেইজিংয়ের দুর্বল আইন এবং মানবাধিকার রেকর্ডের কারণে সেখানে কোনো বন্দিকে ফেরত পাঠানো নিরাপদ মনে করছে না তাইওয়ান এবং হংকংয়ের সাধারণ মানুষ।

কাজাখস্তান

৩০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর চলতি বছর ২০ মার্চ হঠাৎ করেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট নুর সুলতান নাজারবায়েভ। দেশটির সূচনালগ্ন থেকেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন এই কাজাখ নেতা। ৭৮ বছর বয়সী নাজারবায়েভের জন্ম ১৯৪০ সালে। একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাকে সফল হিসেবেই গণ্য করা হয়। দীর্ঘদিন তিনি তেলসমৃদ্ধ কাজাখস্তানের নেতৃত্ব দিয়েছেন। একটি টেলিভিশন চ্যানেলে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে তিনি জানান, নতুন প্রজন্মের নেতাদের সুযোগ করে দিতেই তিনি পদত্যাগ করেছেন।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেও নাজারবায়েভের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। তার বিরুদ্ধে কোনো বিক্ষোভ বা ব্যাপক জন-অসন্তোষের খবরও পাওয়া যায় না। তবে তাকে স্বৈরাচারী শাসক হিসেবেই অভিহিত করে আন্তর্জাতিক মহল। দাবি করা হয়, দমনপীড়নমূলক আইনের মাধ্যমে জনগণকে হাত-পা নাড়ার কোনো সুযোগ না দিয়ে দীর্ঘ বছর ক্ষমতায় টিকেছিলেন তিনি। পদত্যাগ করলেও তিনি দেশটির ক্ষমতাসীন দলের প্রধান থাকবেন বলে জানান। একই সঙ্গে কাজাখস্তানের নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন এবং জাতীয় নেতা পদবিও ধারণ করবেন।

বিদায়ী ভাষণে নাজারবায়েভ বলেন, ‘আমি চাই নতুন প্রজন্ম থেকে কেউ দেশের হাল ধরতে শিখুক।’ এ সময় তিনি ২০২০ সাল পর্যন্ত নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাশিম জমরাট তোকায়েভের নাম ঘোষণা করেন।

তবে নাজারবায়েভের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে হঠাৎ করেই অশান্ত হয়ে উঠেছে কাজাখস্তানের মানুষ। আর এই অশান্তি যাকে ঘিরে তিনি স্বয়ং তোকায়েভ। ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন বলে পূর্ব সিদ্ধান্ত হলেও চলতি মাসেই (৯ জুন, ২০১৯) কাজাখস্তানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তোকায়েভ এই নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৭১ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু বিরোধীরা এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও প্রভাবিত বলে দাবি করছে। দেশটির দমনমূলক আইনের কারণে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ হলেও বিরোধীরা কয়েক দফা বিক্ষোভ করেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভোটগ্রহণের সময় বিভিন্ন বিক্ষোভ মিছিল থেকে ৫০০ বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠেছিল নির্বাচনের আগে থেকেই। এই নির্বাচনের পেছনে রয়েছে দেশটির জনগণের টানা তিন দশক ধরে শোষিত হওয়ার গল্প। স্বৈরাচারকে গণতন্ত্রের বৈধতা দিতে নির্বাচনে নিজেদের পছন্দমতো প্রতিপক্ষ বসানো, অন্যায়ের বিরোধিতা করার ‘অপরাধে’ শত শত নাগরিককে গ্রেপ্তার, প্ল্যাকার্ড বা ব্যানারে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ কাজাখস্তানের জন্য খুব সাধারণ ঘটনা। ভিন্নমতের ব্যাপারে একেবারেই অসহিষ্ণু কাজাখস্তান কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভকারীরা প্ল্যাকার্ডে কী লিখছে, তা দেখারও প্রয়োজন নেই, হাতে কিছু একটা দেখলেই গ্রেপ্তার করার মতো যথেষ্ট কারণ পেয়ে যায় পুলিশ।

নাজারবায়েভের এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী বুকে দুটি ও মাথায় একটি গুলি করে আত্মহত্যা করেছেন। অবৈধ আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে আরেকজনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। আগেই ফলাফল অনুমান করতে পেরে নির্বাচন বর্জন করেছেন বাকিরা। তবে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের এক প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। সোভিয়েত আমলে জন্ম নেওয়া নেতাদের হাতে শোষিত হতে হতে ক্লান্ত দেশটির তরুণসমাজ নির্বাচনের পরদিন রাজপথে অবস্থান নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তাদের আন্দোলন। হ্যাশট্যাগ দিয়ে সরকারকে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।

আলজেরিয়া

কয়েক সপ্তাহের টানা বিক্ষোভের মুখে গত ২ এপ্রিল পদত্যাগ করেছেন আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেল আজিজ বুতেফ্লিকা। এর আগে ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিলেন তিনি।

গণমাধ্যমে বুতেফ্লিকার পদত্যাগ ঘোষণা শোনার পর আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে আলজেরিয়ার মানুষ। রাজধানী আলজিয়ার্সের রাস্তাগুলোতে ক্রমাগত গাড়ির হর্ন বাজিয়ে এই উল্লাসে একাত্ম হয় পথচলতি মানুষও। জাতীয় পতাকা নেড়ে, গান গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে জনতা। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সালমৌয়ি সিদ্দিক নামে এক আলজেরিয়ান বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় এবার আমরা শতভাগ গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হবো। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ববর্তী শাসনের পুরোটাই অপসারণ করতে হবে। তবে তা কঠিন কাজ।’

সংবিধান অনুযায়ী, দেশটির নির্বাচনের আগপর্যন্ত সিনেটের স্পিকার দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বিক্ষুব্ধ জনতা দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দাবি করেছে। যে রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সে ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নেই তাদের। আন্দোলনকারীদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই বেশি। তারা নতুন আঙ্গিকে সরকারব্যবস্থা গঠনের ওপর জোর দিয়েছে। আবদেল আজিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ‘লা পোভার’ নামে একটি সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করেছেন।

আবদেল আজিজ ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ইসলামি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এক গৃহযুদ্ধে প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়। এর মাধ্যমে দেশটিতে একচ্ছত্র ক্ষমতা কায়েম করেছিলেন তিনি। বুতেফ্লিকার পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন আবদেল কাদের বেনসালাহ। তবে এতেও থামেনি ওই দেশের বিক্ষোভ। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, বুতেফ্লিকার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় বেনসালাহর পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়। এখন বেনসালাহর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করছে দেশটির জনগণ। এই বিক্ষোভ সমাবেশে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। কয়েক মাস ধরেই প্রতি শুক্রবার রাজধানী আলজিয়ার্সসহ দেশজুড়ে বিক্ষোভের আয়োজন করা হচ্ছে। তাদের থামাতে জলকামান ও টিয়ার শেল ব্যবহার করছে পুলিশ। বুতেফ্লিকার পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়া বেনসালাহ ৪ জুলাই নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন। সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের আগপর্যন্ত ৯০ দিন পদে থাকবেন বেনসালাহ। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা এর আগেই তার পদত্যাগ দাবি করছে। আলজেরিয়ার মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ মানুষের বয়স ৩০-এর নিচে। দেশটিতে তরুণদের বেকারত্বের হারও অনেক বেশি। আন্দোলনেও তাদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি।

সুদান

চলতি বছরের এপ্রিলে রাজধানী খার্তুমে সেনাসদর দপ্তরের সামনে টানা কয়েক দিনের বিক্ষোভ ও অবস্থান ধর্মঘটে অংশ নেয় সুদানের হাজার হাজার মানুষ। সুরক্ষিত ওই কম্পাউন্ডের ভেতরেই দেশটির প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরের বাসভবন এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। অতিমাত্রায় মূল্যস্ফীতি এবং হঠাৎ করে রুটির দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে গত বছর ডিসেম্বরে রাজধানী খার্তুমসহ সুদানের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। খাদ্য সংকট ও প্রায় ৭০ ভাগ মূল্যস্ফীতির জন্য বশির সরকারের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করে বিক্ষোভকারীরা। সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক কাঁদানে গ্যাস ও দমন নিপীড়নের ফলে সরকারি হিসেবেই এপ্রিল পর্যন্ত ৩৫ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। যদিও বিক্ষোভকারীরা বরাবরই দাবি করে আসছিল, নিহতের প্রকৃত সংখ্যাটা আরও বেশি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে এই সংখ্যাটি ছিল ৫১ জন। এদিকে সুদানের রাজধানী খার্তুমের পাশর্^বর্তী নীল নদ থেকে অন্তত ৪০টি মরদেহ উদ্ধার হওয়ার দাবি করে বিক্ষোভকারী দলগুলো। তাদের মতে, সুদানি সেনারা যেভাবে দেশের গণতন্ত্রপন্থি বিক্ষোভ দমন করছে তাতে এই কয়েক দিনে কমপক্ষে শতাধিক লোকের মৃত্যু হয়েছে।

বিক্ষোভের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্টকে সরাতে বিক্ষোভকারীরা সেনা হস্তক্ষেপ চাইলেও বশিরের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল তারা। সেনা সমর্থন নিয়েই ১৯৮৯ সাল থেকে ৩০ বছর দেশটির ক্ষমতায় আঁকড়ে ছিলেন বশির। এর আগে ২০১১ সালে সুদান থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন একটি দেশ হিসেবে দক্ষিণ সুদানের যাত্রা শুরু করেছিল। দক্ষিণ সুদানেও এখন গৃহযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে।

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সেনাসদরের সামনে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় বিক্ষোভকারীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই অবস্থান থেকে তারা সরে যাবে না বলে ঘোষণা দেয়। অবশেষে বিক্ষোভ চলা অবস্থায়ই ১১ এপ্রিল দেশটির সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে এবং বশিরকে গ্রেপ্তার করে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক ভাষণে সুদানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট আওয়াদ ইবনে আউফ বলেন, ‘দুই বছর পর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই সময়ের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সামরিক পরিষদ গঠন করা হবে।’

আউফ তিন মাসের জন্য সুদানে জরুরি অবস্থা জারির পাশাপাশি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাতে কারফিউ জারির ঘোষণা দেন। দেশটির সংবিধান স্থগিত করে দেওয়া হয় এবং সীমান্ত ও আকাশপথও অনির্দিষ্টকাল বন্ধ থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে ক্ষমতা কাঠামো থেকে বশির ঘনিষ্ঠদের সরানো এবং বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সেনা কাউন্সিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। এর জের ধরেই গত মাসে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনাও হয়। ওই বৈঠকের পর সামরিক কাউন্সিলের মুখপাত্র শামস এলদিন কাবাসি নির্বাচনের আগপর্যন্ত দেশ পরিচালনায় একটি যৌথ কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ঐকমত্য হওয়ার কথা জানালেও তখনো সেই সরকার গঠিত হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে জরুরি সরবরাহ নির্বিঘœ রাখতে রাস্তা ফাঁকা রাখার আহ্বান জানায় সেনাবাহিনী। তবে মূল আন্দোলনকারীদের গ্রুপ সুদানিজ প্রফেশনালস অ্যাসোসিয়েশন এখনো বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে বলে জানা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত