সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত পদ্মা সেতু ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি থাকলেও কার্যত কোনো কাজই হয়নি দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের গুনধুম পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন প্রকল্পে। একইভাবে প্রায় সাত বছর আগে শুরু হওয়া মেট্রোরেল প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো বাকি রয়েছে প্রকল্পের ৭০ ভাগ কাজ। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন এ সেতু দিয়ে যানবাহনের সঙ্গে রেল চলাচলের কথা থাকলেও পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ১৭ শতাংশেরও কম।
চলতি অর্থবছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে পদ্মা সেতুর সার্বিক অগ্রগতি ৬৯ শতাংশ আর রূপপুর ৯০ শতাংশ। তবে একক বছর হিসেবে চলতি বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ে পিছিয়ে রয়েছে। অগ্রগতিও কম। অগ্রাধিকারভুক্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে তদারকি করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ সংক্রান্ত গঠিত মনিটরিং কমিটির সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত ১০টির মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় থাকা ৭ প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ৬টিই চলতি বছরে সংশোধিত এডিপির সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করতে পারেনি। সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে আরএডিপি’র মাত্র ৬৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে অগ্রাধিকারভুক্ত এসব প্রকল্পে গড় ব্যয় আরও কম।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান মঙ্গলবার দেশ রূপান্তকে বলেন, বছরের প্রথম দিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে একটু সমস্যা থাকে। কিন্তু আমরা এসব সমস্যা সমাধান করেছি। সামনের দিনগুলোতে বছরের প্রথম থেকেই বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে যাবে। অনেক সময় প্রকল্পের কাজ এগিয়ে যায়, কিন্তু অর্থ ছাড় হয় না। এ জন্য হিসাবে আসে না। ফলে অগ্রগতি কম মনে হয়। তিনি বলেন, অগ্রাধিকার প্রকল্পসহ অন্যান্য এডিপিভুক্ত সব প্রকল্পের তদারকি বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিগগিরই এই কার্যক্রম দেখতে পাবেন।
প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সরকারের অন্যতম আলোচিত প্রকল্প পদ্মা বহুমূখী সেতু প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। কিন্তু সেতু নির্মাণের কাজে অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় এখন সেই বরাদ্দ কমিয়ে সংশোধিত এডিপিতে রাখা হয় ২ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। এ বরাদ্দ থেকে মে মাস পর্যন্ত খরচ হয়েছে দুই হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৮৯ শতাংশ। মোট ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে এখন পর্যন্ত মোট খরচ হয়েছে ১৯ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৬৯ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পিডি শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পের অগ্রগতি ঠিক আছে। নিয়ম অনুসারে অর্থও ব্যয় হয়েছে। কিন্তু হিসাবে কেন কম আসছে জানি না। ব্যস্ত থাকার কারণে বাস্তব অগ্রগতি এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না, তবে অগ্রগতি সন্তোষজনক।
এদিকে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে অর্থবছরের ১১ মাসে সংশোধিত বরাদ্দের মাত্র ৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে। মোট ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার প্রকল্পে গত মে মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৯ হাজার ৭৩ কোটি টাকা।
এদিকে পদ্মাসেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অবস্থা আরও খারাপ। চলতি অর্থবছরের জন্য পাঁচ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা ব্যয় করার লক্ষ্য ছিল। বরাদ্দ কমিয়ে সংশোধিত এডিপিতে তিন হাজার ২৯০ কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে ১১ মাসে ব্যয় হয়েছে ২৩২ কোটি টাকা। মোট ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০২৪ সালে, তবে মে পর্যন্ত অগ্রগতি মাত্র ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনের সঙ্গে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে ঋণচুক্তিতে বিলম্ব হয়। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নির্মাণ চুক্তিও অনেক দেরিতে হয়েছে। কাজে এখনো গতি না আসায় অর্থ ব্যয় কম হচ্ছে।
আলোচিত মেট্রোরেল প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ ছিল তিন হাজার ৯০৩ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে কমিয়ে দুই হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা রাখা হয়। চলতি অর্থবছরের মে পর্যন্ত সময়ে এই বরাদ্দ থেকে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। মোটি ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার এ প্রকল্পের সার্বিকভাবে ভৌত অগ্রগতি ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা।
দোহাজারী-রামু-গুনধুম ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে মূল বরাদ্দ ছিল এক হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ কমিয়ে রাখা হয় ৫২৮ কোটি টাকা। মে পর্যন্ত আরএডিপি বরাদ্দের ৩৩ কোটি টাকা ব্যয় হলেও প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি শূন্য।
পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি বছরে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ আছে ৫৭৮ কোটি টাকা। গত ১১ মাসে ব্যয় হয়েছে ৩১৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এডিপিভুক্ত প্রকল্পের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলোÑ বছরের প্রথম দিকে অর্থ ব্যয় হয় না। শেষ দিকে এসে অর্থ ব্যয়ের হিড়িক পড়ে। এটা বহু পুরনো সমস্যা। অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসা যায়নি। প্রকল্প ছোট হোক আর বড় হোক নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়া জরুরি। নইলে অর্থনীতিতে সুফল আসবে না।
অন্যদিকে মাতারবাড়ী ২ী৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ১৭১ কোটি টাকা। তবে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। অর্থবছরের ১১ মাসে বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ২৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ বেড়ে ১১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা করা হয়। তবে মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে আট হাজার ৮০০ কোটি টাকা। মোট ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দে এই প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৮৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। যদিও ২০১৩ সালে পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় রয়েছে।
রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এডিপিতে এ প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ ছিল না।
অন্যদিকে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর ও এলএনপি পে।রাটিং টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নির্মাণ নিয়ে কোনো সিদ্ধাতে পৌঁছেনি সরকার।
