হত্যাকারীর কোনো ক্ষমা নেই

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৯, ১০:৫৮ পিএম

বুধবার সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সামনে স্বামী রিফাত শরীফকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে হত্যাকারী নয়ন বন্ড এবং রিফাত ফরাজীকে শনাক্ত করা হয়েছে। বহু মানুষের উপস্থিতিতে এ ধরনের হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে সর্বত্র। আলোচনা হচ্ছে, খুনিদের নির্মমতা ও পৈশাচিকতা নিয়েও। কতটা ভয়ংকর মনোবৃত্তির অধিকারী হলে কেউ প্রকাশ্যে বহু মানুষের সামনে এভাবে মানুষ খুন করতে পারে! বীভৎস এই হত্যাকান্ড সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। শুধু রিফাত হত্যা নয়, দেশে বেড়েছে বীভৎস, বিকৃত ও লোমহর্ষক খুনের ঘটনা। আপনজনরাও ঘটাচ্ছে অবিশ্বাস্য রকমের খুন-খারাবি। জন্মদাত্রী মা খুন করছে আপন সন্তানকে, প্রিয়তমা স্ত্রী খুন করছে স্বামীকে, স্বামী পুড়িয়ে মারছে স্ত্রীকে, ভাই খুন করছে ভাইকে। খুনের পর লাশ রাখা হচ্ছে শয়নকক্ষে, রাস্তায়, বালুর ভেতর, বস্তার ভেতর, কাদার ভেতর, পানির ট্যাংকিতে, ড্রেনে কিংবা ডাস্টবিনে। প্রতিনিয়ত এ ধরনের খুনের ঘটনা ঘটছে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দ্বন্দ্বই অধিকাংশ খুনের ঘটনার কারণ।

অপরাধ ও সমাজ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুন-খারাবি ও সামাজিক অস্থিরতার পেছনে প্রেম, পরকীয়া, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, জমিসংক্রান্ত বিরোধ ও মাদকের অর্থ জোগাড়ের মতো বিষয় জড়িত। তারা বলছেন, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, অসহিষ্ণুতা, অতিমাত্রার ক্ষোভ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে মানুষের মাঝে দিন দিন নিষ্ঠুরতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তুচ্ছ কারণে অসহিষ্ণু হয়ে খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। আমরা মনে করি, এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধ ও ধর্মচর্চায় মানুষকে উৎসাহিত করা দরকার। কারণ পবিত্র কুরআন ও হাদিসে মানব হত্যাকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যায়ভাবে অপরের প্রাণ হরণকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে কবিরা গোনাহসমূহের। শুধু তাই নয়, পৃথিবীতে যত রকমের গোনাহের কাজ রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় আল্লাহতায়ালার সঙ্গে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা। এরপর সবচেয়ে বড় গোনাহ অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা। হন্তারকের জন্য আল্লাহতায়ালা দুনিয়ায় বড় শাস্তি এবং আখেরাতে কঠিন আজাবের ঘোষণা দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘বলো, তোমাদের ওপর তোমাদের রব যা হারাম করেছেন, তোমরা তার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করবে না এবং মা-বাবার প্রতি দয়া করবে আর দারিদ্র্যের কারণে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না। আমিই তোমাদের রিজিক দিই এবং তাদেরও। আর অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হবে না, তা থেকে যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে। আর বৈধ কারণ ছাড়া তোমরা সেই প্রাণকে হত্যা করো না, আল্লাহ যা হারাম করেছেন। এগুলো আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার।’ সুরা আল আনআম : ১৫১। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে ইসলাম তার প্রতিকারে কার্যকর ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম এমন এক ধর্ম যেখানে যেকোনো নিরপরাধ মানুষের প্রাণসংহারকে মানবতাবিরোধী ও মানবজাতির হত্যাতুল্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কোরআনে কারিমের মতো ইসলামের নবী হযরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হত্যাকান্ডকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সাহাবি হযরত আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কবিরা গোনাহগুলোর মধ্যে সবচেযে বড় গোনাহ হলো আল্লাহতায়ালার সঙ্গে শরিক করা, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা, পিতামাতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা কথা বলা।’ সহিহ বোখারি ও মুসলিম।

অন্য হাদিসে হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে প্রথম বিচার করা হবে রক্তপাত সম্পর্কে।’ সহিহ বোখারি ও মুসলিম। হত্যাকারীর জন্য ইসলামে নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান দিয়েছে। আমাদের দেশের আইনেও হত্যাকারীর জন্য সাজা নির্ধারণ করা আছে। আমরা চাই, রিফাত হত্যায় জড়িতরা যেন আইনের ফাঁক গলে রেহাই না পায়। যাদের কার্যকলাপে সমাজের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তাদের জন্য কোনো অনুকম্পা নেই, থাকতে পারে না।

লেখক : মুফতি, শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত